ডিসেম্বরে এল ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স

প্রবাসী আয়ের এ ধারা অব্যাহত থাকুক

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে থাকা অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিতে পারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবাসী আয়। আর বাংলাদেশের মতো নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত অর্থনীতির জন্য এটি স্বস্তির সঙ্গে আশাসঞ্চারী। সম্প্রতি এটিই ঘটেছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে থাকা অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিতে পারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবাসী আয়। আর বাংলাদেশের মতো নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত অর্থনীতির জন্য এটি স্বস্তির সঙ্গে আশাসঞ্চারী। সম্প্রতি এটিই ঘটেছে। সদ্য বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে প্রবাসী বাংলাদেশীরা রেকর্ড ২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। এজন্য প্রবাসীদের ধন্যবাদ জানাই।

রেমিট্যান্সের এ ধারা অব্যাহত রাখা আবশ্যক। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২৮ বিলিয়ন ডলার।

যদি প্রবাসী আয়ের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখা যায় তা অনেক সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে।

কমবেশি সবার জানা যে দেশের রিজার্ভ প্রায় তলানিতে রয়েছে দীর্ঘকাল ধরে। অথচ পর্যাপ্ত রিজার্ভ ছাড়া জ্বালানি তেল, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধের মতো জরুরি পণ্য আমদানি করা যায় না। এমনকি বিদেশী ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করা হয় রিজার্ভ থেকে। যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়নি, তখন রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি রিজার্ভ বাড়িয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ ২ হাজার ১৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর এখানে অন্যতম অবদান রেখেছে প্রবাসী আয়।

রিজার্ভের পাশাপাশি ডলারের জোগানেও প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এ আয় ডলার জোগানের দায়বিহীন এক উৎস। এর বিপরীতে কোনো বিদেশী মুদ্রা খরচ করতে হয় না অথবা কোনো দায়ও পরিশোধ করতে হয় না। তাই রেমিট্যান্স বাড়লে ডলারের স্থিতি তুলনামূলক বেশি বাড়ে।

এদিকে অন্যতম দুটি সংকট মোকাবেলায় ডলারের জোগান বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এক. বিদেশী ঋণ পরিশোধ এবং দুই. আমদানি দায় মেটানো। তাছাড়া সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও ঋণ পরিশোধের যে তথ্য তুলে ধরেছে তা বেশ উদ্বেগজনক। সেই তথ্যের দিকে লক্ষ করলে নিকট ভবিষ্যতে প্রবাসী আয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।

ইআরডির তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৯১ শতাংশ। আবার এ সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার ৭১১ মিলিয়ন ডলার। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৩২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ২২ শতাংশের বেশি। আশঙ্কা রয়েছে, কিছু প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে থাকবে বাড়তি সুদের বোঝা। আর এমনটি হলে স্বাভাবিকভাবেই রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। এখানে উল্লেখ্য যে ডলার সংকটের কারণে আমদানি দায় ও বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী আয় না বাড়লে সংকট আরো তীব্র হয়। অর্থাৎ নিম্নমুখী ধারায় প্রবাসী আয়, ডলার ও রিজার্ভ সংকট, বিদেশী ঋণ ও আমদানি দায় পরিশোধ এগুলো একটি আরেকটিকে চক্রাকারে প্রভাবিত করে। একটি সূচকে অবনতি দেখা দিলে অন্য সূচকগুলোও নড়বড়ে হয়ে ওঠে। তখন এসব ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ও পরিস্থিতির উন্নয়নে অন্যতম সহযোগী হতে পারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবাসী আয়। অবশ্য এক্ষেত্রে রফতানি আয়ের কথাও প্রাসঙ্গিক। তবে রফতানি আয়ের বিপরীতে রফতানি পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিসহ আরো অনেক কাজে ডলার ব্যয়ও হয় বেশি। যে কারণে আগেও উল্লেখ করা হয়েছে, ডলারের স্থিতি বাড়াতে তুলনামূলক বেশি সহায়তা করে প্রবাসী আয়। তাই প্রত্যাশা রয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট মোচনে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর এ ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে সেজন্য সরকারের বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন এবং সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলো অবশ্যই দৃশ্যমান হতে হবে।

গত আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ জোরালো হতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় নভেম্বরে প্রবাসী আয় আসে ২২০ কোটি ডলার। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ১৯৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছিল। সেই হিসাবে নভেম্বরে প্রবাসী আয় বাড়ে প্রায় ১৪ শতাংশ। এছাড়া গত অক্টোবরে দেশে ২৩৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি।

সরকার পরিবর্তনের পর রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি প্রবাসীদের প্রতিশ্রুতি। কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সংঘাত-সংঘর্ষ, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ, সেনা মোতায়েন—এসবের উত্তেজনা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসীরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে ও দেশজুড়ে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে রেমিট্যান্স শাটডাউনের আহ্বান জানিয়েছিলেন সে সময়। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকারের পতন হলে তারা নতুন সরকারকে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সহযোগিতার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন যাতে এ প্রবৃদ্ধি টেকসই হয়।

দেশে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির অন্যতম অন্তরায় হুন্ডি। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, হুন্ডি ও অন্যান্য মাধ্যমে রেমিট্যান্সের বড় অংকই হাতছাড়া হয়ে যায়, যার বার্ষিক মোট পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। আবার প্রবাসে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো গত ১০ বছরে ভিসার জন্য হুন্ডির মাধ্যমে ১৩ দশমিক ৪ লাখ কোটি টাকা লেনদেন করেছে বলে বাংলাদেশের অর্থনীতির শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে। এ তথ্যগুলো বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রাপ্তির বড় প্রতিবন্ধকতাকে নির্দেশ করে। সুতরাং হুন্ডির বাজার কীভাবে পুরোপুরি বন্ধ করা যায় তা নিয়ে সরকারের কাজ করা দরকার। তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচার হ্রাস ও হুন্ডি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রবাসী আয়ে বর্তমানে উল্লম্ফন ঘটেছে। তাই সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ দুই ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে স্বল্প আয়ের প্রবাসীদের সরকারিভাবে প্রণোদনা বাড়ানোও আবশ্যক। ভারত, শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনের প্রবাসীরাও নানা ধরনের সুবিধা পান।

পাশাপাশি প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে আয় পাঠাতে উৎসাহ প্রদানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জটিলতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য প্রবাসীদের সঙ্গে শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। তাদের সেবার মানও উন্নত করতে হবে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার প্রতিও নজর দিতে হবে। এছাড়া বিমানবন্দরে নানা হয়রানি বন্ধ করতে হবে। এর বাইরে বৈদেশিক শ্রমবাজারের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর মূল কারণ চিহ্নিত করা ও সে মোতাবেক সমাধানের পথে হাঁটা প্রয়োজন। ব্যাপক জনশক্তি বিদেশে যাওয়ার পরও প্রত্যাশিত রেমিট্যান্স না পাওয়ার অন্যতম কারণ উচ্চ মানের কাজ না পাওয়া। সেক্ষেত্রে প্রবাসীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করা ছাড়া বিকল্প সেই। দীর্ঘকাল ধরে অর্থনীতিবিদরা প্রশিক্ষণের বিষয়টিতে জোর দিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবায়ন দেখা যায় না। অন্তর্বর্তী সরকার প্রবাসী আয় প্রবৃদ্ধির এসব প্রতিবন্ধকতা আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটিই প্রত্যাশা।

আরও