২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের বাজেট জাতীয় সংসদে ৯ জুন উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন মহলের সঙ্গে বাজেটপূর্ব আলোচনা, মতবিনিময় এবং সংবাদপত্রের খবরাখবরে প্রকাশ, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। সে অর্থে আগামী বাজেটের আকার বাড়ছে বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। সম্ভাব্য বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। সেদিক থেকে আগামী বাজেটে ঘাটতি থেকে যাবে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৬ শতাংশের মতো এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির তুলনায় সামান্য কিছু বেশি। উল্লেখ্য, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক যে পরিস্থিতি, সেসব বিবেচনায় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের আসছে বাজেট উচ্চাভিলাষী। বৈশ্বিক মহামারী করোনার রেশ কাটতে না কাটতেই ইউরোপে শুরু হয়েছে যুদ্ধের দামামা। এমনিতেই করোনার কারণে বৈশ্বিক গড় জিডিপি নিম্নমুখী, তদুপুরি যুদ্ধের কারণে মানুষের বাজেট বরাদ্দের ধরনে এবং খরচের প্রকারে পরিবর্তন এসেছে। যুদ্ধরত দেশগুলোয় খাদ্য উৎপাদন কমছে এবং সেখানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন বাড়ছে। অনেক শঙ্কিত দেশ ও তাদের নেতারাও অস্ত্র উৎপাদন ও সংগ্রহে অধিক অর্থ ব্যয় করছে। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ তো বটেই, ইউরোপের অনেক উন্নত দেশেও কল্পনাতীত মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী পক্ষগুলোর পাল্টাপাল্টি অবরোধ আরোপের কারণে বিশ্বব্যাপী নানা পণ্যের স্বাভাবিক বাণিজ্যপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটছে। বিশ্ব বাণিজ্যে একাধিপত্য লেনদেন মুদ্রা অর্থাৎ মার্কিন ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে গেছে। অনেক দেশ প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় এবং
বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়াত্ব বরণ করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির এমন মন্দা দশা এবং তার ঢেউ বাংলাদেশেও আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকোচন লক্ষণীয়। প্রবাসী আয়ে ভাটার টান এবং রফতানিতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার মান ক্রমে নিম্নমুখী। মার্কিন ডলার যেন অধরা বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। সরকারিভাবে ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের যাবতীয় প্রচেষ্টাই ভেস্তে গেছে এবং অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কথিত ‘ডার্টি ফ্লোট’ অবস্থান থেকে সরে এসেছে। খোলা বাজারে দেশী মুদ্রার মান আরো কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক এরই মধ্যে আরোপ করেছে এবং সেসব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জনমনে অস্থিরতা ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আসন্ন বাজেটের প্রায় ৩৬ শতাংশ ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নে সরকার যে প্রচলিত পথেই হাঁটবে তা আন্দাজ করা যায়। অতীতের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে সাধারণত দুটি বিকল্প উৎস ব্যবহার করে থাকে। এক. বৈদেশিক ঋণ এবং দুই. দেশী ঋণ। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে তেমন বৈচিত্র্য না থাকলেও দেশী ঋণের প্রকারে বেশ বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। সরকার জাতীয় বাজেটে ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকঋণ অন্যতম। ব্যাংকঋণের বাইরে জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন সঞ্চয় এবং ঋণপত্রের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকেও সরাসরি ঋণ নিয়ে থাকে।
জাতীয় বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং উপায় থাকলেও আজকের নিবন্ধে অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর ঋণ এবং তার তুলনামূলক প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করা যাক। অতীত তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর মাঝে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। উদাহরণস্বরূপ ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় বাজেটে ঘাটতি মোকাবেলায় সঞ্চয়পত্র ও ঋণপত্রের মাধ্যমে অর্থ সংস্থান করেছে ৩৭ হাজার ১ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাংক খাত থেকে একই সময়ে একই উদ্দেশ্যে সরকারের ধার ছিল ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। উল্লিখিত ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ব্যাংকঋণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৬০০ কোটি এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল ২৪ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা।
প্রশ্ন হলো, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগৃহীত ব্যাংকঋণ অথবা জনসাধারণের কাছ থেকে নেয়া সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণের সুবিধা-অসুবিধা কী? অন্যভাবে বললে, কোনটি অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনে? সামষ্টিক অর্থনীতির বিবেচনায় এ প্রশ্নের একক উত্তর খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। নিকট অতীতের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন তত্ত্বে এ বিষয়ে মিশ্র মতামত লক্ষণীয়। যেমন অর্থনীতিবিদ মাসগ্রেভের (১৯৮৫) মতে, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ‘একই ব্যক্তির দুই হাত’ অর্থাৎ ডান হাত বাম হাতের কাছে ঋণী। সরকারি ব্যয় নির্বাহের মাসগ্রেভ তত্ত্ব অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ঋণে আখেরে জনগণের তেমন কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি কোনোটাই হয় না। কারণ সরকার জনগণের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জনগণের জন্যই খরচ করে। কিন্তু হালের মাসগ্রেভ তত্ত্বের বিপরীতে অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো মনে করেন, সরকারি ঋণে, হোক তা বৈদেশিক অথবা অভ্যন্তরীণ, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দায় সৃষ্টি এবং দায় স্থানান্তর হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, ধরা যাক ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা তার সঞ্চিত অর্থ এবং কিছু ঋণ নিয়ে একটি বাড়ি তৈরি করলেন। ৬০ বছর বয়সী এমন বাবার তৈরি করা শখের বাড়ি তার সন্তানাদির মাঝে আনন্দের চেয়ে শঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। কারণ সন্তানাদি ভাবতে পারে যে, বৃদ্ধ বাবার মৃত্যুর পরে বাড়ি তৈরির জন্য বাবার নেয়া দীর্ঘমেয়াদি ঋণ তাদেরকেই পরিশোধ করতে হবে। বংশ পরম্পরায় ঋণের দায় পরিশোধের বিষয়টি ‘আন্তঃপ্রজন্ম দায়’ বা ‘ইন্টার জেনারেশন ডেট বার্ডেন’ হিসেবে পরিচিত। কোনো সরকার কর্তৃক গৃহীত ঋণ সময়ের আবর্তে অন্য কোনো সরকার তথা রাষ্ট্রের জন্য দায় হিসেবে দেখা দিতে পারে।
সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে ‘ঋণ ব্যবহারে দক্ষতা’র নীতিই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। অর্থনীতিবিদ ম্যানকিউ যেমন যুক্তি দেখান যে, ঋণের মাধ্যমে অর্থসংস্থান করলে করের বোঝা কম থাকে, যা প্রকারান্তরে ‘অর্থায়নে দক্ষতার’ নামান্তর। কিন্তু ঋণ ব্যবহারে দক্ষতার সঠিক পরিমাপক বের করা সত্যিই কঠিন। সেদিক থেকে ‘কস্ট-বেনিফিট’ বা খরচের তুলনায় সুবিধা কতটুকু তা পরিমাপ করে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। সহজভাবে বলতে গেলে, ধরা যাক সামগ্রিকভাবে এ দেশে ব্যাংকিং খাতের ঋণ সরবরাহের সক্ষমতার পরিমাণ ১০০ টাকা। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে ব্যাংক থেকে এ অর্থ যে কেউ ঋণ নিতে পারে। সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের দুই ভাগে ভাগ করলে দাঁড়ায় সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগ। এখন সরকার যদি অগ্রাধিকার বিবেচনায় ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে ঋণ নিয়ে নেয়, তখন বেসরকারি খাতে ঋণ সরবরাহ কমে যাবে। সুদের হার বৃদ্ধি তখন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এরূপ পরিস্থিতিকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। বাংলাদেশে জাতীয় বাজেটের ঘাটতি পূরণে ক্রমাগত ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে সরকারি ঋণ গ্রহণের ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ কত তা পরিমাপ করা সময়ের দাবি। তা সঠিকভাবে সময়মতো মূল্যায়ন না করা হলে সরকারি উদ্যোগে সুরম্য রাস্তা তৈরি করা হলেও সে রাস্তায় চলাচলের মতো বেসরকারি উদ্যোগে কোনো গাড়ি চলাচলের সক্ষমতা থাকবে না। এরূপ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত ব্যবসা পরিচালনায় কাস্টমার বৈচিত্র্যায়নের সুযোগ হারাবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত আগামীতে এমনিতেই মুনাফার ঝুঁকিতে পড়বে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ব্যাংকের আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে ‘অফ ব্যালান্সশিট ইনকাম’ বা স্থিতিপত্র-বহির্ভূত আয়। ব্যাংকের এসব আয়ের ভেতর বিভিন্ন কমিশন, ফি, চার্জ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে যেহেতু সরকারিভাবেই আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, তাই নিঃসন্দেহে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলা এবং অন্যান্যভাবে অর্থ স্থানান্তরের মাত্রা ও পরিমাণ কমে যাবে। তখন ব্যাংকের সুদবহির্ভূত আয় কমে যাবে। অন্যদিকে ব্যাংকের তুলনায় খোলা বাজারে ডলারের দাম বেশি থাকলে প্রবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে নিরুৎসাহিত হবে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় ও আদান-প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকের যে আয় হতো, সেখানেও সংকোচন অবশ্যম্ভাবী।
একদিকে সুদবহির্ভূত আয় কমার অশনিসংকেত, অন্যদিকে সরকার কর্তৃক বেঁধে দেয়া ঋণ ও আমানতের সুনির্দিষ্ট সুদহারের কারণে ব্যাংক চাইলেও ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’-এর কারণে বাজার তথা বেসরকারি খাত থেকে বেশি সুদ নিতে পারবে না। অন্যদিকে আসছে বাজেটে ব্যাংক আমানতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ করের অভিঘাত বাড়ার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে অনেক আমানতকারী ব্যাংকে টাকা সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে অনেক ভাবনা ভাববে। সেটি হলে অনেক ব্যাংক আমানত সংকটে পড়বে। আবার এটাও ঠিক, অন্যান্য করপোরেশনের তুলনায় ব্যাংকের মুনাফার হার বেশি। কিন্তু ব্যাংক যদি মুনাফাই করতে না পারে তখন ব্যাংক কর্তৃক সরকারকে প্রদেয় করের পরিমাণ কমবে। সর্বোপরি, সরকারি অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে নৈতিকতাও বিবেচ্য হওয়া উচিত। অর্থনীতিবিদ উইলের (১৯৮৫এ) মতে সরকারি অর্থায়নে মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নৈতিক বিপর্যয় ‘মোরাল ফেইলিউর’ বটে। আসছে বাজেটে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থসামাজিক বিবেচনায় সবার জন্যই ‘উইন উইন’ নীতি প্রণীত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা।
ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক