বিশ্ব অর্থনীতি

যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে পারল ফেডারেল রিজার্ভ?

যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো গত ১৪ নভেম্বর জানায়, গত অক্টোবরে ভোক্তা মূল্য সূচকে তেমন পরিবর্তন হয়নি। সিপিআই অপরিবর্তিত থাকার মানে প্রবৃদ্ধি হার কিংবা মূল্যস্ফীতি সব ছিল অনেকটা শূন্যে। যদিও সিদ্ধান্ত আসার জন্য এক মাস যথেষ্ট সময় নয়। কেননা গ্যাসোলিনের দাম তো প্রতি মাসে ৫ শতাংশ হারে কমবে না, যেমনটা কমেছিল সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে। তবে পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন থেকে

যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো গত ১৪ নভেম্বর জানায়, গত অক্টোবরে ভোক্তা মূল্য সূচকে তেমন পরিবর্তন হয়নি। সিপিআই অপরিবর্তিত থাকার মানে প্রবৃদ্ধি হার কিংবা মূল্যস্ফীতি সব ছিল অনেকটা শূন্যে। যদিও সিদ্ধান্ত আসার জন্য এক মাস যথেষ্ট সময় নয়। কেননা গ্যাসোলিনের দাম তো প্রতি মাসে ৫ শতাংশ হারে কমবে না, যেমনটা কমেছিল সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে। তবে পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন থেকে আরো আশাব্যঞ্জক এবং অর্থবহ ও দীর্ঘমেয়াদি তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১২ মাসে সিপিআই ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২২ সালের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চেয়ে যা অনেক কম। ক্ষণিকের জন্য, কেউ হয়তো এটা বলতেই পারেন, মূল্যস্ফীতি যুদ্ধে জয়ী হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি!

অনেক অর্থনীতিবিদের পূর্বাভাস এবং অনেক মার্কিনের দৃষ্টিভঙ্গি ছাপিয়ে মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে। এক্ষেত্রে দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানের ওপর তেমন প্রভাব পড়েনি। প্রকৃতপক্ষে, গত প্রান্তিকে প্রতি মাসে গড়ে ২ লাখ ৪ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শ্রম খাতের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের চেয়ে যা বেশি। চাঙ্গা কর্মসংস্থানে দেশটির বেকারত্ব হার কমে ৪ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। ১৯৬০-এর দশকের পর যা সর্বনিম্ন মাত্রায় নেমে এসেছে। এদিকে চলতি বছরে এ পর্যন্ত বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা এ শতকের শুরুর বছরগুলোর তুলনায় বেশি। 

অন্যান্য উন্নত দেশের অর্থনীতিতেও একই ধাঁচ লক্ষণীয়। ২০২১ ও ২০২২ সালে বিশ্বে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরে তা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। যদিও সেসব দেশের প্রবৃদ্ধির গতি মার্কিন অর্থনীতির চেয়ে ধীর ছিল। কানাডা, ইউরো অঞ্চল, জাপান ও যুক্তরাজ্য—সবার অর্থনীতিই মার্কিন অর্থনীতির চেয়ে ধীরগতিতে সম্প্রসারণ হচ্ছে। আটলান্টিকের এ পারে যেভাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে সেভাবে কমেনি অন্য পার ইউরোপে। আরেকটি বৃহৎ অর্থনীতি জাপানের মূল্যস্ফীতিও তুলনামূলকভাবে কম রয়ে গেছে।

রাজনীতির প্রথাগত ফর্মুলা মেনে এ সাফল্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। যদিও ডেমোক্র্যাট সরকারের আগের গৃহীত নীতিমালায় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এ দায় মাথায় রেখে বর্তমান সাফল্যের জন্য তাদের প্রশংসা করা যায় কি? 

বছর দুয়েক আগেও মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মূল্যস্ফীতির আসন্ন ঝুঁকিকে পাত্তা দেননি। উপরন্তু সুদের হার বৃদ্ধি করে স্বাভাবিক ভারসাম্য নীতির মাধ্যমে অর্থাৎ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান হ্রাস করেও মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বসূচকে লাগাম দেয়া যায়নি। কিন্তু তার মানে এটাও নয় যে সুদের হার বাড়লে তা অর্থনীতিতে ভিন্ন কোনো প্রভাব ফেলে না। সুদের হার এবং মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে আবাসন খাত, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের হার এবং দ্রব্যমূল্যসহ অন্যান্য নিয়ামকও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

গত দুই বছরে বন্ধকি সুদের হার তীব্রভাবে বেড়েছে যা আবাসন চাহিদা পূরণের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এর কারণ ফেডারেল ঋণের শর্তগুলো শিথিল না করে বরং আর্থিক নীতিতে কঠোর হয়েছে,৷ উপরন্তু ২০২২-এর মার্চ থেকে মার্কিন ডলারের কার্যকর বিনিময় মূল্য অন্যান্য প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার তুলনায় ৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে স্বীকৃত মুদ্রার মূল্যবৃদ্ধির ফলস্বরূপ, মার্কিন ফেডারেলের সুদের হার বৃদ্ধির বিপরীতে অন্যান্য দেশের তুলনায় নিজেদের দেশে পণ্যদ্রব্যের মূল্য কমে যায়। 

তেল, খনিজ এবং কৃষিজ পণ্যও এ মূল্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। মার্চ ২০২২ থেকে অক্টোবর ২০২৩ পর্যন্ত, সব পণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক ডলারের বিপরীতে ৩০ শতাংশের বেশি কমেছিল, যা ছিল অনেকটাই পূর্ব অনুমিত ফলাফল। উচ্চ সুদহারের প্রভাবে দ্রব্যমূল্যের বাজারে নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করে। 

কিন্তু এককভাবে এ পরিবর্তনগুলোর কোনোটি থেকেই বোঝার উপায় নেই যে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার সমান্তরালে অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এত কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণগুলো কী হতে পারে। ফিলিপ্স রেখা থেকে একে এক রকম ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এ তত্ত্বমতে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেলে বেকারত্ব হার হ্রাস পায়। আর যখন কোনো অর্থনীতিতে পূর্ণ কর্মসংস্থান বজায় থাকে তখন মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে। মার্কিন অর্থনীতিতে বেকারত্বের হার ৪ শতাংশের নিচে এবং কর্ম ক্ষেত্রে সৃষ্ট শূন্য পদের পরিমাণ ৭ শতাংশের ওপরে থাকায় চাহিদা যে পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে তা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই অর্থনৈতিক কার্যকলাপে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করর পরিবর্তে মুদ্রাস্ফীতিকে কমিয়ে দিয়েছে। 

এর আরো ভালো ব্যাখ্যাও দেয়া যেতে পারে। চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতা যা ২০২০-২২ সালে প্রবল ছিল, তা ২০২৩ সালে অনুকূলে এসেছে। কভিড-১৯-এর ফলে সৃষ্ট অচলাবস্থা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের ঘাটতি, দেশীয় জটিলতা, শ্রম সংকট এবং অন্যান্য সমস্যা তৈরি করেছিল। কিন্তু গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন প্রেসার ইনডেক্স অনুসারে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের দেয়া তথ্যমতে, এ ধরনের বাধা ২০২১-এর ডিসেম্বরে প্রবল ছিল, যা ২০২২-এর এপ্রিল থেকে ক্রমাগত হ্রাস পায়। সুতরাং বলা চলে, মহামারী চলাকালীন যে প্রবল কর্মসংকট চলছিল তা পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। যার ফলে কর্মী ও কর্মসংস্থানের একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে মসৃণ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে গেছে।

চাহিদার তুলনায় ক্রমবৃদ্ধিমান জোগানের যেকোনা অনুকূল পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার যা-ই থাকুক তা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখে। প্রশ্ন হলো, কেন এ পরিবর্তনের ফলে জিডিপি বৃদ্ধি না পেয়ে মূল্যস্ফীতি কমেছে। গত বছর থেকে মার্কিন প্রবৃদ্ধি ২০২১ সালের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। চরম অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেও মুদ্রাস্ফীতির অপরিবর্তিত অবস্থান জনমনে নিঃসন্দেহে স্বস্তি দিয়েছে 

পরিশেষে, উত্তরটা হয়তো মুদ্রানীতি কঠোর করার মধ্যেই নিহিত। যদি ২০২২ সালের মার্চের পর ফেড যদি সুদের হার না বাড়িয়ে দিত, তাহলে হয়তো মার্কিন অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করত। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন অর্থনীতিকে হয়তো আজও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়েই যেতে হতো। 

যে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য তার জন্য প্রশংসা বণ্টনই শ্রেয়। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সময়ে প্রশংসার যোগ্য দাবিদার।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

জেফ্রি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপিটাল ফর্মেশন অ্যান্ড গ্রোথ বিষয়ের অধ্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণা সহযোগী

ভাষান্তর: নূশরাত জাহান সিনথিয়া

আরও