জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চাই

রাত পোহালেই বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০০৯ সালের পর এ দেশ একটি সত্যিকারের নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন ঘিরে মানুষের বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল কোন দিকে যায় তা নিয়ে চায়ের আড্ডায় তোলপাড় হচ্ছে। কে ক্ষমতায় বসবে তার হিসাব কিছুতেই মিলছে না। কোনো ভবিষ্যৎ বাণীই ভোটারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। ব্যাপকসংখ্যক নীরব ভোটার এবার নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে ভূমিকা রাখবেন বলে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটা গুমোট পরিস্থিতি ছিল। এ গুমোট পরিস্থিতি থেকে মুক্তি আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারপ্রধান দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন। সেই সঙ্গে তার দলের অসংখ্য নেতাকর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় আর একটি অংশ আত্মগোপনে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।

এ সরকার নিয়ে মানুষের মনে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যাপক ফারাক। অনেক কিছুই করতে চেয়েছিল এ সরকার কিন্তু একসঙ্গে এ অল্প সময়ে সব জায়গার হাত দিতে গিয়ে কাজের কাজ খুব একটা হয়নি। তাই সব শ্রেণী-পেশায় মানুষের কাছে একটি নির্বাচিত সরকারের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে দেখা যায়।

বছরের পর বছরের লুটপাট আর জঞ্জাল সরাতে সরাতেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় শেষ। ব্যাংক খাত এবং রিজার্ভের পতন রোধ করাসহ কিছু অগ্রগতি ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য সূচকে খুব একটা অগ্রগতি দেখা যায়নি। স্বৈরাচার আমলের কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখা মন্দ ঋণ বের করা ছিল এ সরকারের অন্যতম প্রাপ্তি, যা দেশের ব্যাংক খাতের সামনের দিকের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। কেন্দীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমিয়ে নিয়ে আসার জন্য ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানদের নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। প্রকৃত অর্থে যারা যৌক্তিক কারণে খেলাপি হয়েছিল তাদের জন্য এ উদ্যোগ বেশ ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করা যায়। সত্যিকার ফল পেতে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

নতুন সরকারকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানোর বিশেষ উদ্যোগ হাতে নিতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ আদালত স্থাপনের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে আছে মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে গিয়েই আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বাগে আনার অনেক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসেনি। কারণ শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিয়ে সরবরাহজনিত এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা দুরূহ ব্যাপার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সিন্ডিকেট প্রথা চিরতরে নির্মূল করতে হবে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতাহার এবং প্রতিদিনের বক্তৃতা বিবৃতিতে আশার বাণী শুনিয়ে যাচ্ছেন। মানুষজন বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখতে চাইবে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিযোগিতা মূল্যে পণ্য আমদানির ব্যবস্থা করে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া দেশীয় উদ্যোক্তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারলে পণ্য উৎপাদন যেমন বাড়বে তেমনি কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হবে।

কর্মসংস্থান আমাদের দেশের জন্য একটি বিরাট সমস্যা। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী চাকরির বাজারে প্রবেশ করে কিন্তু খুব কমসংখ্যক লোকেরই চাকরি হয়। অন্যদিকে অনেকেই বেশি যোগ্যতা নিয়ে কম বেতনে কাজ করে। তাদের একটি অংশ বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করে থাকে। অনেকেই অবৈধভাবে বিদেশে যেতে জীবনের ঝুঁকি নেয়। কেউ কেউ সফল হয় আবার কেউ সাগরে ডুবে প্রাণ হারায়, যা খুবই বেদনাদায়ক। এরা পরিবারের জন্য আজীবনের জন্য কষ্ট রেখে যায়। এসব উদ্যমী তরুণের জন্য যথাযথ কাজের ব্যবস্থা করা সামনের সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। যারাই দেশ পরিচালনার সুযোগ পাবেন তাদের কাছে জনগণের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা থাকবে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই। যারাই দুর্নীতি করবে তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে।

দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স ছিল স্বৈরাচার সরকারের পছন্দের একটি বুলি। তারা মুখে যা বলছে করেছে তার ঠিক উল্টো। আমাদের ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে এ জিরো টলারেন্স আর শুনতে চায় না মানুষ। দুর্নীতিবাজদের ধরে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাদের যেন সবাই সামাজিকভাবে বয়কট করে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। ২০১৫ সালে যখন পে-স্কেল যখন ঘোষণা করা হয় তখন বলা হয়েছিল এবার দুর্নীতি ঘুসের দাপট কমবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। আবারো বর্তমান সরকার নতুন পে-স্কেলের সুপারিশ করে রেখেছে। আশা করা করি নির্বাচিত সরকার এটা বাস্তবায়ন করবে। তবে অঙ্গীকার থাকতে হবে এটা যেন দুর্নীতি, ঘুস নির্মূলে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ক্ষমতার দাম্ভিকতা দেখতে চায় না জনগণ। জনগণের সেবক হওয়ার কথা বলে প্রভু হয়ে বসা যাবে না। সত্যিকারের সেবক হতে হবে। মানুষ কি চায় না তা বুঝে সে অনুসারে কাজ করতে হবে। জননিরাপত্তা একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরো তৎপর হওয়া প্রয়োজন। মানুষের দীর্ঘদিনের ভোট না দিতে পারার আক্ষেপ যেমন ঘুচবে তেমনি মানুষের পছন্দের দল বা জোটকে চালকের আসনে দেখতে পাবে। যারাই বাংলার মসনদে বসুন না কেন ওনাদের জনগণের পালস বুঝে কাজ করতে হবে। সব সেক্টরে একসঙ্গে না ধরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিন/চারটি সেক্টর ধরে কাজ করলে দ্রুত সফলতা আশা করা যায়।

আমাদের দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা বেশ নাজুক। ঢালাওভাবে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করা শিক্ষিত মানুষ বের না করে কারিগরি শিক্ষার দিকে জাতিকে নিয়ে যেতে হবে। যাদের দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে ডেমোগ্রাপিক ডিভিডেন্ডের পর্ব চলছে তার সঠিক ফল পেতে হলে দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা ছাড়া বিকল্প নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ প্রশিক্ষিত জনবল বিদেশে পাঠিয়ে আমাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। আমাদের সে পথ ধরতে হবে।

শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষক পেশায় সবচেয়ে মেধাবী লোকদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল করা যেতে পারে। সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিতরাই একটি দেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকারভুক্ত অগ্রাধিকারে যুক্ত করতে হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ থমকে আছে একটি স্থিতিশীল সরকারের আশায়। নতুন সরকার আসার পর তাদের পরিকল্পনা দেখে উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যমে এগিয়ে আসবেন এবং দেশে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে সে দিনের অপেক্ষায় চেয়ে আছে জাতি।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও