নীতি আলোচনা

জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত এড়িয়ে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে জোর দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতের চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আমাদের অর্থনীতি নাজুক হতে শুরু করে।

কিন্তু এ মুহূর্তে এটি আগের মতো খারাপ অবস্থায় নেই। যদিও দেশ এখনো বেশকিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ধারাবাহিক সংস্কার ও কার্যকর সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে নতুন সরকারকেও রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সদিচ্ছা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান মন্দ বলা যাবে না। কারণ করোনা মহামারীর সময়কার অস্থিতিশীলতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ডলার সংকট, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার নানা জটিলতার সময়েও বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। বিশেষত চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটলে রাষ্ট্র কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে সাময়িক সময়ের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে আমি দায়িত্ব নিই। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখার দিকেই বাড়তি গুরুত্ব দিতে হয়েছে আমাদের। আমরা এমন ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে অর্থনীতি গতিশীল থাকে। পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।

মূলত অন্তর্বর্তী সরকার জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত এড়িয়ে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে। বলে নেয়া ভালো, যেকোনো নীতিনির্ধারণ কখনই সহজ নয়। অর্থনীতির ক্ষেত্রে তো আরো নয়। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংকোচনমূলক মুদ্রা ও রাজস্বনীতি নিয়েছিল, সেগুলো সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করেছে। এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তিনটি বিভাগে আলাদাভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিবর্তন ও সংস্কার আনা হয়েছে। এসব সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।

চলতি অর্থবছরে জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। এর প্রভাবে বাজারের সামগ্রিক চাহিদা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের ভিত্তি ঠিকই তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার ফলে কৃষি খাতে খাদ্যশস্য উৎপাদন স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছায়। দায়িত্ব ত্যাগ করার সময়ও খাদ্যের মজুদ সন্তোষজনক পর্যায়েই ছিল। এসব বাদেও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা (পিএফএম) সংস্কারের অংশ হিসেবে ম্যাক্রো ফিসক্যাল পূর্বাভাস ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ট্রেজারি ও নগদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, আইব্যাস প্লাস প্লাস সম্প্রসারণ, পেনশন অটোমেশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ফিসক্যাল ঝুঁকি রিপোর্টিংও জোরদার করা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের অর্থনীতির যে নাজুক অবস্থায় ছিল, সেটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু জায়গায় সময়োপযোগী নীতি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। এছাড়া যেসব প্রকল্প আগামী সময়ে দেশের অগ্রাধিকারের নিরিখে অনেক জরুরি, সেগুলোর ব্যয় কেন্দ্রীভূত করতে হবে। তবে ব্যয় কেন্দ্রীভূত করলেও প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের ব্যয়ের একটি বড় অংশ নানা খাতের ভর্তুকিতে খরচ হয়। এটিকে আরো সুনির্দিষ্ট ও এর দক্ষ ব্যবস্থাপনা জরুরি। অর্থাৎ ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা অধিক লক্ষ্যভিত্তিক ও দক্ষ করতে পারলে বাড়তি অনেক ব্যয় এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও বাড়তি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জরুরি হলো ঋণ-জিডিপি অনুপাত সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে এর আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া খাতওয়ারি পে-স্কেল বা ন্যায্য বেতন কাঠামো সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। মোটাদাগে এগুলো অর্থ বিভাগের ক্ষেত্রে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার লক্ষ্য।

নীতিমালা প্রণয়নের চেয়ে প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা অনেক বেশি কঠিন। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া ভালো নীতিও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না। বিষয়টি অনুধাবন করে অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকগুলো সংস্কার কার্যক্রম নেয়। সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে এ খাতের প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। সমস্যাগুলো বহুদিনে জমেছে বিধায় রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। এজন্য চাই সময় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবেলার জন্য ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫; আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫; বাংলাদেশ ব্যাংক (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স, ২০২৪; গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬; নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন, ১৮৮১ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করা হয়েছে। এছাড়া বীমা খাতে সলভেন্সি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার জন্যও প্রবিধান ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রবিধান ও বিধিমালার সংশোধনও হয়েছে। বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করার বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজারে আস্থা পুনরুদ্ধারে বিএসইসি পুনর্গঠন, অনিয়ম অনুসন্ধান, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মার্জিন, মিউচুয়াল ফান্ড ও পাবলিক ইস্যু বিধিমালার সংস্কার কার্যক্রমও বিগত বছরে অগ্রসর হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এছাড়া অগ্রাধিকার মামলা নেয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার (এমএলএ) বিষয়েও উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ও তারল্য সংকট রয়েছে এমন ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ধুঁকতে থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং শীর্ষ পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। এর বাইরেও ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ ও বাংলাদেশ ব্যাংক (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডার, ২০২৬ চূড়ান্ত করার বিষয়েও অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করেছে। ব্যাংক একীভূতকরণ, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হয়। পুঁজিবাজারের তদারকি কাঠামোকে শক্তিশালী করার বিষয়েও কিছু উদ্যোগ চলমান রয়েছে। নতুন সরকার এখন সে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলেই বিশ্বাস।

অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কারের প্রচেষ্টা চালানো। এজন্য গত বছর ১২ মে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। এ অধ্যাদেশের অধীনে রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায়—এ দুটো প্রক্রিয়াকে আলাদা করে ফেলা হয়। মূলত দেশে কর অব্যাহতির যে সংস্কৃতি বিদ্যমান তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক (টিইপিএমএফ) প্রণয়ন করা হয়। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসার বিষয়ে বেশি জোর দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় অনলাইনে কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি ও কর ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। বিশেষত ভ্যাট অটোমেশন এবং ই-ইনভয়েসের মতো পরিষেবা থাকায় করদাতাদের এ বিষয়ে আগ্রহ বেড়েছে। ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করজাল বিস্তার করা সম্ভব হয়েছে।

অর্থনৈতিক কূটনীতিও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে অনেক জরুরি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকেও উপযুক্ত পদ্ধতিতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিগত অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার ২০টি উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে ৭৬টি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি ৮ হাজার ৩৮১ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৯ হাজার ৩১৫ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া গেছে। বাজেট সহায়তা হিসেবে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, এআইআইবি, ওপেক ও এএফডি থেকে ৩ হাজার ৪৪১ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড় করা হয়। বিনিয়োগ আহরণ ও বাজেট বরাদ্দের সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে উন্নয়ন গতিশীল করার কাজটি সহজ ছিল না। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯৬টি এবং চলতি অর্থবছরে ২৯১টি বিদেশী সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প এডিপি বাস্তবায়নে অনুমোদন পায়। এরই মধ্যে সরকার চলতি বছর ৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ফেরত দিতে সক্ষম হয়েছে।

দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, রফতানি বৃদ্ধি এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নসহ বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ অর্জনগুলো উপেক্ষা করা যাবে না। এগুলো ভবিষ্যৎ অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তি দেখা আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো অবকাশ নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। নতুন সরকারকে গভীর কাঠামোগত সংস্কার, শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতির উন্নয়ন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নীতি সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ কথা মনে রাখতে হবে, বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। আমাদের আছে সহনশীল মানুষ, পরিশ্রমী জনশক্তি এবং বিপুল সম্ভাবনা। সঠিক নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা

আরও