বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, কিন্তু পরবর্তী পাঁচ বছরে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের শেষে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে শেষ দুই বছরেই বেড়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৬ বছরের ঋণের ক্রমপুঞ্জিত দেনার চেয়েও বেশি ঋণ বাংলাদেশ মাত্র গত পাঁচ বছরে গ্রহণ করেছে। আবার প্রায় ৭২ শতাংশই শেষ দুই বছরে। এ চিত্র বড়ই ভয়ংকর! কিন্তু চিত্র যত ভয়ংকরই হোক না কেন, এ ঘটনার খুব সামান্যই সাধারণ মানুষ জানে বা তাদের সেটি কখনই জানানো হয়নি। অবশ্য তারা তা না জানলেও বা তাদের তা জানানো না হলেও শেষ পর্যন্ত তাদেরই এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যদিও তাদের প্রায় ৪২ শতাংশ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
এ অবস্থায় স্বভাবতই
প্রশ্ন জাগে,
এত অল্প
সময়ের মধ্যে
গৃহীত বিপুল
পরিমাণের এ ঋণ কোথায়,
কীভাবে ব্যবহার
করা হলো? যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে কি তা গ্রহণ
করা হয়েছে?
অর্থাৎ যেখানে
যেখানে তা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখান
থেকে এ ঋণের অর্থ
উঠে আসবে
তো? অথবা
এ দেনা
কোত্থেকে, কীভাবে
পরিশোধ করা হবে, ঋণ গ্রহণের আগে সেটি কি নিশ্চিত করা হয়েছে অর্থাৎ
এ ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য
বাংলাদেশের আছে তো? দ্বিতীয়
প্রশ্ন, এ ঋণ গ্রহণের
আগে উপযুক্ত
পর্যায় থেকে
এর অনুমোদন
নেয়া হয়েছে
কিনা? তৃতীয়
প্রশ্ন, যৌক্তিক-অযৌক্তিক যে বিবেচনা থেকেই
এ ঋণ গ্রহণ করা হয়ে থাকুক
না কেন, উল্লিখিত ঋণ পরিশোধের বাস্তব
সামর্থ্য যদি বাংলাদেশ কোনো
পর্যায়ে হারিয়ে
ফেলে, তাহলে
কী হবে কিংবা দাতারা
তখন এক্ষেত্রে
কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে? চতুর্থত, এসব ঋণ গ্রহণের
সঙ্গে ইউক্রেন
যুদ্ধের কোনোরূপ
সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা। পঞ্চমত,
উল্লিখিত ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ বিষয়ে কোনোরূপ
জবাবদিহিতা আছে কিনা।
উপরোক্ত প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে আলোচনার সূত্রপাত করলে প্রথমেই বলতে হয়, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা, এসব ঋণ যেসব কাজে ব্যবহার করা হয়েছে তার সবই অত্যাবশ্যকীয় কাজ ছিল না এবং সেগুলো যথাযথ ব্যবহূতও হয়নি। এটি সাধারণ ধারণা থেকে বলা। কিন্তু সরকার যদি মনে করে, এ ধারণা সঠিক নয়, তাহলে তাদের উচিত হবে, ওই সব ঋণ কোথায় কীভাবে ব্যবহূত হয়েছে অবিলম্বে তা জনগণকে জানানো। কাজটি কঠিন নয় মোটেও। কারণ এ ঋণ খুবই সাম্প্রতিক সময়ে নেয়া এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা এখনো দগদগে, কিন্তু সরকার যদি উল্লিখিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ না করে, তাহলে এ বিষয়ে সাধারণের মনে সন্দেহ আরো তীব্র হবে এবং উপরোক্ত ধারণাকেই মানুষ সঠিক বলে ধরে নেবে। সত্যি কথা বলতে কি, যুক্তির বিচারে বিষয়টি অনেকটা সাধারণ মানুষের ধারণার অনুরূপই দাঁড়ায় কিনা?
পরবর্তী প্রসঙ্গ, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে এসব ঋণ নেয়া হয়েছে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ থেকে পরিশোধিতব্য ঋণের অর্থ উঠে আসার বিষয়টি তথ্যভিত্তিক বা প্রমাণিত কিনা। যদি যথাযথ সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে ওই ঋণ নেয়া হয় এবং এর রিটার্ন অর্থাৎ ঋণের অর্থ ফেরত প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে এটিও জনসমক্ষে প্রকাশ করে জানানো উচিত, উল্লিখিত ঋণ পরিশোধের বিষয়ে সরকার কোনো চাপের মধ্যে নেই, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণভাবেই তারা তা পরিশোধ করে যেতে পারবে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কি আসলেই তাই? আসলেই কি যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে ওইসব ঋণ নেয়া হয়েছে? প্রকাশিত তথ্য কিন্তু তেমনটি বলে না। বরং জানায় এ কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপযুক্ত সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই যেনতেনভাবে এবং অতিক্ষুদ্র প্রয়োজনে এসব ঋণ নেয়া হয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা ব্যবহূতও হয়েছে অত্যন্ত অদক্ষ ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। সে কারণে ওই ঋণ পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগক্ষেত্রগুলো থেকে খুব সামান্য অর্থই উঠে আসছে।
পরবর্তী প্রশ্ন, যা আসলে বৈধতার প্রশ্ন। উল্লিখিত ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়েছে কিনা। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে, এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন।’ কিন্তু দাতাদের কাছ থেকে গত পাঁচ বছরে গৃহীত ১৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের আওতাধীন কোনো ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের আগে তা রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়েছে কিনা, আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে অবস্থানকারী সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের তা বলতে পারার কথা নয়। তবে এটি অনেকটা হলফ করেই বলা যায়, এ ধরনের কোনো ঋণচুক্তি কখনো জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়নি। এর মানে হচ্ছে, উল্লিখিত ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংবিধান নির্ধারিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়নি।
ওপরের
তৃতীয় প্রশ্ন
ছিল, বাংলাদেশ
যদি কোনো
পর্যায়ে ওই ঋণ পরিশোধের
সামর্থ্য হারিয়ে
ফেলে, তাহলে
কী হবে এবং সেক্ষেত্রে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়াই বা কী হতে পারে? সত্য
স্বীকারে দ্বিধা
না থাকলে
স্পষ্টতই মানা
দরকার, উল্লিখিত
ঋণের অর্থ
যেভাবে অনগ্রাধিকারমূলক কাজে ও অস্বচ্ছ
পন্থায় ব্যবহার
করা হয়েছে,
তাতে ঋণের
কিস্তি পরিশোধের
জন্য প্রয়োজনীয়
অর্থ কখনই
সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো থেকে উঠে আসবে
না। ফলে এ ঋণের
কিস্তির অর্থ
দরিদ্র জনগণের
ওপর বাড়তি
কর আরোপের
মাধ্যমেই যে সংগ্রহের উদ্যোগ
নিতে হবে, তাতে কোনো
সন্দেহ নেই।
কিন্তু চরম অর্থনৈতিক দুরবস্থার
মধ্যে নিমজ্জিত
দেশের সাধারণ
জনগণের পক্ষে
সে বাড়তি
কর পরিশোধ
কতটা সম্ভব?
এ অবস্থায়
একটি বিকল্প
সমন্বিত উপায়
হতে পারে,
ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে কিছুটা মানবিক ছাড় দেবে। আন্তর্জাতিক ঋণচুক্তির ঐতিহ্যিক প্রথা
অনুযায়ী এ-জাতীয় সব চুক্তিতেই এরূপ
অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত থাকে যে ঋণগ্রহীতা
কোনো কারণে
ঋণ পরিশোধে
অপারগ হলে তাকে কিস্তি
বা সুদ ছাড় দেয়া
হবে, কিন্তু
বাংলাদেশের সঙ্গে
সম্পাদিত ঋণচুক্তিগুলোতে কী আছে, এ ব্যাপারে দেশের
সাধারণ মানুষ
কিছুই জানে
না। কারণ
সাধারণ মানুষকে
জানিয়ে স্বচ্ছতার
সঙ্গে এসব করা হয়নি।
তার পরও আশা করব, সংশ্লিষ্ট দাতারা
এ ব্যাপারে
আন্তর্জাতিক রীতিনীতি
মেনে যৌক্তিক
ও সম্মানজনক
প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফসহ পূর্ব-পশ্চিমের অনেক দাতা প্রায়ই বাংলাদেশের নানা বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ তোলেন, যা মোটেও অযৌক্তিক নয়। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তারা বাংলাদেশকে যে ১৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, সেসব স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহূত হয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন কি তারা ওঠাবেন? না, ওঠাবেন না। কারণ তাতে তাদের অর্থলগ্নি করে মুনাফা অর্জনের মূল কাজটিই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। অতএব এসব ক্ষেত্রে শত অনিয়ম ঘটলেও তারা যে ওইসব ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া এ ঋণ কার্যক্রম তো তাদের জীবন-জীবিকা তথা চাকরি বাকরিরও রক্ষাকবচ। ফলে ঋণই যদি না থাকে, তাহলে তাদের চাকরি বাকরিও যে থাকে না! অতএব নীতি এই, ‘তুমিও খাও আমিও বাঁচি।’ আর ঋণ সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, এ ১৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত মোকাবেলার কোনো সম্পর্ক নেই। উল্লিখিত ১৪ বিলিয়ন ডলার যুদ্ধ শুরুর আগেই নেয়া হয়েছে।
চরম অসহনীয় মাত্রায় ও অতিকঠিন শর্তে গ্রহণকৃত বিপুল পরিমাণ (প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার) ঋণের বোঝা এখন বাংলাদেশের ঘাড়ের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। সরকার মুখে যা-ই বলুক না কেন, প্রকৃত সত্য, এ ঋণ পরিশোধের সহজ সামর্থ্য এখন বাংলাদেশের নেই। এ অবস্থায় বাইরের কারো কাছ থেকে আর একটি পয়সা ঋণও যদি নেয়া হয়, তাহলে সেটি হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। কিন্তু এর পরও যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বাংলাদেশ আবারো সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ নিতে যাচ্ছে, তা কি যথেষ্ট দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহারের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোরতা অবলম্বন করা হবে? এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, এরই মধ্যে গৃহীত ১৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গিয়েছে বলে নানা মহল থেকে যেসব অভিযোগ করা হয়, একই ধরনের অভিযোগ আইএমএফের নতুন সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ক্ষেত্রেও উঠবে না তো? আর প্রস্তাব করব, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা মেনে আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের আগে তা যেন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়।
দেশের সাধারণ মানুষ অবশ্যই উন্নয়ন চায়, কিন্তু চলমান ধারার তাত্ক্ষণিক উন্নয়ন যেন জাতির ভবিষ্যেক জিম্মি করে না ফেলে। কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ নিয়ে উন্নয়নের এমন গতিধারা যেন তৈরি করা না হয়, যার মূল্য দিতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেনার দায়ে হাবুডুবু খেতে হয়। আসলে আমাদের প্রয়োজন এরূপ একটি টেকসই উন্নয়নের ধারা, যার আওতায় এ দেশের মানুষ এমন একটি মর্যাদাবান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বিকশিত হবে, যেখানে তার জন্য শুধু একটি সুন্দর বর্তমানই থাকবে না, একটি সুন্দর আগামীও অপেক্ষা করবে। কিন্তু আমরা কি সেটি করতে পারছি?
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়