সতেরো’শ ছিয়াত্তর। যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ কলোনি থেকে স্বাধীন দেশ হয়ে ওঠার ঘোষণা দেয়। দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের এ ঘোষণা ছিল আজকের মহাক্ষমতাধর ও ধনী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের যুদ্ধে পরাজিত করে স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছিল আমেরিকানরা।
এ অর্জনে রাজনীতিবিদ, সেনানায়কদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দেশপ্রেমিক ধনীদের। যুদ্ধের ময়দানে নয়, দেশের প্রতি তারা আনুগত্য দেখিয়েছিলেন নিজের অর্থবিত্ত খরচ করে। নিজের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করে হলেও দেশের সমৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এই ধনীরা। তাদের এ অবদানকে ইতিহাস স্বীকৃতি দিয়েছে ইকোনমিক প্যাট্রিয়টিজম বা অর্থনৈতিক স্বদেশপ্রেম হিসেবে।
এ কালপর্বে বোস্টন, চার্লসটন, সাউথ ক্যারোলাইনা ও অন্যান্য মার্কিন শহরের বেশ কয়েকজন ধনী বণিক সক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক দেশপ্রেম দেখিয়েছিলেন। আমেরিকার বিপ্লবের সূচনাকারী ছিলেন দেশটির শহরাঞ্চলের শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কলোনিগুলোর শ্রমজীবীরা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। এরপর ধনী বণিকদের সমর্থন ও সহযোগিতায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমেরিকান প্রতিরোধ বিস্তৃত হয়, তুঙ্গে ওঠে।
এর আগে ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চাপিয়ে দেয়া স্ট্যাম্প অ্যাক্টের বিরোধিতায় সক্রিয় হয়েছিলেন মার্কিন বণিকরা। কয়েক বছর পর ব্রিটিশদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তাদের অর্থনৈতিক দেশপ্রেম আরো স্পষ্ট হতে থাকে। যুদ্ধের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে অর্থের জোগান দিতে শুরু করেন তারা। জোসেফ ট্রামবুল, থমাস মিফলিন ও জেরেমিয়াহ ওয়ার্ডসওর্থের মতো বণিকদের সঞ্চিত পুঁজি ব্যয় হয় সেনাদের রসদ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কাজে।
চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে দেং জিয়াও পিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারকে কৃতিত্ব দেয়া হয়। তিনি ধনী চীন নির্মাণের ভাবনা সামনে নিয়ে আসেন। ব্যক্তিকে সুযোগ দেয়া হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য বদলের। একজন উদ্যোক্তা যেমন নিজের ভাগ্য বদলাবেন, তেমনি তার সঙ্গে বদলে যাবে চীনের অর্থনীতি, সমাজও। মাও সেতুং জমানায় ব্যক্তিগত মুনাফা, সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। সেই নৈতিক শৃঙ্খলকে সরিয়ে দেং জিয়াও পিং অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করতে শুরু করেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যক্তিজীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যবসায়িক সাফল্যে নায়কোচিত সম্মান পেতে শুরু করেন উদ্যোক্তারা। ব্যক্তি ও সমাজের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করায় তারা সামাজিক পরিসরে সম্মানিত হন। অগ্রগতির সুবিধাভোগী হন সাধারণ চীনা নাগরিকরাও। ধনীদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের ভাগ্যে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে শহর ও উপকূলীয় এলাকার নাগরিকরা উন্নত জীবনের সুবিধা পেতে শুরু করে। বৈশ্বিক পরিসরে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে চীনের উত্থান তাদের গৌরবান্বিত করে। তারা এর সঙ্গে নিজেদের সংযোগ খুঁজে পান। উৎসাহী হয়ে ওঠেন নিজের দেশকে আরো শক্তিশালী অবস্থানে এগিয়ে নিতে। এমন প্রেরণা দেশটির প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। নাগরিকদের এমন মনোভাব ও প্রয়াস চীনের জাতীয় মানসে দৃঢ় এবং শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্রের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অর্থনৈতিক স্বদেশপ্রেম নিয়ে আলোচনায় জাপানকে কোনো অবস্থায়ই বাদ রাখা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জাপানের অর্থনীতি যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তার বড় কৃতিত্ব দেশটির উদ্যোক্তাদের। এশিয়ায় আধুনিক শিল্পায়নের পথিকৃৎ জাপান। দেশটির উদ্যোক্তারা মনে করেন কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে। জাপানের বিশ্বখ্যাত গ্রুপ মিৎসুবিশি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইওয়াসাকি ইয়াতারো। বলা হয় উনিশ শতকে জেপি মরগান ও রকফেলার মিলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা করেছেন জাপানের জন্য তা ইওয়াসাকি একাই করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে ভারী ও রাসায়নিক শিল্পের বিকাশে মিৎসুবিশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাপানের অর্থনীতি শক্তিশালী হতে শুরু করলে বেড়ে যায় ব্যক্তিগত গাড়ির চাহিদা, যা পূরণ করে টয়োটা। আরেক বিখ্যাত কোম্পানি সনির যাত্রা ১৯৪৬ সালে। তাদের লক্ষ্য ছিল জাপানিদের উন্নত প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক পণ্য সরবরাহ করা। টেলিভিশন, মিউজিক প্লেয়ারের মতো পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে তারা বদলে দিয়েছিল জাপানের সংস্কৃতি।
১৯৬১ সালের মে মাসে পার্ক চুং হি দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতায় বসেন। তার নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়া দারিদ্র্য ও অশিক্ষা থেকে মুক্ত হয়ে অল্প সময়ে যে উন্নতি ঘটিয়েছে তার নজির বিরল। দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত পথে ধনী হওয়ার সুযোগও বন্ধ করেছিলেন তিনি। তার সরকার অনেক নতুন নতুন শিল্প-কারখানাকে সহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাজার বিস্তৃতির বিষয়টিতে বাড়তি গুরুত্ব দেয়া হতে থাকে। এজন্য একই খাতে সক্রিয় ডজন খানেক চেবলকে একই সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন পার্ক। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং, দাইয়ু, এলজি, লোটে, হুন্দাই ও এসকে গ্রুপের মতো চেবলগুলোর বৈশ্বিক জায়ান্ট হয়ে ওঠার বীজ বপন হয়েছিল পার্ক চুং হি সরকারের গঠনমূলক শিল্পনীতির মধ্যেই। অর্থনীতিকে আধুনিকায়ন করতে পার্কের সামনে ছিল সম্পদের সীমাবদ্ধতা। এ সমস্যা কাটাতে তিনি তৈরি করেন বিশেষ শিল্প ও বাণিজ্য জোন। দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিকায়নে পার্ক গুরুত্ব দিয়েছিলেন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরিতে, বিশেষত প্রতিযোগিতায় সক্ষম চেবল ও মেধাভিত্তিক সরকারি সংস্থায়। দিন শেষে পার্ক চুং হির প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও অর্থনৈতিক সাফল্য দক্ষিণ কোরিয়াকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা এবং আজকের উন্নত দক্ষিণ কোরিয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিল। অন্যদিকে চেবলগুলো দক্ষিণ কোরিয়ায় বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে মনোযোগী থেকেছে।
ভারতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা প্রথম হোটেলের নাম তাজ। টাটাদের এ হোটেল ঔপনিবেশিক আমল থেকে মুম্বাইয়ের গর্ব। ভারতের ভারী শিল্প খাতে নেতৃত্ব দিয়েছে টাটা। ব্রিটেনের একদা উপনিবেশ ভারতবর্ষের এ কোম্পানি এখন খোদ ইংল্যান্ডের বিখ্যাত দুই ব্র্যান্ড জাগুয়ার ও ল্যান্ড রোভার কিনে নিয়েছে। নিজেদের মুনাফার সঙ্গে সঙ্গে টাটা গ্রুপ সচেতনভাবে ভারতের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। এশিয়ার প্রথম ক্যান্সার হাসপাতাল তাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে এগিয়ে নিতে টাটা গ্রুপ ভারতে বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে ভারতের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে আদিত্য বিড়লা গ্রুপ। বলা হয় বিড়লা ভারতের প্রথম ও সবচেয়ে বড় বহুজাতিক কনগ্লোমারেট। নিজেদের দেশের অর্থনীতি ও নাগরিকদের জীবনমান এগিয়ে নিতে তাদের নিজস্ব ভাবনা-দর্শন আছে।
স্বাধীনতার পর ৫৩ বছর পার করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের বেশকিছু সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি বেড়েছে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানে নারীর উপস্থিতির হার ছিল ২৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে বিবিএসের বার্ষিক সাময়িক হিসাবে এ হার ২৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে উৎপাদনশীল খাত। দেশের মোট জিডিপিতে উৎপাদনশীল খাতের অবদান বেড়েছে। জনজীবন ও অর্থনীতিতে এখনো বড় ভূমিকা রয়েছে কৃষির। জমির পরিমাণ না বাড়লেও উৎপাদন বেড়েছে খাতটিতে। এর সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হয়েছে শিল্প খাত। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুঁজি, উদ্ভাবনী দক্ষতা, ঝুঁকির সমন্বয়ে তারা দেশের শিল্প খাতকে এগিয়ে নিয়েছেন। দেশে মোট বিনিয়োগের ৭০ শতাংশের বেশি বেসরকারি খাতের। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক, ওষুধ ও সিরামিক শিল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষভাবে নজর দেয়া যায় দেশের তৈরি পোশাক খাতের দিকে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দাবি অনুযায়ী এ খাতে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শুধু এ খাত থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রফতানি আয় (এক্সপোর্ট রিসিপ্ট) হচ্ছে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের রফতানি আয়ের প্রায় ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ।
দেশে এখন খালি চোখে নগরায়ণের গতি টের পাওয়া যায়। ইন্টারনেট, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি গ্রামগুলোয় পৌঁছে দিয়েছে নগরের নানা সুবিধা। নব্বইয়ের দশকে দেশে নগরায়ণের হার ছিল ১৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশের একটি বড় রূপান্তর ঘটেছে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে। গ্রামীণ অবকাঠামো ও জীবনযাত্রা বদলে গেছে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায়।
এসব পরিবর্তনের মূল কারিগর বাংলাদেশের পরিশ্রমী ও সংগ্রামী মানুষ। তবে বিগত ছয় দশকে এশিয়ার গড় পরিবর্তনের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ২০১০ সালে ডলারের স্থির মূল্য ধরে এডিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ছিল ৩৭২ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে বাংলাদেশে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৮৪ ডলারে। যদিও এ পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে প্রকৃত চিত্রকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। একই সময়ে গোটা উন্নয়নশীল এশিয়ার মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ৩৩০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ডলারে।
দেশের অর্থনীতির এ পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ লুণ্ঠনতন্ত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৫৩ বছরে একটি বড় লুণ্ঠনতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেখা যায়। মাফিয়াসদৃশ এ ব্যবস্থা লুণ্ঠনের জন্য সংগঠিত হয়েছে; সামাজিক এবং জনসাধারণের সম্পদ লুট ও বিদেশে পাচার করেছে। অনেক জায়গায় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সুবিধার ওপর একচেটিয়া অধিকার, পোষ্য প্রকল্প এবং আর্থিক পুঁজির অনুকূল প্রবেশাধিকার পেয়েছে। মাফিয়া সিস্টেমগুলো ‘বাজারবহির্ভূত কৌশল’ ব্যবহার করেছে। তারা ব্যক্তিগত কোষাগার পূর্ণ করতে সরকারি সম্পদ লুটেছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ১৪ হাজার ৯২০ কোটি বা ১৪৯ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ১৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।
যদিও শ্বেতপত্র কমিটির দাবি, শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এসব অর্থ পাচার হয়।
আমদানি-রফতানির মতো ব্যাংকিং চ্যানেলনির্ভর বৈধ কার্যক্রমের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হওয়ায় টান পড়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে।
আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকার পতনের পর দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে পালিয়ে থাকতে হতে পারে বলে মনে করছিলেন অর্থ পাচারকারীদের অনেকেই। এ অবস্থায় অবৈধ-অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের পাশাপাশি আমদানি-রফতানিসহ বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করেও দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করতে থাকেন তারা।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর দেড় বছরে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। অস্বাভাবিক এ উল্লম্ফনের পর হঠাৎ ধস নামে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে। লোকসানের কারণে বিনিয়োগকারীদের আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটে।
২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালানোর সময় দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই এখন খেলাপি। দেশের ইতিহাসে এত পরিমাণ খেলাপি ঋণ অতীতে কখনই দেখা যায়নি। যদিও ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে হিসাব করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
একটি দেশে ধনী পুঁজিপতি ও উদ্যোক্তারা নিজ দেশে বিনিয়োগ না করে শুধু লুণ্ঠনে মনোযোগী হলে কোনো দেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বর্তমানে বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উদাহরণ তা-ই বলছে। শুধু বিনিয়োগ নয়, দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরেও তাদের ভূমিকা থাকে। পুঁজিপতি, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ—সবাই নিজেদের দেশকে হৃদয়ে ধারণ না করলে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে রূপান্তরের পথে ধনী উদ্যোক্তাদের বিদেশমুখী হওয়াটা বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে টেনে তুলতে তাদের অর্থনৈতিক স্বদেশপ্রেম অত্যন্ত জরুরি।
স্বাধীনতার ৫৩ বছরে লুণ্ঠনতন্ত্র, স্বজনতোষণ, ভুল নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সামগ্রিক উন্নয়নে বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। ব্যাপকভিত্তিক উন্নয়নের পরিবর্তে ‘আমার ও আমার ঘনিষ্ঠ সহচরদের’ পুঁজিবাদ গড়ে উঠেছে। আবার দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকায় সন্তুষ্ট ৯০ শতাংশ সাধারণ জীবনের পাশে হঠাৎ গড়ে ওঠা উপকরণবহুল ঐশ্বর্য ও বিলাসের অট্টালিকা সমাজের শৃঙ্খলাকে ভেঙে ফেলেছে। হিংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতের পথে উৎকণ্ঠা ও অনিরাপত্তা সৃষ্টি করেছে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সরকারপ্রধান, শীর্ষ নীতিনির্ধারণী রাজনীতিক ও আমলা পরিষদ এবং তাদের ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতিরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর গোষ্ঠীতন্ত্রকে পেছনে ফেলে নতুন স্বদেশ নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যে সুযোগ আমাদের স্বাধীনতার পরও এসেছিল। কিন্তু দুবারই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। ৫ আগস্টের পর আমাদের সামনে আবার সুযোগ এসেছে গোষ্ঠীতন্ত্রকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত ও নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করার। এ যাত্রায় বাংলাদেশ সফল হবে কিনা তা আগামী কয়েক বছরেই স্পষ্ট হবে।
(এখানে লেখকের ‘ধনীদের অর্থনৈতিক স্বদেশপ্রেমকে গ্রাস করছে কেন সমৃদ্ধি’ শীর্ষক পূর্ব প্রকাশিত লেখার কিছু অংশ ব্যবহার করা হয়েছে)
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা