রাষ্ট্রের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বিচার বিভাগের সংস্কার জরুরি

বিজ্ঞানের ছাত্র, আইন বিষয়ে তেমন জ্ঞান রাখি না। ফলে আইনবিদদের কাছে আমার অনেক কথা হাস্যকর মনে হতে পারে। তবে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এ বিষয়ে কৌতূহল আছে। আমার আলোচনা শুধু আইনজীবী নন, হাজারো নাগরিকের মনের কথা হলেও হতে পারে।


আমার কাছে মনে হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কায়েমে সরকারের যে অঙ্গটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সেটি দেশের বিচার বিভাগ। দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান এবিএম খাইরুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রদ করেছিলেন। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার শুরু সেখান থেকেই। আর দেশে জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া সহিংসতার পেছনেও দায়ী এ বিচারালয়। ২০১৮ সালে বাতিল হয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করে রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগ। ছাত্ররা নিশ্চিত ছিল যে, এ বিচার বিভাগের অধীন কোনো বিচার হবে না। উল্টো তাদেরকেই ফাঁসানো হবে। বিসিএসে চাকরি পাওয়া তো দূরের কথা, জেলে পচে মরতে হবে। ফলে পথ একটাই খোলা—স্বৈরাচারের পতন। আমি তাই বলব যে আওয়ামী লীগের বর্তমান এ করুণ পরিণতির জন্য বিচার বিভাগ অনেকাংশেই দায়ী। বিচার বিভাগকে তারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন যথেচ্ছভাবে। 


সম্প্রতি লন্ডন ভ্রমণকালে সেখানকার প্রথিতযশা এক আইনজীবী কলেজবন্ধু আক্ষেপ করে বলছিলেন যে, এত পড়াশোনা করেও এখানে নিম্ন আদালতে প্র্যাক্টিস করতে হচ্ছে। দেশে থাকলে সুপ্রিম কোর্টে কত সম্মানে থাকতাম। তখন তাকে বললাম, এখানে তুমি কোর্টে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করে মামলার মেরিট অনুযায়ী রায় পাও, সেজন্য তোমার সন্তুষ্ট থাকা উচিত। সত্যিকার অর্থে একজন পেশাদারির মতো কাজ করতে পারছ। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে তোমার এই ডিগ্রি, জ্ঞান কিংবা যুক্তি-তর্কের খুব একটা মূল্যায়ন করা হতো না। আজকাল অর্থ কিংবা দলীয় আনুগত্যে বা মনের ইচ্ছামতো এখানে রায় হয়।



এ বিষয়ে একটা গল্প মনে পড়ল। গুরু-শিষ্য দেশ ভ্রমণে বের হয়েছেন। ঘুরতে ঘুরতে এমন এক দেশে গিয়ে পৌঁছলেন, যেখানে তেল আর ঘি এক দর। গুরু বুঝলেন, নির্বোধের রাজত্ব। এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। কিন্তু শিষ্য মহাখুশি। যেতে চাইলেন না কিছুতেই এবং থেকে গেলেন। রাজ্যে একটা খুন হলো। খুনিকে ধরা হলো। মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। কিন্তু শেষ সময়ে গলার ফাঁস ফসকে বেরিয়ে বেঁচে গেল খুনি। বিচারকরা বললেন, এ সম্ভবত খুনি না। খোঁজ করো, কার গলায় ফাঁসটা ভালো ফিট হয়। নিত্য ঘি খেয়ে শিষ্যের ঘার-গর্দান রিষ্ট-পুষ্ট। শেষমেশ দেখা গেল সেই শিষ্যের গলায় ফাঁস ফিট। ফাঁসিতে তোলা হলো তাকে। গুরু আশপাশেই ছিলেন। জানতেন, এ ধরনের বিপদে পড়বে শিষ্য। শেষ মুহূর্তে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং জানালেন যে, তিনি এ ফাঁসিতে চড়তে চান। কেন? সবার প্রশ্ন। তিনি বহুদূর দেশ থেকে এখানে এসেছেন। স্বপ্নযোগে সৃষ্টিকর্তা তাকে জানিয়েছেন যে, আজকের এই দিনে, এই স্থানে, এই ফাঁসে যে মারা যাবে, সে সোজা স্বর্গে যাবে। এ স্বর্গের আশায় এত পথ পাড়ি দিয়ে আসা। রাজা ভাবলেন, এক ভিনদেশী এত সহজে স্বর্গে চলে যাবে? আমি কেন নই? হুকুম দিলেন, আমাকে ফাঁসিতে চড়াও। যে-ই কথা সে-ই কাজ। শিষ্যকে নিয়ে গুরু এই ফাঁকে পালালেন। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা মনে হয় অনেকটা সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে এখন!


দুদিন আগেও নোবেলজয়ী ও দেশের অন্যতম সম্মানী ব্যক্তি ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিনা দোষে দোষী ও সাজাপ্রাপ্ত। ২ কোটি টাকার মিথ্যা মামলায় আরেকজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী অবরুদ্ধ। অথচ ৪০০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে আরেকজন হেলিকপ্টারে চড়ে বেড়াচ্ছেন! আবার একদিনের ব্যবধানে তারা দুজনই মুক্ত। প্রতিযোগিতা করে বিচারকরা এখন বন্দি ছাড়ছেন। এক বিচারক একজনকে ফাঁসি দিয়ে দিলেন, পরে আরেকজন তাকে বেকসুর খালাস! সেক্ষেত্রে সেই বিচারপতির কী শাস্তি হতে পারে যে তাকে ফাঁসি দিয়েছিলেন?


আইনের ছাত্র নই, তাই জানি না আইনের বইগুলোয় তাহলে কী লেখা আছে আর কী পড়ানো হয়? দেশের পেনাল কোড বা আইনের ধারাগুলো তাহলে কেমন? এখানে কি কোনো কিছুই স্পষ্ট করে লেখা নেই? আমার তো মনে হয় না। ধরুন একজন ডাক্তার খুব ভালো করেই জানেন যে, জ্বর হলে ‘প্যারাসিটামল’ আর আমাশয় হলে ‘অ্যামোডিস’ দিতে হয়। এখন জ্বর হলে ‘অ্যামোডিস’ আর আমাশয়ে ‘প্যারাসিটামল’ দিলে ডাক্তার দোষী। আইনের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্বতঃসিদ্ধ কিছু কি নেই? বিচার যে করবেন, সাক্ষী-সাবুদ আর পুলিশ প্রতিবেদনেও রয়েছে সমস্যা। আর এভাবেই একটি বিচার কার্যক্রম শেষ হতে হতে জীবন পার!


আইনজীবী বন্ধুদের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তাদের মতে, আইনের অনেক ‘‌ফাঁকফোকর’ নাকি আছে। ধরে নিলাম, ফাঁকফোকর আছে। তাহলে এটি বন্ধ করার কি কোনো প্রচেষ্টা নেই? বিচার প্রক্রিয়া কি দ্রুততর করা যায় না? এত এত বিজ্ঞ আইনজীবী বা আইনের পিএইচডি গবেষকরা কি এসব ফাঁকফোকর বন্ধের কোনো চেষ্টা বা গবেষণা করছেন না? আইনশাস্ত্র পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো শাস্ত্রগুলোর অন্যতম। এটি মানুষের মৌলিক অধিকার বা ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে চর্চা করে।


পৃথিবীর অনেক দেশেই দ্রুততার সঙ্গে ভালো বিচার হচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশে কেন নয়?


আরো কিছু বিষয়ে খটকা লাগে। বিচারপতিদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু বললে আদালত অবমাননা হয়। তখন যে কাউকে ডেকে এনে শাস্তি দিতে পারেন সুপ্রিম কোর্ট। আধ-পাগল বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এভাবে অনেককে আদালতে ডেকে এনে অপমান করেছেন। এ তালিকায় ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখক প্রয়াত সৈয়দ আবুল মকসুদ। মাহমুদুর রহমানকে জেলে যেতে হয়েছে। কথা হচ্ছে, আদালতের বিচারপতিরা কি মানুষ নন? তারা কি ভুল করতে পারেন না? যদি তারা মানুষ হন তাহলে তাদের সমালোচনা করা কেন অপরাধ হবে? এ আইন কি ব্রিটিশ শাসনামলে করা? ব্রিটেনে কি এখনো তা আছে? এ যুগে বিচারপতিদের ‘‌মাই লর্ড’ বলে সম্বোধন করারও কি কোনো প্রয়োজন আছে? আবার ক্যামেরা বা ফোন নিয়ে বিচারালয়ে নাকি প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাহলে স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে? বাংলাদেশে এসব নিয়ম কোন আমলের? আমার মনে আছে, আমেরিকায় পুলিশের হাতে এক কৃষ্ণাঙ্গ মারা যাওয়ার ঘটনার সেই বিচার কার্যক্রম টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল। সেটি সারা পৃথিবীর মানুষ দেখতে পেয়েছিল। আমি নিজেও দেখেছি।


সবচেয়ে বড় কথা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ দেন সরকার নিজের ইচ্ছায়। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে তাতে কোনো সরকারই নিজের দলের আনুগত্যের বাইরে কাউকে কি নিয়োগ দেবে?


পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন-অর-রশিদদের কাছ থেকে সোনার তলোয়ার এবং ছাত্রলীগ শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে ফুলের তোড়া গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাংবিধানিক পদে থেকে দলীয় সংগঠনের কাছ থেকে উপহার গ্রহণের বিষয়টি সবার দৃষ্টিগোচর হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের জ্ঞান-গরিমা এবং মানসিক স্বাস্থ্যই-বা কেমন? এক আধ-পাগল বিচারপতিকে ক’দিন আগেও টেলিভিশনের এক টকশোতে পাগলের প্রলাপ করতে দেখা গেছে।


খবর বেরিয়েছে, সম্প্রতি নিয়োগ দেয়া ১৭ বিচারপতির নয়জনেরই এলএলবিতে নাকি তৃতীয় শ্রেণী। আমি যতদূর জানি, এলএলবিতে তৃতীয় শ্রেণী নিয়ে অধঃস্তন আদালতেও বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যায় না। তাহলে উচ্চ আদালতে এটি কীভাবে সম্ভব? তবে এগুলো শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। কোনো এক সরকারের আমলে এক বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়ার পর জানা গিয়েছিল যে, তিনি এলএলবি পাসই করতে পারেননি। নম্বরপত্রে এক বিষয়ের নম্বরে ঘঁষা-মাজা করা। অথচ উচিত ছিল যে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে মেধাবীদের বিশেষ বৃত্তি দিয়ে এ বিচার বিভাগে নিয়োগের ব্যবস্থা করা।


আইন উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল। আমি মনে করি, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে তিনি।


রাষ্ট্রের কাছে জনগণের বড় প্রত্যাশা ন্যায়বিচার প্রাপ্তি। মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল বিচারালয়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে দেশে অনেকাংশেই দুর্নীতি অনেক কমে যেত। অপশাসন কিংবা সংবিধান লঙ্ঘনসহ নানা অপরাধ থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারে এ বিচারালয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বর্তমানে এ বিচারালয়ই দলীয়করণ ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। রাষ্ট্রের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে বিচার বিভাগের সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, এখনই মোক্ষম সুযোগ।


ড. মো. সিরাজুল ইসলাম: অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও