সময়ের ভাবনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ অর্থনীতির বিরুদ্ধে যেতে পারে

বাংলাদেশ ব্যাংক তার নীতিগুলো গ্রহণের ক্ষেত্রে মনে হয় দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। অনেক লোকের কথা শুনতে গিয়ে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যেন নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আজকে এক নীতি, কালকে আবার সেই নীতিতে পরিবর্তন—এসব করার মাধ্যমে নিজেদের কাজকে নিজেরাই হালকা করে ফেলেছে। আশির দশক-নব্বইয়ের দশকের উদাহরণ তো আমাদের সামনেই আছে। নীতি প্রণয়নের

বাংলাদেশ ব্যাংক তার নীতিগুলো গ্রহণের ক্ষেত্রে মনে হয় দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। অনেক লোকের কথা শুনতে গিয়ে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যেন নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আজকে এক নীতি, কালকে আবার সেই নীতিতে পরিবর্তন—এসব করার মাধ্যমে নিজেদের কাজকে নিজেরাই হালকা করে ফেলেছে। আশির দশক-নব্বইয়ের দশকের উদাহরণ তো আমাদের সামনেই আছে। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তখন বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক সাফল্যের প্রমাণ রেখেছিল। সেই সাফল্য ২০১০ বা তার পরবর্তী কয়েক বছরে বজায় ছিল। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক তাল হারিয়ে ফেলল যখন এর স্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দ্রুত পতন হতে লাগল। শুরু হয়ে গেল স্থানীয় মুদ্রার দ্রুত মূল্য পতন, সেই সঙ্গে অর্থনীতিতে বাড়তে থাকল মুদ্রাস্ফীতি। এ দুইকে সামাল দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নীতি সুদহার বাড়াতে লাগল। উদ্দেশ্য হলো, নীতি সুদহার বাড়িয়ে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। ঠিক যেমনটি শুরু করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের উন্নত দেশগুলো। আর বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ের ক্ষেত্রে অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়ে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যকে যথেষ্ট বাড়তে দিল। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্যে ছিল—এতে করে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স বাড়ানো যাবে। আর ঋণ বিক্রেতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) চাচ্ছিল মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক হোক এবং সেই সঙ্গে সুদহারও। প্রথম দু-চার মাস বাংলাদেশ ব্যাংক এ দুই ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গভাবে এ দুটো হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে নারাজ ছিল।

এক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও সুদের হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা ধরনের ফর্মুলার আশ্রয় নেয়। যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের আর্থিক খাত এতটা স্বচ্ছ নয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিযোগিতামূলকও নয়। এ যুক্তিতে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় ক্ষেত্রে ম্যানেজড ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট গ্রহণ করে সফলতা পেয়েছিল। একই যুক্তিতে দুই বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ধরনের বিনিময় হারের পক্ষে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই অবস্থান যেন উবে গেল। বাইরের সমালোচনার কাছে বা আইএমএফের ইচ্ছার কাছে তারা মুদ্রা বিনিময় হারকে এবং সেই সঙ্গে সুদের হারকেও অনেকটা বাজারের ওপর ছেড়ে দিল। কিন্তু এতে কি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে না মুদ্রাস্ফীতি কমবে? আমাদের বিবেচনায় এর কোনোটাই হবে না। বরং অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, ভোগ কমবে এবং মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়বে। প্রথম কথা হলো, অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি কমানোর দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন একা নিতে হবে। যেসব উন্নত দেশে মূল্যস্ফীতি মনিটারি ফেনোমেনন হিসেবে দেখা দেয় সেসব দেশ তখন নীতি সুদহার বাড়িয়ে চাহিদাকে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওইসব দেশে মূল্যস্ফীতি আর মুদ্রাস্ফীতি সমার্থক। অনেক বছর ধরে ওইসব উন্নত অর্থনীতি সুদের হারকে শূন্যের কাছাকাছি এনে অর্থনীতিতে অধিক মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনীতি সম্প্রসারণের দিকে যায়। ওই ধরনের সম্প্রসারণমূলক নীতি তারা কয়েক যুগও অনুসরণ করতে পারে। একপর্যায়ে সবকিছুর মূল্য বেড়ে গেলে ওইসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সংকোচনশীল মুদ্রানীতি গ্রহণের মাধ্যমে সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে। ওইসব দেশের অর্থনীতি শ্রমনির্ভর। আর আমাদের মতো অর্থনীতিগুলো বিকাশমান অর্থনীতি, এসব অর্থনীতিতে সুদের হার কম রেখে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জোগান বাড়ালে মূল্যস্ফীতি হওয়ার কথা নয়।

মূল্যস্ফীতির উৎস কী? তিনটি উৎস—এক. জোগানের কমতি; বিনিয়োগ কম হলে জোগানও কম হবে। দুই. বৈদেশিক মুদ্রা; বিনিময়ের বাজারে টাকা যদি মূল্য হারায় তাহলে রিজার্ভ কমে গেলে টাকা মূল্য হারাবে এটাই স্বাভাবিক। তিন. অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ ঘটলে বা সরকার যদি বড় রকমের ঘাটতি বাজেটের দিকে পা ফেলে তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ের ব্যাপারটি বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিনিয়োগের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেড) নীতি সুদহার বাড়িয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই নীতি অনুসরণ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে রিয়েল এফেক্টস এক্সচেঞ্জ রেট নামে একটি নীতি অনুসরণ করত। এখন মনে হয় ওই নীতি থেকে সরে এসেছে। তবে এটা ছিল পরীক্ষিত এবং উঠতি অর্থনীতিগুলোর অনেকেই ওই নীতি অনুসরণ করে আসছিল। যেসব অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে ঘাটতি আছে, ওইসব অর্থনীতিতে বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের অনেক খারাপ দিক আছে। 

ইচ্ছা করলে এখানেও সিন্ডিকেট ট্রেডিং হতে পারে। হঠাৎ করে সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হতে পারে। এই যে আমাদের টাকা ১ ডলারের বিপরীতে ৮৩ টাকা থেকে ১০৫-১১০ টাকায় পৌঁছল। এর কারণ কী ছিল? মূল কারণ ছিল নির্বাচন-পূর্ববর্তী দিনগুলোয় বড় রকমের অর্থ পাচার। পাচারকারীরা তো পাচার করেছে বাজার থেকে ডলার কিনে। ডলারের প্রাপ্যতাকে এমন এক সংশয়ের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো যে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ধনী লোকেরা ডলার কিনে ঘরে তুলতে লাগল। ওই অবস্থা থেকে অর্থনীতি গত ছয়-সাত মাসে অনেকটাই মুক্তি লাভ করেছিল। খোলা বাজারে ডলারের হার কমে ১১৪-১১৫ টাকায় এসেছিল। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই নিজের মুদ্রার বড় ধরনের মূল্যপতন না ঘটালে ডলার রেট ১১০-১১২ টাকায় এসে যেত। কিন্তু এখন আর তা হওয়ার নয়। এখন ডলার খোলা বাজারে ১২০-১২৪ এ ধরনের একটা হারের মধ্যে চলে যেতে পারে। 

টাকা-ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে হুন্ডি মার্কেট বা কার্ব মার্কেট বা ডলারের বেচাকেনার কালো মার্কেট কি চলে যাবে? যাবে না। কারণ ওইসব মার্কেটের উদ্ভব হয়েছে অর্থনীতির অন্যান্য নিয়ন্ত্রণের কারণে। অন্যদিকে বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার ফলে কি বৈদেশিক মুদ্রায় স্থিতি বাড়বে? সেটাও ঘটবে না। আমাদের লোকেরা যারা বিদেশে কাজ করে তারা তাদের বেতন-ভাতার প্রায় সবটাই দেশে রেমিট্যান্স হিসেবে প্রেরণ করে, সেটা তারা কতটা প্রেরণ করবে তার বিনিময় হারের সঙ্গে অতটা সম্পর্কিত নয়। দুটো বাজার যেখানে বজায় থাকবে সেখানে তারা কথিত হুন্ডি মার্কেটের বেশি অর্থ পেলে সেই বাজারের মাধ্যমেও প্রেরণ করবে। 

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রেরণ রেটের সঙ্গে অনেকটা অস্থিতিশীল। অন্যদিকে টাকার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে ফরেন এক্সচেঞ্জের স্থিতি এ কারণেই বাড়ানো যাবে না—বাংলাদেশ অর্থনীতি আগের তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রায় বেশি ব্যয় করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি বিনিময় হারের সঙ্গে সামান্যই সংযুক্ত। যতদিন লেনদেনে আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টস থাকে ততদিন আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ কমতেই থাকবে। ফরেন এক্সচেঞ্জ বৃদ্ধির কোনো জাদুকরী ফর্মুলা কারো হাতে নেই। এটা তখনই বাড়বে যখন এ অর্থনীতির রফতানি অনেক বাড়বে, আমাদের প্রবাসীরা আরো বেশি করে রেমিট্যান্স প্রেরণ করবেন এবং আমাদের অর্থনীতিতে বৈদেশিক উৎস থেকে বিনিয়োগ প্রবাহিত হবে। আমরা এরই মধ্যে সাধ্যের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ করেছি এবং এখনো আমাদের সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সমানে ঋণ করে যাচ্ছে। এর ফল হবে আমাদের অর্থনীতিতে সবসময় একটা অস্থিরতা বজায় থাকবে এবং অনেক দিন ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকবে। বাংলাদেশ সরকারের আরো কম ব্যয়ের দিকে যেতে হবে। অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন না করলে রাজস্ব আরো কম হবে। এখন যদি ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা হয়, তাহলে ঘাটতি বাজেটের পরিধিও বাড়তে থাকবে।

যেভাবে অর্থনীতির নীতিগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে তাতে অর্থনীতিকে সংকট থেকে বাঁচানোর তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মাইক্রোইকোনমি স্থিতিশীল না থাকলে মূল্যস্ফীতিও কমবে না, কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগও হবে না। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিশোধের ভারে ভারাক্রান্ত হতে থাকবে। কোনো দেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশন মতো চলে সংকটের সমাধান করতে পারেনি। আইএমএফ তাদের প্রটোকল অনুযায়ী উপদেশ দেবে। তাদের সব কথাকে যে শুনতে হবে এমন নয়। নীতি সুদহার এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ (ফেড) অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কমিয়ে আনার চিন্তা করছে। ওই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক পুনরায় এ হারকে বৃদ্ধি করা ঠিক হয়নি বলে আমি মনে করি। সুদের হারকে অনেক বাড়িয়েও এ দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃদ্ধির এ নীতি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। 

আবু আহমেদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান

আরও