কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বাধীনতা দিলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব

দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে প্রবৃদ্ধি, মেগা প্রকল্প, রফতানি সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিশ্চিত করার বাস্তবতা। অন্যদিকে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতির চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতার দরুন আর্থিক ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে নীতিগত অনিশ্চয়তা। এ দ্বৈত বাস্তবতা এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। আর এ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন, সামষ্টিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা সুগম করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কিনা।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল প্রবৃদ্ধির অংক দিয়ে বিচার করা যায় না। নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা—এ তিন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে এর ভিত তৈরি হয়। আমাদের অর্থনীতির জন্য এ তিন বিষয়কে সমন্বয়ের কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সমন্বয়ের জন্য যে স্বাধীনতা জরুরি তা পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক অগ্রাধিকারে পরিচালিত হয়। মুদ্রানীতি বা অর্থনীতির প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটি আর কাজ করতে পারে না। ফলে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দুর্বল শাসন দেখা যায় এবং সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ ব্যাহত হয়। এজন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দিতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে সহজ হয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি সব শ্রেণীর মানুষের জীবনে চাপ তৈরি করে। বিশেষত নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে ফেলে। এমনকি ব্যবসার ব্যয়ও নানাভাবে বৃদ্ধি করে। এজন্য আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদহার নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু যখন সুদহার নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে, তখন বাজারে ভুল বার্তা পৌঁছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিসরের এবং অনেক সম্ভাবনাময় খাত নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তাই বিনিয়োগ থেমে যায় এবং খরচ বাড়ায় সঞ্চয়ও নিরুৎসাহিত হয়।

এ তো প্রথম দিক। দ্বিতীয়টি হলো আর্থিক খাতে ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ব্যাংক সচরাচর গ্রাহকদের কাছ থেকে জামানত সংগ্রহ করে এবং এটিকেই তারা পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। এ পুঁজি ঋণ আকারে বিতরণ করে ব্যাংক আয় করে। কিন্তু ব্যাংকে যখন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণখেলাপি বাড়ে, তখন তারল্য সংকট দেখা দেয়। মূলত প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা বড় অংকের অর্থ নানাভাবে নিলেও তা ফেরত দেন না। এ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়াটাই স্বাভাবিক। খেলাপি ঋণ বাড়লে যে তারল্য সংকট দেখা দেয় তাতে মূলধন দুর্বল হয়। ওই ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা কমে যায়। আরেকটি বাস্তবতা হলো, এ সময়ে ব্যাংকগুলোও ঝুঁকি নেয়াকেই নিরাপদ ভাবে। তারা ধরে নেয়, শেষ পর্যন্ত এসব অর্থোদ্ধার হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন স্বাধীনভাবে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এসব সংকট মোকাবেলা করা সহজ হবে। ব্যাংকিং সংকটে দ্রুত সিদ্ধান্ত জরুরি। রাজনৈতিক অনুমোদনের অপেক্ষা করলে সংকট গভীর হয়। স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারে; নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠান পারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু এ বাস্তবও অস্বীকারের উপায় নেই—কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং দিচ্ছেও। আর্থিক খাতে তদারকিতে রাজনৈতিক চাপ, ঋণ বিতরণে অস্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে। ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করে। মধ্যস্থতাকারীর ওপরই যদি আস্থা কমে যায়, তাহলে বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে যাবেন, এমনটাই স্বাভাবিক। আস্থাহীন পরিবেশে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা দুরূহ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো দায়িত্বহীন আচরণ বাড়িয়ে দেয় বলে নৈতিক ঝুঁকি বাড়ে।

অর্থনীতিতে তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রকৃতপক্ষেই স্বায়ত্তশাসন দিতে হয়। বিশ্বের অনেক দেশই বিষয়টুকু অনুধাবন করেছে। কারণ আর্থিক ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতাও। যুক্তরাজ্য ১৯৯৭ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যকর স্বাধীনতা দেয়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এখন রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়াই সুদের হার নির্ধারণ করে। এজন্য ইংল্যান্ডের আর্থিক খাতে স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি, শক্তিশালী বিনিয়োগ পরিবেশ, আন্তর্জাতিক আস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাখা গেছে। ১৯৯৭-৯৮ সালে এশীয় সংকটের পর ইন্দোনেশিয়াও আর্থিক খাতের দায়িত্ব ভাগ করে ফেলে। দেশটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি দেখে আর আলাদা সংস্থা ব্যাংক তদারকি করে। এতে রাজনৈতিক প্রভাব কমে, নিয়ন্ত্রক দক্ষতা বাড়ে।

এসব উদাহরণ দেখে একটি বিষয় স্পষ্ট। শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান জরুরি। কেমন স্বাধীনতা আসলে? স্বাধীনতা মানে জবাবদিহিতা নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণহীন হবে না। মূলত রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখার পেশাদার সিদ্ধান্ত হিসেবেই এটিকে বিবেচনা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইন বিভাগের কাছে জবাবদিহি করবে। কিন্তু ব্যাংকের কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণ হবে অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে। এভাবে গণতন্ত্র দুর্বল হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার বিষয়টি অনুধাবন করলেই হবে না। উদ্যোগ নিয়েও ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে আইন সংশোধন করতে হবে। মুদ্রানীতিতে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ সীমিত করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় সুদহার নির্ধারণ না করে অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্য ব্যাংকগুলোর ব্যাংক বলে পরিচিত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারকির পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে এবং সমস্যা সমাধানে দ্রুত হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা দেয়াও বাঞ্ছনীয়। এ সবকিছুর সমন্বয়ের পাশাপাশি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ও সংসদীয় তদারকি নিশ্চিত করতে পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন হবে।

এ সবকিছুই আমাদের দ্রুত করতে হবে। দেরি করলেই বিপদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসন না দিলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে না। কারণ ব্যাংক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এ খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। ব্যাংকগুলো দায়িত্বহীন আচরণ করলে মুদ্রাবাজারে চাপ বাড়ে। যখন অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতে সংকট তীব্র হয় তখন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আর বাজারের প্রতি আগ্রহী থাকেন না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখন ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা জরুরি অবশ্যই। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা বেশি জরুরি। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপ নিতে চায়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারবে, এমনটি নিশ্চিত করতে হবে। এটিকে শুধু প্রয়োজন বলে আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। আইনি পর্যায়ে একে ক্ষমতায়ন করতে হবে।

মোহাম্মদ কবির হাসান: অধ্যাপক, ফিনান্স বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিয়েন্স, যুক্তরাষ্ট্র

আরও