বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে

কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিবিএসের তথ্যে আস্থার সংকট থেকেই যাবে

আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্টে জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান ‘সি’ রেটিং পেয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান প্রশ্নবিদ্ধ। সংস্থাটির তথ্য নিয়ে অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে গবেষক ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, আয়, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সূচকের তথ্য ও মাঠ পর্যায়ে ভিন্ন বাস্তবতা উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটির তথ্যে ক্রমেই মানুষের আস্থা কমেছে। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিগত দুর্বলতা, পুরনো কাঠামো, তথ্য প্রকাশে বিলম্ব এবং পর্যাপ্ত তথ্য উন্মুক্ত না করার মতো সমস্যা। উপরন্তু এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পরিবর্তে বছরের পর বছর একই কাঠামোর মধ্যে পরিসংখ্যান কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় আস্থার সংকট আরো গভীর হচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিবিএসের কাঠামোগত সংস্কারের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত হওয়া অন্তর্বর্তী সরকার বিবিএসের পরিসংখ্যানের গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছিল। পরবর্তী সময়ে টাস্কফোর্সটি ১২টি সুপারিশও দেয়। এর মধ্যে ছিল স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যুরো গঠন, পেশাদার পরিসংখ্যানবিদকে মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ, তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পরিসংখ্যান আইন সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাব। কিন্তু সেই সরকারের মেয়াদে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের সময়েও কেন এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। অথচ এ নিয়ে সরকারের সামনে প্রস্তুতকৃত একটি সুপারিশপত্র রয়েছে। প্রয়োজন মতো সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে সংশোধন বা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেত।

সম্প্রতি নতুন করে মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে তথ্য সঠিকভাবেই দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হলো বিবিএসের তথ্যের ওপর আস্থার সংকট কাটেনি। বর্তমান সরকারের অধীনে তথ্য বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই বলে এক সম্মেলনে উল্লেখ করেছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। কিন্তু জনমনে যদি পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে তথ্য বিভ্রান্তির সুযোগ নেই—এ কথার প্রায়োগিক দিক দুর্বল থেকে যায়। সঠিক পরিসংখ্যান প্রণয়ন যেমন জরুরি, তা উপস্থাপনও এমনভাবে হওয়া চাই যাতে মানুষের মনে সংশয় না জাগে।

আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্টে জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান ‘সি’ রেটিং পেয়েছে। পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল নিয়মিত হালনাগাদ না করা এবং তথ্য প্রকাশে বিলম্বের বিষয়টি সেখানে উঠে এসেছে। মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের সামগ্রিক মান ‘বি’ হলেও এর পরিধির ক্ষেত্রে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মানুষের ধারণায় সীমাবদ্ধ নয়; তথ্যের মান, ব্যাপ্তি ও সময়োপযোগিতা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো বিবিএসের নিজস্ব ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপেও আস্থার ঘাটতি প্রতিফলিত হয়েছে। জরিপে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উত্তরদাতা মূল্যস্ফীতি, জাতীয় হিসাব, আয় ও দারিদ্র্য এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যানকে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য মনে করেননি। ফলে জনগণের বাজার অভিজ্ঞতা এবং সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে যে ব্যবধান নিয়ে প্রায় আলোচনা হয়, সেটিকে শুধু ধারণাগত ভুল বলে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, বরং সরকারি হিসাব কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তার পদ্ধতি ও উপাত্ত আরো স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

কোন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, নমুনা কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, কোন অঞ্চলের কী চিত্র—এসব তথ্য উন্মুক্ত থাকলে গবেষক ও নাগরিক সমাজ স্বাধীনভাবে তা বিশ্লেষণ করতে পারবেন। ভুল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে, আর সঠিক তথ্য হলে সেটির ওপর আস্থাও বাড়বে। তথ্য প্রকাশে বিলম্ব কমানোও জরুরি। পুরনো তথ্য দিয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতি পরিচালনা করা কার্যকর নীতি প্রণয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সরকারের উচিত টাস্কফোর্সের ১২টি সুপারিশকে আবার সামনে আনা এবং কোনগুলো কখন বাস্তবায়ন করা হবে তার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা। প্রয়োজন হলে আইন সংশোধন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিবর্তন ও বাজেট বরাদ্দের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পদ্ধতি হালনাগাদ, নিয়মিত স্বাধীন মূল্যায়ন এবং তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট অব্যাহত রেখে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই আর বিলম্ব না করে বিবিএসের দৃশ্যমান কাঠামোগত সংস্কারের দিকে সরকারের যাওয়া উচিত। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য সঠিক পরিসংখ্যানের কোনো বিকল্প নেই। একটি দেশের অর্থনীতি কোন অবস্থায় আছে, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান কীভাবে বদলাচ্ছে, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ কতটা, কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের হার বাড়ছে নাকি কমছে কিংবা দারিদ্র্য পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর। সঠিক তথ্য ছাড়া সমস্যার প্রকৃত চিত্র যেমন বোঝা যায় না, তেমনি সঠিক নীতিও নেয়া সম্ভব হবে না। এতে বরং সরকার নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

আরও