আলোকপাত

পৌরসভার বাজেট আয়, ব্যয় ও অপচয়

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পৌরসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েই যার সৃষ্টি। ইউনিয়ন পরিষদ, তারপর পৌরসভা এবং সেখান থেকে সিটি করপোরেশন— এভাবেই আমাদের স্থানীয় সরকারের বিন্যাস। এক্ষেত্রে সব স্থানীয় সরকারেরই পৃথক পৃথক দায়িত্ব রয়েছে, যা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অর্পিত দায়িত্ব

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পৌরসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েই যার সৃষ্টি। ইউনিয়ন পরিষদ, তারপর পৌরসভা এবং সেখান থেকে সিটি করপোরেশন এভাবেই আমাদের স্থানীয় সরকারের বিন্যাস। এক্ষেত্রে সব স্থানীয় সরকারেরই পৃথক পৃথক দায়িত্ব রয়েছে, যা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অর্পিত দায়িত্ব কীভাবে পালন করবেন এবং কতটা পালন করবেন, তা নিজেরাই নির্ধারণ করেন। সাধারণভাবে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী এক বছর কোন খাতে কত ব্যয় হবে এবং ব্যয়ের অর্থ কোথা হতে সংগৃহীত হবে, তার হিসাব-নিকাশকে বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। জাতীয় বাজেটের মতোই প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অর্থবছরের শুরুতে আগামী এক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি হয়ে থাকে। আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা দেখে নাগরিকরা হিসাব মেলাতে চেষ্টা করে, আগামী বছরটা তারা কেমন নাগরিক সুবিধা পাবেন। পৌরসভাও প্রতি বছর নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বাজেট ঘোষণা করে থাকে। অতীতে বাজেট একান্তভাবে আমলাতান্ত্রিকতার ঘেরাটোপে থাকলেও বর্তমানে কিছু সুধী মহলের উপস্থিতিতে তা ঘোষিত হয়। তবে সবসময়ই তা থাকে স্থানীয় বা জাতীয় আলোচনা গুরুত্বে সঙ্গে বিবেচনার বাইরে। এবারের অর্থবছরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

আমাদের দেশে সাধারণত জাতীয় বাজেট থেকে শুরু করে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সব বাজেটের একটা গতানুগতিক ধারা আছে। গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে বাজেট ঘোষিত হবেএমনটা আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। প্রতি বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতকে দোষারোপ আর আমিত্ব ছাড়া বাজেট কৌশল, বাজেট বরাদ্দ, সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসে না। তাই ২০২২-২৩ অর্থবছরেও পরিবর্তন এসেছেএমন আশা করা অপরাধ। আর অপরাধ বিবেচ্য হলে কোনো কথাই বলার সুযোগ থাকে না। কিন্তু বাজেট ঘোষণার আগে যে জনকল্যাণের সুমধুর কথাগুলো দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলে থাকে তার জন্যই আবার জনগণের অধিকার জন্ম নেয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাজেটের প্রধানতম লক্ষ্য জনগণের সেবার মান বৃদ্ধি, জনকল্যাণ, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, সীমিত অর্থের কৌশলগত বহুমুখী ব্যবহারে জনগণের মঙ্গল সাধন। অনক্ষর, অনাহারি মানুষের দেশে বাজেট প্রণয়নকারীদের জনকল্যাণের আস্ফাালন আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাজেটে আয় বৃদ্ধি জনসেবার মান বৃদ্ধিতে কেমন ভূমিকা রাখে, তা নাগরিকরা হূদয় দিয়ে অনুভব করেন।

মানুষকে নাগরিকসেবা দেয়ার জন্য হঠাৎ একটা সময়ে দেশে পৌরসভা সৃষ্টির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রতিযোগিতায় পৌরসভা গঠনের জন্য যেসব নীতিমালা আছে তার সিংহভাগই অবহেলা করা হয়েছে। ফলে দেশের প্রায় পৌরসভাই আজ সমস্যাজর্জরিত। সবই বিভিন্ন ধরনের সমস্যার আকর। এসব সমস্যার সমাধান এখনই হয়ে যাবেএমন কেউ বিশ্বাস করে না। সমস্যার যৌক্তিক সময়োপযোগী সমাধান সবার কাম্য। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ হলেই সাফল্য আসবে। এর মধ্যে আবার সব সমস্যার সমাধান পৌর কর্তৃপক্ষের নাগালের মধ্যে আছে এমনও নয়। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় সমস্যার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে স্থানীয় সমস্যা জড়িয়ে আছে। সেক্ষেত্রে পরমুখাপেক্ষী হয়ে দেনদরবার করেই সমস্যা সমাধান করতে হয়। আর এখানেই প্রয়োজন হয় ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। প্রভাবশালী ব্যক্তি ছাড়া মুক্তির পথ খুব লম্বা। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার মধ্যে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানে জনসম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। পৌরসভা জনপ্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হলেও আমলাতান্ত্রিকতার বাইরে এসে জনগণের সম্পৃক্ততা সময়ে মোটামুটি বিরল থেকে গিয়েছে।

পৌর বাজেট নিয়ে কথা বলার আগে পৌর কর্তৃপক্ষ তার নাগরিকদের জন্য কী কী সেবা দিয়ে থাকে, তা একবার দেখে নেয়া জরুরি। একটি পৌরসভার বাধ্যতামূলক কার্যাবলির মধ্যে আছে এক. রাস্তা, সেতু ইত্যাদি নির্মাণ সংরক্ষণ। দুই. আবর্জনা সংগ্রহ, অপসারণ স্থানান্তর। তিন. রাস্তা আলোকিতকরণ। চার. রাস্তায় পানি দেয়া।  পাঁচ. রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণ ছয়. সংক্রমক ব্যাধি মহামারী প্রতিরোধ। সাত. জন্ম, মৃত্যু বিবাহ নিবন্ধীকরণ। আট. কসাইখানা স্থাপন সংরক্ষণ। নয়. পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থাকরণ। দশ. ইমারত নির্মাণ পুনর্নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ।  এগারো. যানবাহন নিয়ন্ত্রণ। বার. মেলা প্রদর্শনী নিয়ন্ত্রণ। তের. বেসামরিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন। চৌদ্দ. বাধ্যতামূলক শিক্ষা বলবত্করণ এবং। পনের. সরকার কর্তৃক নির্দেশিত কার্যাবলি সম্পাদন।

 পৌরসভাকে বাধ্যতামূলক কার্যাবলির পাশাপাশি বেশকিছু ঐচ্ছিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। ঐচ্ছিক কার্যাবলির মধ্যে আছে এক. খাদ্য পানীয় দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ। দুই. ব্যক্তিমালিকানাধীন বাজার নিয়ন্ত্রণ। তিন. পায়খানা, প্রস্রাবখানা স্থাপন সংরক্ষণ। পাঁচ. কল্যাণ কেন্দ্র, এতিমখানা, পাগলা গারদ বিধবা আশ্রম স্থাপন। ছয়. ভিক্ষাবৃত্তি, বেশ্যাবৃত্তি, জুয়া খেলা উচ্ছেদ। সাত. সমাজসেবামূলক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন স্থাপন। আট. ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম গ্রহণ। নয়. জাতীয় ভাষার উন্নতি। দশ. স্থানীয় ঐতিহাসিক বিশেষত্ব সংরক্ষণ। এগারো. কমিউনিটি সেন্টার, লাইব্রেরি, আর্ট গ্যালারি ইত্যাদি স্থাপন।  বার. শরীর চর্চা, খেলাধুলা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাকরণ। তের. গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তাকরণ। চৌদ্দ. মৃত পশু নিয়ন্ত্রণ। পনের. রাস্তাঘাটের নামকরণ। ষোল. উদ্যান, পার্ক বন স্থাপন। সতের. মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন। আঠারো. এলাকার উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ বাস্তবায়ন। উনিশ. তথ্য কেন্দ্র স্থাপন।

পৌরসভার জন্য বাধ্যতামূলক ঐচ্ছিক কার্যাবলির বিশাল ফর্দ তৈরি করে রাখা হয়েছে। কার্যাবলির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও বলা যায়, পৌরসভাগুলোর সামর্থ্য কতখানি? বিদ্যমান আর্থসামাজিক কাঠামোর মধ্যে সব সেবা প্রদান কি সম্ভব? তাই বাজেট প্রণয়নকালে স্বাভাবিকভাবেই পৌর কর্তৃপক্ষের ভাবনা, অঙ্গীকার রক্ষার তাগিদ, পৌরবাসীর প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিবেচনা গুরুত্ব পেয়ে থাকে। নাগরিকরা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেখে বুঝতে চেষ্টা করেন, আগামী এক বছর তারা কী কী সেবা পেতে চলেছেন। একটা বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা রাখা খুব জরুরি, তা হচ্ছে প্রতিটি সেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। কোন প্রকল্পের মাধ্যমে একটা কাজ শুরু করলে তা ধারাবাহিকভাবে শেষ করা না হলে নাগরিক সেবা পূর্ণতা পায় না এবং শেষ বিচারে ঋণের বোঝা বাড়া ছাড়া অন্য কোনো উপকারে আসে না।

পৌরসভাগুলোয় সাধ সাধ্যের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। কত স্বপ্ন নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেবার মান বৃদ্ধি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে আসেন। স্বপ্ন পূরণে জনবল নিয়োগ দেন, সেবা কার্যক্রম শুরু করেন কিন্তু সামর্থ্যের অভাবে সেবার বাতি নিভতে সময় লাগে না। মাঝখান দিয়ে নিয়োগকৃত জনবল পৌর কর্তৃপক্ষের ওপর দায় হয়ে পড়ে। আবার জনবল যোগ্যতার চেয়ে স্বজনপ্রীতিতে দুষ্ট হওয়ায় সমস্যাকে আরো বেশি কঠিন করে তোলে। দেশে স্থায়ী নিয়োগ এবং অস্থায়ী নিয়োগের পার্থক্য না থাকায় আন্দোলন-সংগ্রাম, আইন-আদালত করে জনবল নিজেদের রক্ষা করে। অনেক সময় মানবিক বিবেচনায়ও তারা রক্ষা পায় কিন্তু এতে করে ব্যয় বৃদ্ধি হয়। নাগরিকদের করের অর্থে জনবল প্রতিপালন সম্ভব না হলেও জোড়াতালি দিয়ে চলতে গিয়ে পৌরসভা দেনার দায়ে পড়ে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পৌর কর্তৃপক্ষকেই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। যদিও এর বিপরীত চিত্রটা আরো কঠিন। বাংলাদেশে সর্বত্রই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জনবল সংকটের কারণে সেবা প্রদান ব্যর্থতায় ভরা। দেশে জনবলের স্বরূপ হচ্ছে একটি সংস্থায় সচল গাড়ি আছে তিনটি, চালক আছেন ছয়জন এবং গাড়ি চালান সহকারী। কর্মদক্ষতার চূড়ান্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ জরুরি।

পৌরসভার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পৌরকরের যৌক্তিকতা অনস্বীকার্য। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর কর বাড়ানো হয়ে থাকে। কর বাড়ানোর সরকারি নীতিমালা থাকলেও পৌর নাগরিকদের মানসিকতা বিবেচনায় কর নির্ধারণে তার খুব একটা প্রভাব পড়ে না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, বাৎসল্য কর নির্ধারণকে প্রভাবিত করে। এটাকে একটা কঠিন আবরণের ঘেরাটোপের মধ্যে রাখে কর্তৃপক্ষ, যে কারণে কর আদায় কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্বচ্ছতার মাধ্যমে সক্ষমতার ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হলে পৌর নাগরিকরা কর প্রদানে এগিয়ে আসবেন বলেই বিশ্বাস, যা উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। নাগরিকদের কর প্রদানের মানসিকতা সৃষ্টি প্রয়োজন। এজন্য প্রথমে একটা সহজ নীতিমালা করে প্রতিজন নাগরিককে করের আওতায় আনতে হবে। লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে গেলে সাফল্য আসবে।

পৌর বাজেটের একটা বিরাট অংশ আসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে। বাজেটে বরাদ্দটা আবার নির্ভর করে ব্যক্তি, দল, ক্ষমতার বলয়ের প্রভাবের ওপর। যখন যেখানে যার জন্য প্রযোজ্য এমন একটা নীতিতে সরকারি বরাদ্দ প্রদানের বর্তমান ধারার যৌক্তিকতাও ভেবে দেখা দরকার। সরকারি অর্থে যদি সব নাগরিকের অধিকার থাকে, তাহলে বরাদ্দ কর্তার ইচ্ছায় হতে পারে না। একটা সমতার ভিত্তিতে বণ্টনের উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর পৌরসভাকে এমনিতেই সব নাগরিককে সন্তুষ্ট করার বাজেট প্রণয়ন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেখানে আবার নাগরিক সম্পৃক্ততা না বৃদ্ধি করে সম্পদ ধ্বংস করে আয় বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষণীয়। প্রাচীন পৌরসভাগুলো প্রচুর সম্পদের মালিক। জনগণ সেসব সম্পদের বহুমুখী সর্বোচ্চ ব্যবহারের নিশ্চয়তা চায়।

পৌরসভার নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধির মহাপরিকল্পনা তো নেই- বা থাকলেও তার ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। তাই আগামী ২০-৩০ বছর পর পৌরবাসী কেমন সুবিধা পাবে, তা যেমন পৌর কর্তৃপক্ষ জানে না, তেমন তার নাগরিকরাও জানেন না। অথচ তথ্য সবার জন্য জানা খুব প্রয়োজন। তাহলেই উন্নয়ন প্রকল্প ধারাবাহিকতা পাবে, সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। সেবার মান রক্ষায় নাগরিকদের মানসিকতার পরিবর্তনও সমান জরুরি। বর্তমান সময়ে আবর্জনা-পরিষ্কারের ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে আবর্জনা পরিষ্কার করে চলেছে কিন্তু নগর কি আবর্জনা মুক্ত রাখতে পারছে? নাগরিক সচেতনতা ছাড়া কোনো দিন কাজে সফলতা সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত স্থানে আবর্জনা ফেলতে নাগরিকরা ২০০ ফুট হাঁটতেও রাজি নন। নির্দিষ্ট সময়ে দিনে একবার আবর্জনা ফেলতেও রাজি নন। নাগরিকরা শুধু নিজের দরজার সামনে আবর্জনা ফেলতে রাজি নন। তারা অন্যের বাড়ির সামনে আবর্জনা ফেলতে আনন্দ উপভোগ করেন এবং কর্তৃপক্ষ আবর্জনা পরিষ্কার করার পর পুনরায় শুরু করে নতুন করে আবর্জনা ফেলা। তাই আবর্জনামুক্ত নগরীর প্রত্যাশা বৃথা। পানি নিষ্কাশনে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও তার আগা-মাথার কোনো খোঁজ নেই। কোথাকার পানি কোথায় যাবে তার ঠিক নেই। লক্ষ্য একটা থাকলেও সেখানে যে পানি যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বহু বিষয় পৌরসভায় আছে যার জন্য শুধু কর দিয়ে দায়িত্ব পালন করলেই হয় না, নাগরিক সচেতনতা খুবই প্রয়োজন।

পৌরসভার বাজেট ভাবনায় বর্তমান আশু ভবিষ্যৎ নিয়ে মহাব্যস্ততা দেখা যায়। পরিবেশ ভাবনার অভাবে সবুজের সমারোহ কমছে প্রতিনিয়ত। একের পর এক পুকুর ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। সীমিত সড়কে সীমাহীন যান চলাচলে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। মানসম্মত তদারকির অভাবে নির্মাণ জীবনকাল পাচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কিত তা বিবেচনা হচ্ছে না। সড়ক দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না, সড়ক আলোকিত করার বাতিগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না। জলাশয় নষ্ট করে ড্রেন নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রচেষ্টা নাগরিকদের জলমগ্ন করে ফেলছে। এমন অনেক ছোট ছোট বিষয় আছে যা তদারকির দুর্বলতা এবং নাগরিক সমাজের মানসিকতার অভাবের কারণে ধরে রাখা খুব কঠিন। তাই বাজেট ভাবনায় বিষয়গুলোর নজর দেয়ার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণে একটা বরাদ্দ রাখা খুব জরুরি। নিবিড় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া যেমন নির্মাণের জীবনকাল রক্ষা করা যায় না, ঠিক তেমনিই নিবিড় তদারকি ছাড়া সেবার মানও রক্ষা করা যায় না।

দেশে স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন এবং শক্তিশালী করার বহু কথা শোনা যায়। কিন্তু প্রকৃত শক্তিশালী করার কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। স্থানীয় সরকার প্রশাসনের নিম্নস্তরের শহরে এলাকার নাম হচ্ছে পৌরসভা। তাই স্থানীয় সরকারকে যদি শক্তিশালী রূপে ব্যবহার করা যায় তবে প্রশাসনকে জনগণের দোরগোড়ায় নেয়া সহজ হয়ে যাবে। শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে হাতে কাজের বিশাল ফর্দ ধরিয়ে দিলে হবে না, অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়ানোর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

এম আর খায়রুল উমাম: প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি

ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও