বিশ্ব রাজনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটের নেপথ্যে আয়বৈষম্যের তীব্র বৃদ্ধি

খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টরা ক্রমবর্ধমানভাবে দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে জর্জরিত করা সমস্যাগুলোর মূল কারণ হলো আয়বৈষম্যের তীব্র বৃদ্ধি, যার ফলে একটি স্বয়ংসম্প্রসারণশীল অলিগার্কি বা ধনিকতন্ত্রের উত্থান ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে—এমন কথা এখন অনেক মার্কিন নাগরিকের কাছেই যেন একটি বহুল উচ্চারিত সত্য। প্রশ্ন হলো দেশটির রাজনীতি কীভাবে এ অবস্থায় পৌঁছল এবং কীভাবে একে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা যায়। বর্তমান সংকটের পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করেছে। এর কিছু—যেমন কংগ্রেসের নির্বাচনী আসনের সীমানা এমনভাবে পুনর্নির্ধারণ করা, যাতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সুবিধা হয়—সহজেই চিহ্নিত করা যায় এবং এগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনও স্পষ্ট। কিন্তু এসবের কোনোটিকেই এমন একক ও মৌলিক বহিঃস্থ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না, যা অন্য সব সমস্যার জন্ম দিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এ অবনতি এখনই কেন ঘটল, তারও একক ব্যাখ্যা এগুলো দিতে পারে না। তবে কেউ কেউ এর বিপরীত যুক্তি দেন।

খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টরা ক্রমবর্ধমানভাবে দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে জর্জরিত করা সমস্যাগুলোর মূল কারণ হলো আয়বৈষম্যের তীব্র বৃদ্ধি, যার ফলে একটি স্বয়ংসম্প্রসারণশীল অলিগার্কি বা ধনিকতন্ত্রের উত্থান ঘটেছে। তাদের যুক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফেরানোর কাজ শুরু করতে হবে সম্পদ ও আয়বৈষম্য কমানোর মধ্য দিয়ে।

এ কথা সত্য যে বৈষম্য বেড়েছে, এটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এ বিষয়ে নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। সেই পদক্ষেপের শুরু হতে পারে তুলনামূলকভাবে সহজ কিছু উদ্যোগ দিয়ে—যেমন আর্নড ইনকাম ট্যাক্স ক্রেডিটের (ইআইটিসি) আওতা বাড়ানো এবং অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট বা ‘ওবামাকেয়ার’-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার বাড়ানো। এটিও সত্য যে অতিধনী শীর্ষ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ মানুষ পশ্চাদমুখী নীতিগত পদক্ষেপের পক্ষে সফলভাবে প্রচারণা চালিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের সম্পদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এর একটি উদাহরণ হলো এস্টেট ট্যাক্স বা উত্তরাধিকার কর প্রায় ভেঙে দেয়ার মতো পদক্ষেপ। এ কথাও সত্য যে রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব অতিরিক্ত। করপোরেশনগুলোর নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয়ের ওপর বিধিনিষেধ তুলে দেয়া মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ‘সিটিজেনস ইউনাইটেড’ মামলার রায়টি ছিল একটি ভুল মোড়।

কিন্তু এসব তথ্য একত্র করলেও এমন কোনো কার্যকারণ-শৃঙ্খল তৈরি হয় না, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে বৈষম্যকে দায়ী করার যুক্তি দাঁড় করানো যায়। প্রথমত, সম্পদ ও ডানপন্থী বা রক্ষণশীল রাজনীতির মধ্যে অপরিহার্য কোনো সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ, অতিধনী অনেক মানুষ—বিশেষ করে শীর্ষ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ—কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া ডানপন্থী রাজনীতিকদের সমর্থন করতে গিয়ে নিজেদের নীতিবোধ বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বেশি আয় ও উচ্চতর শিক্ষার সঙ্গে বরং ‘উদারপন্থী’ রাজনীতির সম্পর্ক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্লু স্টেট’গুলোতে ‘রেড স্টেট’গুলোর তুলনায় আয় বেশি। এমনকি একই অঙ্গরাজ্যের ভেতরেও ‘ব্লু কাউন্টি’গুলোর আয় ‘রেড কাউন্টি’র তুলনায় বেশি।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান—যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার বিজয়—নির্বাচনী প্রচারে পাওয়া অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। গণমাধ্যম তাকে যতটুকু বিনামূল্যে প্রচার দেয়ার প্রয়োজন ছিল, তা দিয়েছে। যেকোনো ক্ষেত্রেই নির্বাচনী প্রচারে দেয়া অর্থের বড় ধরনের প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলের ওপর পড়ে—এমন ধারণার পক্ষে পরিসংখ্যানগত প্রমাণ নেই। বিশেষ করে প্রার্থী যখন ভোটারদের কাছে আগে থেকেই সুপরিচিত, তখন এ ধরনের অর্থের প্রভাব আরো সীমিত।

নিশ্চয়ই নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় করা অর্থ একজন রাজনীতিকের আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—শুধু এ কারণে যে রাজনীতিক নিজেই বিশ্বাস করেন, এ অর্থ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে। আর ট্রাম্পের যুগে ব্যাপকভাবে আলোচিত সেই সম্ভাবনার কথাও বাদ দেয়া যায় না যে অর্থ সরাসরি রাজনীতিকদের নিজেদের পকেটে চলে যায়। কিন্তু এসবের কোনোটিই প্রমাণ করে না যে ধনী ব্যক্তিরা অর্থের বিনিময়ে নির্বাচন কিনে নিতে পারেন।

এমনকি বৈষম্য যদি রাজনীতিকে ডানদিকে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেও থাকে, তবু শুধু এ রোগ নির্ণয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফেরানো যাবে না। ধনী অভিজাতদের প্রতি ক্ষোভ সবসময় ভালো নির্বাচনী ফলাফল বয়ে আনে না। ২০১৬ সালে ট্রাম্প ‘পিছিয়ে পড়া’ বলে মনে করা ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তিনি তাদের স্বার্থ রক্ষা করবেন এবং ক্ষতিকর ‘এলিট’দের বিরুদ্ধে তাদের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর তিনি বরং ধনীদেরই বেশি সুবিধা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও ২০২৪ সালে তিনি জনপ্রিয় ভোটে সর্বাধিক ভোট পেয়ে আবার নির্বাচিত হন।

বর্তমানে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টরা নিজেদের শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তুলে ধরছেন এবং উদারপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও তাদের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। কিন্তু ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে অতি বামপন্থী রাজনীতিকদের সমর্থন করা কিংবা তৃতীয় দলের প্রার্থী হিসেবে তাদের ভোট দেয়া রিপাবলিকানদের নির্বাচিত হওয়ার পথ সুগম করার প্রায় নিশ্চিত উপায়। রালফ ন্যাডার না থাকলে ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশ ডেমোক্র্যাট আল গোরকে পরাজিত করতে পারতেন না। মিডিয়ান ভোটার থিউরেম এখনো কার্যকর।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অকার্যকারিতা ক্রমেই গভীর হওয়ার একটি ভালো ব্যাখ্যা হলো ভোটারদের বিভিন্ন গোষ্ঠী এখন ভিন্ন ভিন্ন তথ্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। এর পেছনে দুটি বিষয় কাজ করছে। প্রথমত, আধুনিক অ্যালগরিদম প্রত্যেক ব্যক্তিকে এমন সংবাদমাধ্যমের কাছেই পৌঁছে দেয়, যেখানে তারা নিজেদের পছন্দের কথাই শুনতে পান। দ্বিতীয়ত, মানুষের চিরন্তন একটি প্রবণতা হলো চোখের সামনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান তথ্য থেকে অতিরিক্ত সাধারণীকরণ করা, অথচ এ বিষয়টি বিবেচনায় না নেয়া যে অন্য অনেক তথ্য তাদের কাছ থেকে আড়াল হয়ে থাকতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী ও আচরণগত অর্থনীতিবিদরা যেসব পদ্ধতিগত ভুল নিয়ে গবেষণা করেছেন, আমি চেষ্টা করেছি সেগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাঙ্করিং, কনফার্মেশন বায়াস, অ্যাভেইলেবিলিটি হিউরিস্টিক এবং এ ধরনের আরো কিছু প্রবণতা। এসব মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যেই প্রোথিত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে এগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এর মূল চাবিকাঠি হলো উন্নততর সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা, যা স্কুল পর্যায়েই শেখানো সম্ভব।

এর জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শগুলো শুনতে খুবই সহজ মনে হতে পারে: আপনি যা শুনছেন, তার সবকিছু বিশ্বাস করবেন না। কোনো নিবন্ধ পড়ার সময় কিংবা কোনো ভিডিও দেখার সময় ফুটনোট বা নির্ভরযোগ্য উৎসের লিংক খুঁজে দেখুন। এগুলো না থাকলে কোনো ধারণাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমনভাবে অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেবেন না। নিজের লেখায় বিশ্বাসযোগ্য সূত্র উল্লেখ করুন। পারস্পরিক সম্পর্ক মানেই কার্যকারণ সম্পর্ক—এমনটা ধরে নেবেন না। নিজের তথ্যের ইকো-চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসুন এবং এমন সব মাধ্যম ও পরিসরের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করুন, যেখানে মানুষ নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডির বাইরে থাকা অন্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করে।

এসব হয়তো রাজনৈতিক কৌশলের ভিত্তি হিসেবে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বৈষম্য কমানোর মতো অগ্রগতির জন্যও উন্নততর সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা একটি পূর্বশর্ত। জনগণ যদি কোনো নীতির বিষয়বস্তু বা তার প্রভাব না বোঝে, তাহলে উদারনৈতিক কর ব্যবস্থা কিংবা সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মতো নীতির পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করা অসম্ভব হবে। আজকের মতো মানুষের উপলব্ধিতে পদ্ধতিগত ভুলগুলো যতক্ষণ তীব্র থাকবে, ততক্ষণ বৈষম্যকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করার যেকোনো প্রচেষ্টা যেমন প্রগতিশীল নীতির পক্ষে সমর্থন বাড়াতে পারে, তেমনি সহজেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভোটও বাড়াতে পারে।

এমনকি এসব নীতি বাস্তবায়ন হলেও এবং এতে আয় পুনর্বণ্টনে অগ্রগতি হলেও তাতে রাজনৈতিক সুস্থতা ও ভালো নীতির একটি ইতিবাচক চক্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। রক্ষণশীলদের নির্বাচনী প্রচারে অর্থের প্রবাহ কমিয়ে দেয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রগতিশীলদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে—এমনটা অবশ্যম্ভাবী নয়। ফলে কেউ কেউ যে ধরনের স্বয়ংসম্প্রসারণশীল প্রভাবের কথা মনে করেন, এসব পদক্ষেপে তেমন শক্তি নাও থাকতে পারে।

এর বিপরীতে মানুষকে ক্রিটিক্যাল চিন্তা করতে শেখানোর প্রচেষ্টা সত্যিই একটি সম্প্রসারণশীল প্রক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে বিজ্ঞান, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং যুক্তিবোধের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন জোরদার হবে। নীতিগুলো যত উন্নত হবে, ফলাফলও তত ভালো হবে—বৈষম্যের ক্ষেত্রেও। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈষম্য কমে আসবে এর ফল হিসেবে; শুরু করার জায়গা হিসেবে নয়।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

জেফরি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপিটাল ফরমেশন অ্যান্ড গ্রোথের অধ্যাপক। তিনি প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য ছিলেন

আরও