ব্রিকস সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর বা গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষা করা। এটি পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে একটি বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করে। ব্রিকসের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো হচ্ছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব (প্রক্রিয়াধীন)। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিকস এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা শক্তি দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত ছিল এবং ফলত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিল। এ জোট তার সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতি সমন্বয়, নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ব্রিকস অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সম্মুখীন হয়েছে। এদিকে এর ক্রমবর্ধমান সদস্যপদ একদিকে যেমন প্রভাব বাড়াচ্ছে, তেমনি নতুন উত্তেজনাও সৃষ্টি করছে। যদিও কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে এ জোট পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। সংশয়বাদীরা বলছেন যে নিজস্ব মুদ্রা তৈরি এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কার্যকর বিকল্প গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্ভাব্য নানা বাধার সম্মুখীন হতে পারে।
২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল প্রথম ব্রিকের এ ধারণার অবতারণা করেন। এরপর ২০০৬ সালে এটি আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। নিউইয়র্কে চার দেশের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের মাধ্যমে ‘ব্রিক’ গঠিত হয়। ২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে জোটের প্রথম আনুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে জোটে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২০১১ সালে তারা প্রথম সম্মেলনে অংশ নিলে জোটের নাম বদলে ব্রিকস রাখা হয়। সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ব্রিকস নিজস্ব অর্থায়নে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) বা নতুন উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে।
২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ আফ্রিকার সম্মেলনে জোটের বড় ধরনের সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যা পরবর্তী বছরগুলোতে কার্যকর হতে শুরু করে। ২০২৪ সালের শুরুতে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পূর্ণ সদস্য হিসেবে জোটে যোগ দেয়। ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এ জোটে পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগদান সম্পন্ন করে। পূর্ণ সদস্যপদ ছাড়াও ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ মোট ১০ দেশকে ব্রিকসের ‘সহযোগী দেশ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জিডিপির ২৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যুক্ত হওয়ায় বিশ্ব খনিজ তেলের বাজারের প্রায় ৪৪ শতাংশ এখন এ জোটের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ব্রাজিল থেকে ব্রিকসের সভাপতিত্বের দায়িত্ব নিয়েছে ভারত। বর্তমানের শীর্ষ সম্মেলন ও বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বৈঠক ভারতের বিভিন্ন শহরে আয়োজিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের কোনো সদস্য বা অ্যাসোসিয়েট (অংশীদার) সদস্য নয়। ব্রিকস জোটে যোগদানের জন্য বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন করলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ বা অংশীদার সদস্যপদ পায়নি। তবে ব্রিকস গঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্য বাংলাদেশ। নতুন সদস্য বা অংশীদার অন্তর্ভুক্তি বর্তমানে স্থগিত থাকায় নির্দিষ্ট করে কবে সদস্যপদ মিলবে তা নিশ্চিত নয়। ব্রিকস জোটে যোগ দিতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়া ও জোটের অন্যান্য দেশের সমর্থন চেয়েছে। ব্রিকস সম্প্রতি তাদের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর পরিধি দ্রুত বাড়ানোয় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। এ স্থগিতাদেশ বা বিরতি প্রত্যাহার করার পর বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। রাশিয়া আগেই জানিয়েছে যে এ বিরতি শেষ হলে তারা বাংলাদেশের সদস্যপদের আবেদনকে স্বাগত জানাবে।
ব্রিকসের ১৫তম বৈঠকে জোটটির সঙ্গে বাংলাদেশের যুক্ত না হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে বিষয়টিকে এখনই কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না তারা। তারা বলছেন যে প্রকৃত কারণ জানতে হলে আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। যদিও কেউ কেউ বলছেন, এবার সদস্যপদ দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। হয়তো সেসব বিষয়ে বাংলাদেশ তুলনামূলক পিছিয়ে থাকায় এ দফায় বাংলাদেশকে সদস্যপদ দেয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সর্বশেষ নতুন সদস্য দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি বাংলাদেশ।
সার্ক বা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা। বিমসটেকের মূল উদ্দেশ্য হলো, বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা। এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এ তিন সংস্থাটিরই উদ্দেশ্য অভিন্ন। মানুষের কল্যাণে কাজ করা, মানুষের জীবন মান উন্নত করা এবং পারস্পরিক দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করা। তাহলে বিভেদটা কোথায়, অমিলটা কোথায়, বড় জটিল সময় সমীকরণ! এটা সত্য, তিনটি সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে কিছু না কিছু লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে। যদিও বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ব্রিকস অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও কার্যকর। আঞ্চলিক সংযোগ ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বিমসটেক অধিক সক্রিয় ও বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে সার্ক বর্তমানে সবচেয়ে কম কার্যকর। এগুলো সবই একসঙ্গে চিন্তায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার ব্রিকস সম্মেলনে (বিমসটেক চেয়ারপারসন হিসেবে আমন্ত্রিত) যোগদান করা উচিত কিনা—এ নিয়ে কূটনৈতিক মহলে মিশ্র মতামত রয়েছে। এ বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এমনকি এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমেও বিস্তর লেখা হচ্ছে। বুদ্ধিজীবীদের একদল বলছে, ব্রিকস সম্মেলনের প্রধানমন্ত্রীর যাওয়া উচিত, আবার অন্য দল বলছে সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী একদমই যাওয়া উচিত না। এমনকি দেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে আলোচকরা ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিচ্ছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপড়েন ও আঞ্চলিক স্বার্থ বিবেচনায় এর পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে। বিমসটেক প্রধান হিসেবে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনে যোগ দিলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে। এ সময় গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন, সীমান্ত হত্যা এবং বাণিজ্য বাধা দূর করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বিষয়গুলো সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করার ভালো সুযোগ পাওয়া যাবে। ব্রিকসের মতো বড় অর্থনৈতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করার পথ প্রশস্ত হবে। ব্রিকস সম্মেলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে সার্ক সংস্থাকে কীভাবে আরো জোরদার করা যায় সে বিষয়ে ভারত ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ হতে পারে।
ভারতের মাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক তৎপরতা ও বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশটির সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ব্রিকস একটি বহুপক্ষীয় জোট এবং এটির পূর্ণ সদস্য না হওয়ায় সেখানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া নাও যেতে পারে। তড়িঘড়ি করে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দিয়ে পরবর্তী সময়ে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরে গেলে বেশি ফলপ্রসূ আলোচনা সম্ভব হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন।
নানাদিক বিবেচনায় আমার মতে, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়া উচিত। এ সফরে আমাদের হারানোর কিছু নেই। বরং অনেক দেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাওয়া যাবে। সম্মেলনের সাইড লাইনেও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ দেশের সুনাম বাড়াবে। এমনকি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বাংলাদেশ সম্পর্কে একাগ্রহতা ও সহমর্মিতা যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সৃষ্টি হবে। পারস্পরিক দেশের এ ধরনের মনোভাব আমাদের দেশের উন্নয়নকে কেবল ত্বরান্বিতই করবে না, বরং পারস্পরিক আঞ্চলিক শক্তি বাড়াবে।
মো. রফিকুজ্জামান: রেজিস্ট্রার (সাবেক অতিরিক্ত সচিব), বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি)