বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি—যা দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক গড় ৬ দশমিক ৩ শতাংশের বিপরীতে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ৮-৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে—তা মূলত বৈশ্বিক অভিঘাত, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে সৃষ্ট। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করলেও তা এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে, যা ছিল বিগত আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। পরের মাস আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। এ ওঠানামা থেকে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে তা আবারো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ সময়ে এটি উপলব্ধি করা জরুরি যে বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে কোনো একটিমাত্র কারণ দায়ী নয়, বরং এটি আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতি, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সীমাবদ্ধতা, বিনিময় হারের প্রভাব, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, খাদ্য ও পণ্যবাজারের দুর্বলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যচাপের সম্মিলিত ফলাফল। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যার আংশিক কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশে জ্বালানির মূল্য বাড়লে পরিবহন, সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। গত সেপ্টেম্বরে জ্বালানির মূল্য ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরো একটি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। খাদ্য সরবরাহ ও কৃষি খাতের সীমাবদ্ধতাগুলোও এক্ষেত্রে বেশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে শাকসবজি এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যদ্রব্যের ভূমিকা প্রধান বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়, মৌসুমি ঘাটতি, পরিবহন সমস্যা ও উৎপাদন উপকরণের উচ্চ মূল্য—এসব বিষয় দ্রুত খুচরা বাজারে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
টাকার বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন এবং আমদানীকৃত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি—উভয়ই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানীকৃত জ্বালানি, খাদ্য, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে। যেহেতু বাংলাদেশ আমদানীকৃত উপকরণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাই বিনিময় হারের ওঠানামা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের মূল্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিনিময় হার-সংক্রান্ত সংস্কারের অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয় প্রক্রিয়াকেও জটিল করে তুলেছে। তাছাড়া পরিবহন ও পণ্য বিতরণের উচ্চ ব্যয় পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘ ও অদক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে পরিবহন ও বিপণন খাতের বাড়তি খরচ খুচরা মূল্যের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করা হয়। খাদ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃষিপণ্য কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছার পথে একাধিক ধাপ বা মধ্যস্বত্বভোগীর হাত বদল হয়। জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও একটি বাস্তব সমস্যা। গ্যাস ও বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা পণ্য ও সেবা উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির জোরালো ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ বিদ্যমান রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কেবল কয়েকটি খাদ্যপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরো বিস্তৃত হয়েছে। গত জুনে ভোক্তা মূল্যসূচকের অন্তর্ভুক্ত ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে ২৬১টির মূল্য আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে, যা ব্যাপক মূল্যস্ফীতির চাপকেই নির্দেশ করে। ‘মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা’ এবং মজুরি ও মূল্যের পারস্পরিক চাপের বিষয়টিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। একবার যখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম মূল্যবৃদ্ধি করে এবং শ্রমিকরা উচ্চ মজুরির দাবি জানান। তবে বাস্তবে যদিও মজুরি কিছুটা বেড়েছে, মজুরি বৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম; এর অর্থ হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়-সংক্রান্ত সমস্যাও বিদ্যমান।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে; একই সঙ্গে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং অপ্রতুল রাজস্ব আহরণের মতো চ্যালেঞ্জগুলোও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তাই বর্তমান মূল্যস্ফীতির সমস্যাটিকে কেবল অতিরিক্ত চাহিদাজনিত সমস্যা হিসেবে না দেখে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহজনিত সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। এ কারণেই কেবল নীতি সুদহার বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদেও সমস্যাটি সমাধান করতে পারেনি।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার জন্য মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, বিনিময় হার, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের সমন্বয়ে একটি সামগ্রিক প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। কেবল নীতি সুদহার বৃদ্ধি এক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে না, কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ খাদ্য, জ্বালানি, আমদানি ও সরবরাহ-সংক্রান্ত চাপের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজন, যা বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে গঠন করতে হবে।
মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি সুস্পষ্টভাবে নিম্নমুখী না হওয়া পর্যন্ত নীতি সুদহারকে তুলনামূলকভাবে উচ্চ রাখা উচিত। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী, মুক্তবাজার কার্যক্রম এবং অন্যান্য তারল্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থার অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সরকারি ঘাটতিতে অতিরিক্ত অর্থায়ন পরিহার করা। মুদ্রানীতির সঞ্চালন উন্নত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, যাতে নীতি সুদহারের পরিবর্তন ঋণদান ও আমানতের সুদহারকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত কেবল তখনই পর্যায়ক্রমে সুদের হার কমানো, যখন মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এবং অন্তর্নিহিত মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সঠিক সময়ের আগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে চাহিদার ওপর চাপ পুনরায় বৃদ্ধি পেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এ খাতের ভঙ্গুরতা মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। বর্তমানে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং অনেক ব্যাংকের অপর্যাপ্ত মূলধন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর সমস্যার উপযুক্ত ও বাস্তবসম্মত সমাধান, ব্যাংক খাতের সুশাসন জোরদার, খেলাপি ঋণ আদায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এটিও নিশ্চিত করতে হবে যেন দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেয়া তারল্য সহায়তা মুদ্রানীতির সংকোচনমূলক পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত না করে।
আর্থিক বা রাজস্ব শৃঙ্খলা জোরদার করাও জরুরি। মূল্যস্ফীতি যখন উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, তখন সরকারের উচিত অত্যধিক সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি পরিহার করা। অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে থাকতে পারে—অপরিহার্য নয় এমন সরকারি ব্যয় হ্রাস করা; কম অগ্রাধিকার ও কম সুফলদায়ক প্রকল্প স্থগিত রাখা; ব্যাংক থেকে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ সীমিত করা; ঋণের ওপর অত্যধিক নির্ভরতার পরিবর্তে কর আহরণ বৃদ্ধি করা; অকার্যকর বা ত্রুটিপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারিত ভর্তুকি যৌক্তিক করা এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা ও ক্রয় প্রক্রিয়ার মান উন্নয়ন করা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আহরণ একটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়; জিডিপির তুলনায় করের অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি হওয়ায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বা ‘ফিসকাল স্পেস’ সীমিত হয়ে পড়েছে।
বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি এবং খাদ্য বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। যেহেতু খাদ্যপণ্যের মূল্য পরিবারের—বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের—কল্যাণের ওপর অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলে, তাই সরবরাহ বৃদ্ধির পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ অপর্যাপ্ত হলে সরকারকে চাল, গম, ভোজ্যতেল, ডাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে কমানো যেতে পারে। সার, বীজ, সেচ সুবিধা, ঋণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের সময়মতো সরবরাহ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকারকে কৃষি উৎপাদন জোরদার করতে হবে। কৃষকরা যাতে তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকারের উচিত সরকারি খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি করা এবং সময়মতো তা বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থা উন্নত করা। এছাড়া অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় টিসিবির কার্যক্রম আরো জোরদার করা উচিত। বাজারের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে হিমাগার সুবিধা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষি-সংক্রান্ত সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সময়ে বাজারের কারসাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যধিক মুনাফার বিষয়টি মোকাবেলা করা একটি জরুরি অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির সমস্যাটি কেবল মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত বিষয় নয়; বরং বাজার ব্যবস্থা, সরবরাহ ও মূল্য সংযোজন শৃঙ্খল এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাও পণ্যের মূল্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। বাজারের অন্যায্য কারসাজি রোধে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করা; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মুনাফার হারের ওপর নিয়মিত নজরদারি করা; মজুদদারি, কার্টেল গঠন ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি প্রতিরোধ করা; বাজার-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও মূল্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত করা; আমদানি অনুমতি ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কৃষক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর স্তর হ্রাস করা প্রয়োজন।
বহিঃখাত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবাস্তব কোনো বিনিময় হার ধরে রাখার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। টাকার মানের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হলে আমদানীকৃত জ্বালানি, খাদ্য, সার, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভ্যন্তরীণ মূল্য বাড়ে। বাংলাদেশের উচিত একটি বাস্তবসম্মত ও নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; আকস্মিক ও বিশৃঙ্খল অবমূল্যায়ন পরিহার করা; জোরালো রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা; ব্যাপক প্রশাসনিক বিধিনিষেধের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত করা এবং কৃত্রিমভাবে টাকার অতিমূল্যায়ন না করা; কারণ তা শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের সৃষ্টি করতে পারে।
জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ হ্রাস করতে সরকারের উচিত বিচক্ষণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে প্রায় অন্য সব পণ্যের মূল্য বাড়ায়। সরকারের প্রয়োজন জ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত, বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য করা; যাতে সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো অনিশ্চয়তা দেখা না দেয়; বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের সিস্টেম লস বা অপচয় কমানো; জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি; সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মাধ্যমে দরিদ্র ও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত গ্রাহকদের সুরক্ষা দেয়া এবং মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন জ্বালানি ও ইউটিলিটি সেবার নির্ধারিত মূল্য হঠাৎ বৃদ্ধি না করে একটি টেকসই মূল্য নির্ধারণ কাঠামো বজায় রাখা।
মূল্যস্ফীতির সময়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বিশেষভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কেবল সামগ্রিক চাহিদা সংকোচনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এ সমন্বয় প্রক্রিয়ার সময়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর সুরক্ষার প্রয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ সরকারের উচিত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা; ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্য সহায়তা এবং টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রির আওতা বাড়ানো; স্কুল ফিডিং ও পুষ্টি কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি করা এবং স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা। এক্ষেত্রে সাধারণ বা সর্বজনীন মূল্য ভর্তুকির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি প্রদানের নীতি অনুসরণ করা উচিত। ফলে রাজস্ব ব্যয় অতিরিক্ত বৃদ্ধি না করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা করা সম্ভব হবে।
সামগ্রিকভাবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির সময়ে অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বাস্তবে দেখা যায় যে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে যখন সরবরাহ পর্যাপ্ত সাড়া দিতে পারে না, তখন মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। বিশেষ করে মধ্যমেয়াদে কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, লজিস্টিকস ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সিএমএসএমই খাত এবং পরিবহন অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক বাধা দূর করা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ও ব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অগ্রাধিকার।
এ জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য মূল কৌশল হওয়া উচিত ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব না ফেলে মূল্যস্ফীতি হ্রাস’। শুধু উচ্চ নীতি সুদহারের মাধ্যমে চাহিদা সংকুচিত করাই এর লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। যেহেতু বর্তমান মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত চাপ, খাদ্য ও জ্বালানি খাতের আকস্মিক অভিঘাত, বিনিময় হারের প্রভাব, বাজারের অসম্পূর্ণতা এবং কাঠামোগত সরবরাহ সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। তাই মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক করার পাশাপাশি রাজস্ব নীতিতে সংযম এবং সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। সংক্ষেপে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি, তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বিনিময় হার ব্যবস্থা, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ও পণ্যমূল্য শৃঙ্খল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরণ এবং অগ্রাধিকারমূলক কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন। এ সমন্বিত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের পরিবারের কল্যাণ অক্ষুণ্ন রেখে মূল্যস্ফীতিকে টেকসইভাবে কমানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
মোস্তফা কে মুজেরী: নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)