রাষ্ট্রদূত নিয়োগ কি রাজনৈতিক বিনিময় বা দলীয় পুরস্কারের বিষয়

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ইতিহাস ও ধরন পর্যবেক্ষণ করে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে এখানে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং অন্য কিছু অযৌক্তিক বিষয়ই অনেক সময় বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে তিনটি মডেল প্রবলভাবে দৃশ্যমান। এর একটি হলো দলীয় আনুগত্য মডেল, দ্বিতীয়টি শাস্তি মডেল, আর তৃতীয়টি হলো ‘আপদ বিদায়’ মডেল।

রাষ্ট্রদূত নিয়োগ যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। কারণ একজন রাষ্ট্রদূত বহির্বিশ্বে নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তার কর্মকাণ্ড একদিকে নির্ধারিত হয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধরন, আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ইমেজ এবং বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে বাংলাদেশের সরকারগুলো এক ধরনের অদূরদর্শিতা, রাজনৈতিক অপেশাদারত্ব, অজ্ঞতা এবং স্বার্থপরতার পরিচয় দিচ্ছে।

রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নির্ধারণ হয়। কিন্তু আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিষয়টি আবার একরৈখিক নয়। এটি সবসময়ই বহুমাত্রিক এবং বহুস্তরীয়। কাজেই একজন রাষ্ট্রদূতকে সর্বদাই বহুমাত্রিক ভূমিকা পালন করতে হয়। একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রদূত নিজ দেশের সঙ্গে অন্য দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কিংবা নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘ফোকাল পয়েন্ট’ নির্ধারণ করেন। তাই রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো দেশের মূল লক্ষ্যই থাকে সেই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম এমন একজন দক্ষ রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা।

এসব বিবেচনায় উন্নত দেশগুলো এমন ব্যক্তিদের এমন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয় যাদের সেই দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বাণিজ্য বা রাজনীতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে দারুণ বোঝাপড়া থাকে। একজন কূটনীতিকের থাকতে হয় বহু বছরের অভিজ্ঞতা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সামাজিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক জ্ঞান ও ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক আইনে গভীর বোঝাপড়া। এসব গুণাবলিকে একজন কূটনীতিকের মৌলিক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীনসহ পৃথিবীর অনেক দেশে সাধারণত পেশাদার কূটনীতিককেই রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ভারত, চীনসহ অনেক দেশ মূলত ক্যারিয়ার কূটনীতিকদেরই রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রচলন থাকলেও সেখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের সিনেট কনফারমেশন হিয়ারিংয়ে কঠোর প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি হতে হয়। ভাষাজ্ঞান, কৌশলগত বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে কাজের সম্ভাবনা সেখানে গুরুত্ব পায়।

তবে পেশাদার কূটনীতিকদের বাইরে যে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের নজির নেই তা নয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগের রীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে পেশাদার কূটনীতিক ছাড়াও রাজনীতিবিদ, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবীদের মধ্য থেকেও রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়ার নজির রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে যে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় তা হলো নিয়োগকৃত ব্যক্তি নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম কিনা এবং যে দেশে তাকে নিয়োগ দেয়া হয় সেই দেশ সম্পর্কে তার পর্যাপ্ত জানাশোনা আছে কিনা। কোনো দেশই অদক্ষ, অযোগ্য কিংবা বিতর্কিত ও আইনি জটিলতায় থাকা ব্যক্তিদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ঝুঁকি নেয় না।

কিন্তু বাংলাদেশ যেন সম্পূর্ণ উল্টো পথের যাত্রী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ইতিহাস ও ধরন পর্যবেক্ষণ করে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে এখানে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং অন্য কিছু অযৌক্তিক বিষয়ই অনেক সময় বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে তিনটি মডেল প্রবলভাবে দৃশ্যমান। এর একটি হলো দলীয় আনুগত্য মডেল, দ্বিতীয়টি শাস্তি মডেল, আর তৃতীয়টি হলো ‘আপদ বিদায়’ মডেল।

বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে মেধাবী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার কূটনীতিকরা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় দলীয় আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পারা ব্যক্তিদেরই রাষ্ট্রদূতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এমনকি পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্য থেকেও দলীয় আনুগত্য ছাড়া ‘ভালো’ পদায়ন পাওয়া খুব কঠিন। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এখানে একেবারেই গৌণ বিষয় মনে করা হয়। ‘শাস্তি মডেল’টি কিছুটা অদ্ভুত শোনালেও এটা মোটামুটি প্রচলিত। এই মডেলে কোনো রাজনৈতিক নেতা, সামরিক বা বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ থাকলে এবং তাদের সরাসরি বরখাস্ত করা না গেলে তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে কূটনীতিক হিসেবে পাঠানো হয়। শাস্তি মডেলে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক নির্বাসন। আবার কখনো কোনো ‘বিতর্কিত ব্যক্তি’ বা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর ব্যক্তি, সরকার যাদের সরাসরি শাস্তি দিতে চায় না বা পারে না, এমন ব্যক্তিদের বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ দিয়ে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়। এই মডেলে অনেক সময়ে এমনকি বড় বড় অপরাধীদেরও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ার নজির রয়েছে। এই মডেলই হলো ‘আপদ বিদায় মডেল’। অনেক সময় ‘শাস্তি মডেল’ ও ‘আপদ বিদায় মডেল’ একই রকম মনে হলেও এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। ‘শাস্তি মডেলে’ নিয়োগকৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান অভিযোগ থাকে না; রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকতে পারে। অন্যদিকে ‘আপদ বিদায় মডেলে’ নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্পষ্টই অভিযোগ ও সমালোচনা থাকে। বাংলাদেশে প্রধানত এ তিন মডেলের যেকোনো একটির মাধ্যমে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া হয়।

এ তিন মডেলের কোনোটির সঙ্গেই মেধা, যোগ্যতা ও কাজের কোনো সম্পর্ক নেই; এমনকি এর সঙ্গে রাষ্ট্রের কল্যাণ কিংবা আন্তঃরাষ্ট্রীয় উন্নয়নেরও কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দুর্বল করে, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। আনুগত্য মডেলে নিয়োগকৃত রাষ্ট্রদূতরা দক্ষতা ও যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকেন। এর ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে তারা রাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণে দক্ষতা দেখাতে কদাচিৎ সক্ষম হন। শাস্তি মডেলে নিয়োগকৃত রাষ্ট্রদূতরা বিদেশে অনেকটা অলস সময় কাটায় এবং এরা সরকার ও দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। আর ‘আপদ বিদায় মডেলে’ রাষ্ট্রের নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের দিক থেকে ভীষণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে এবং তা অবশ্যই রাষ্ট্রের সুনামের জন্য ক্ষতিকর।

রাষ্ট্রদূত নিয়োগ একটি রাষ্ট্রীয় কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এটি কোনো রাজনৈতিক লেনদেন বা দলীয় পুরস্কারের বিষয় নয়। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের এ অনিয়ম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে এবং জাতীয় স্বার্থ আদায়ের সুযোগ সীমিত করছে। বাংলাদেশ যদি কূটনীতিক নিয়োগে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনার পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে ফিরে না আসে, তাহলে কূটনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আরো দুর্বল হতে থাকবে।

ফলে সবার আগে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে বিদ্যমান দলীয়করণ, শাস্তি ও আপদ বিদায় মডেল স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। এর পরিবর্তে পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করতে হবে। এজন্য অবশ্যই স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। রাষ্ট্রদূতদের জন্য পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত হতে হলে কাউকে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, ভূগোল বিষয়ে জ্ঞাত থাকতে হবে। একই সঙ্গে নিযুক্ত দেশের সঙ্গে নিজ দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘ফোকাল পয়েন্ট’ কী সে বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। আগ্রহী ব্যক্তি যে এসব বিষয়ে যথেষ্ট পারদর্শী তা নিশ্চিত করার উপায় থাকতে হবে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো কমিটি, যেমন জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক ‘স্থায়ী কমিটি’ সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে আগ্রহীদের মেধা ও যোগ্যতা যাচাই করতে পারে।

সফিক ইসলাম: শিক্ষক ও গবেষক

আরও