নগরজুড়ে বর্জ্য অব্যবস্থাপনা

ঢাকার পরিবেশগত মানোন্নয়নে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই অদক্ষতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখনো ল্যান্ডফিলের বর্জ্য পোড়ানো হয়, যার ফলে ঢাকার বায়ুদূষণের তীব্রতা বেড়ে চলেছে।

প্রাণপ্রকৃতির অবস্থা থেকে একটি শহরের স্বাস্থ্যমান, প্রাকৃতিক পরিবেশের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশ মানসম্মত না হলে সেখানে জীববৈচিত্র্য কমে আসে। বাস্তুতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঢাকার আকাশে কাক বা অন্যান্য পাখির আনাগোনা কমে যাওয়া, বিপরীতে ভুবন চিলের ঝাঁক বেড়ে যাওয়া শহরটির প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিস্থিতিই তুলে ধরছে। এর সঙ্গে নগরের পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উন্মুক্ত বর্জ্যের সহজলভ্যতা ভুবন চিলের জন্য খাদ্যের উৎস তৈরি করছে। ফলে চিলের উপস্থিতি বাড়লেও এটিকে নগরের পরিবেশের উন্নতির লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি নগরের পরিবর্তিত বাস্তুতন্ত্র এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি ইঙ্গিত বলেই পরিবেশবিদ ও পাখি গবেষকরা মনে করছেন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই অদক্ষতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখনো ল্যান্ডফিলের বর্জ্য পোড়ানো হয়, যার ফলে ঢাকার বায়ুদূষণের তীব্রতা বেড়ে চলেছে। ফলে সংগত কারণেই বায়ুমান-সংক্রান্ত দেশীয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বা গবেষণায় দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে শীর্ষে থাকছে ঢাকার নাম। যদি নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য নেয়ার পরও তা সঠিকভাবে পৃথক্‌করণ, পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশগত নিয়ম মেনে সেগুলো অপসারণ করা না হয়, তাহলে কখনই বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে না। বিশেষ করে জৈব বর্জ্য, প্লাস্টিক, চিকিৎসা বর্জ্য ও রাসায়নিক বর্জ্য একসঙ্গে ফেলার প্রবণতা পরিবেশের ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করছে। আবার ঢাকার ল্যান্ডফিলের সংখ্যাও অপ্রতুল। যেগুলো আছে সেগুলোর ধারণক্ষমতাও শেষ। উপরন্তু ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ফাঁকা স্থান কমছে।

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দুটি প্রধান ল্যান্ডফিল রয়েছে। একটি মাতুয়াইলে, অন্যটি আমিনবাজারে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ২৫০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা এ দুটি ল্যান্ডফিলে অপসারণ করা হয় বলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্য জানাচ্ছে। আবার এ দুই ল্যান্ডফিলের বর্জ্য অপসারণে কোনো দক্ষ ব্যবস্থাপনা না থাকায় আগুন লাগার মতো ঘটনার নজির কম নয়।

অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করা হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্লান্ট। যেমন ভারতে রয়েছে ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি প্লান্ট’। এছাড়া দেশটি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাসও উৎপাদন করে। অন্যদিকে নেপালে কমিউনিটিভিত্তিক কম্পোস্ট প্লান্ট পরিচালনা করা হয়। বিশেষ করে হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাদ্য বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হয়। এভাবে স্থানীয়ভাবেই দক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হচ্ছে। কিন্তু প্রায় আড়াই কোটি মানুষের ঢাকা শহরে আজও দক্ষ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়নি।

এটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা হতে পারে না, বরং সদিচ্ছার অভাবকেই প্রতিফলিত করে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথক্‌করণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধার এবং জৈব বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির ব্যবস্থায় জোর দেয়া হয়। এটা নিশ্চিত করা গেলে কেবল ঢাকার বায়ুমান উন্নত হতো না, দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হতো।

এখানে আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়, সামগ্রিকভাবে ঢাকার পরিবেশগত মানোন্নয়নে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। যে কারণে সময়ের পরিক্রমায় ঢাকার সবুজ পরিসর ও জলাধার কমেছে। এটিও প্রাণপ্রকৃতির বৈচিত্র্য হ্রাস ও পরিবেশে অবনতির বড় কারণ। যেমন পর্যাপ্ত সবুজ ও জলাধারের অভাবে ঢাকা ক্রমেই ‘হিট আইল্যান্ড’ হয়ে উঠছে। তাই কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করলেই নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরবে না। সবুজ পরিসর সংরক্ষণ, জলাশয় রক্ষা, খাল পুনরুদ্ধার এবং উন্মুক্ত জায়গা সংরক্ষণের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। এগুলো নগরের বাস্তুতন্ত্র, জনস্বাস্থ্য ও প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

রাজধানীর সড়ক, বাজার, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার আশপাশে দীর্ঘ সময় বর্জ্য পড়ে থাকা কিংবা খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার প্রবণতা নানা ধরনের প্রাণীর জন্য খাদ্যের উৎস তৈরি করছে। তবে মিশ্র বর্জ্যের মধ্যে থাকা প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও দূষিত খাদ্য প্রাণীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্য থেকে রোগ-জীবাণু ও দূষণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা মানুষের ক্ষেত্রেও কম নয়। কাজেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে শুধু আবর্জনা অপসারণের কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ অবস্থায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথক্‌করণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট ও জ্বালানি উৎপাদন এবং অবশিষ্ট বর্জ্যের পরিবেশসম্মত অপসারণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা ও বর্জ্য পোড়ানো বন্ধেও কঠোর নজরদারির।

পাশাপাশি ঢাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সবুজ এলাকা, জলাশয় ও খাল রক্ষায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত প্রভাবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া জরুরি। কারণ একটি শহর শুধু সড়ক, ভবন ও অবকাঠামোর সমষ্টি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, জলাধার ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র। এসবের কোনো একটি উপাদান বিপর্যস্ত হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপরই পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।

আরও