দি আনবাউন্ড ইকোনমি

বিনিময় হারের ঝড়-পূর্ববর্তী নিস্তব্ধতা

মহামারীকালে স্বর্ণ কিংবা বিটকয়েনের মতো বিকল্প সম্পদগুলো সমৃদ্ধিশালী হয়েছে, কয়েকজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ এ মর্মে পূর্বাভাস দিয়েছেন যে এতে আমেরিকান ডলার বড় ধরনের পতনের মুখে পড়তে পারে, যা ঘটতে পারে এখনই। তবে এ পর্যন্ত মহামারী সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের অসংগতিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও আর্থিক সহজীকরণ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে বিশাল ঘাটতি ব্যয় সম্পর্কে ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান জেরোমি পাওয়েল বলেছেন, ডলারের বিনিময় হার চূড়ান্তভাবে শান্ত করতে আমাদের অনেকগুলো লাল রেখা অতিক্রম করতে হয়েছে। এমনকি আমেরিকার সাম্প্রতিক নির্বাচনও এক্ষেত্রে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। গ্রিনব্যাকের প্রতিদিনের পরিশ্রমী প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকরা কাজ শুরু করতে পারেন, কিন্তু আমরা যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিময় হার প্রবণতা নিয়ে অধ্যয়ন করি, ডেট অ্যামাউন্ট নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া অকারণ হইচই ছাড়া কিছু নয়।

মহামারীকালে স্বর্ণ কিংবা বিটকয়েনের মতো বিকল্প সম্পদগুলো সমৃদ্ধিশালী হয়েছে, কয়েকজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ এ মর্মে পূর্বাভাস দিয়েছেন যে এতে আমেরিকান ডলার বড় ধরনের পতনের মুখে পড়তে পারে, যা ঘটতে পারে এখনই। তবে এ পর্যন্ত মহামারী সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের অসংগতিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও আর্থিক সহজীকরণ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে বিশাল ঘাটতি ব্যয় সম্পর্কে ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান জেরোমি পাওয়েল বলেছেন, ডলারের বিনিময় হার চূড়ান্তভাবে শান্ত করতে আমাদের অনেকগুলো লাল রেখা অতিক্রম করতে হয়েছে। এমনকি আমেরিকার সাম্প্রতিক নির্বাচনও এক্ষেত্রে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। গ্রিনব্যাকের প্রতিদিনের পরিশ্রমী প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকরা কাজ শুরু করতে পারেন, কিন্তু আমরা যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিময় হার প্রবণতা নিয়ে অধ্যয়ন করি, ডেট অ্যামাউন্ট নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া অকারণ হইচই ছাড়া কিছু নয়। 

এটি নিশ্চিত যে ২০২০ সালে এখন পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে ইউরোর মূল্য বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ, তবে এটা অনেকটা বড় ঘূর্ণির বিপরীতে সামান্য গতির বাতাসকে তুলনার মতো বিষয়, বড় ধরনের ঘূর্ণির ঘটনাটি ঘটে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর, যখন ইউরোর বিপরীতে ডলারের মূল্য ১ দশমিক ৫৮ থেকে ১ দশমিক  শূন্য ৭-এ ওঠানামা করছিল। একইভাবে মহামারী চলাকালীন ইয়েন ও ডলারের বিনিময় হারের খুব সামান্য পরিবর্তন হলেও মহামন্দার সময় এর মূল্য ১ ডলারের বিপরীতে ৯০ ও ১২৩-এর মধ্যে ওঠানামা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদারদের বিপরীতে ব্রড ডলার এক্সচেঞ্জ রেট সূচকের জন্য অন্তত মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। 

যদিও এ-জাতীয় স্থিতিশীলতা অবাক করার মতো, তবে মার্কিন মন্দার সময়গুলোয় বিনিময় হারের অস্থিরতা সাধারণত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। আমি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ইথান ইলজেিস্ক ও বিশ্বব্যাংকের কারমেন রেইনহার্ট সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখতে পেয়েছি, প্রধান বিনিময় হারের প্রতিক্রিয়াটি মূলত মহামারীর অন্যতম বৃহৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাঁধা।

কয়েক দশক ধরে অর্থনীতিবিদরা জানেন যে মুদ্রার গতিবিধির ব্যাখ্যা দেয়াটা ভীষণ কঠিন। তা সত্ত্বেও আমাদের জীবদ্দশায় সাক্ষী হওয়া বৃহত্তর বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এ পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত অনুমানটি হচ্ছে, বিনিময় হারের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে। এদিকে কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় তরঙ্গ ইউরোপকে স্তব্ধ করে দেয়ায় ইউরোর মূল্যের কিছুটা পতন ঘটেছে—সম্পদমূল্যের অস্থিরতা হিসেবে যা খুবই সামান্য।  

যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব উদ্দীপক (ফিসকাল স্টিমুলাস) প্যাকেজ নিয়ে আলোচনাটা বরং পরে হবে। আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কেটে গেছে, যদিও সামনে বড় ধরনের নীতিযুদ্ধ অপেক্ষমাণ। এখন পর্যন্ত বিনিময় হারের প্রতিক্রিয়াগুলো তুলনামূলকভাবে সামান্যই ছিল। 

কেউই নিশ্চিতভাবে জানেন না যে মুদ্রার গতিবিধি কীভাবে অব্যহত রাখা যায়। সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মধ্যে রয়েছে সাধারণ অভিঘাতগুলো, ডলার সোয়াপ লাইনবিষয়ক ফেডের উদার নীতি ও বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোর আর্থিক প্রতিক্রিয়া। তবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময়, কারণ হচ্ছে প্রচলিত আর্থিক নীতির অসারতা। সব বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার ইফেক্টিভ লোয়ার বাউন্ড (শূন্যের কাছাকাছি) এবং শীর্ষস্থানীয় পূর্বাভাস প্রদানকারীরা বিশ্বাস করেন যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ঘটনা ঘটলেও অনেক বছর ধরে তা একই রকম থাকবে।

শূন্যের কাছাকাছি না থাকলেও বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সুদের হার এখনো শূন্যের অনেক নিচে, যেমন মাইনাস ৩ থেকে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করতে পারে। এটি নির্দেশ করে যে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হলেও সুদের হার শূন্য থেকে বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে থাকেন।  

সাধারণত সুদের হার বিনিময় হারের একমাত্র চালক; অন্যান্য চালকগুলো, যেমন বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা ও ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অবশ্যই বিভিন্ন অর্ধবার্ষিক কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত, যেমন কোয়ান্টেটিভ ইজিং। প্রকৃতপক্ষে আমি ও ইথান ইলজেিস্ক আমরা দেখিয়েছি যে মহামারী শুরুর অনেক আগে থেকেই প্রধান বিনিময় হারের অস্থিরতা হ্রাস পাচ্ছিল। বিশেষ করে একের পর এক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন শূন্য সুদের হার এড়াতে শুরু করে। কভিড-১৯-এ অতি অল্প সুদের হারকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  

তবে এ অবস্থা চিরস্থায়ী হবে না। আপেক্ষিক মূল্যস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রায় এক দশক ধরে ব্রড ডলার সূচকের প্রকৃত মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে, তবে একটি পর্যায়ে এটি সম্ভবত গড় অবস্থা থেকে আংশিক ফিরে আসবে (যেমনটি ২০০০ সালে ঘটেছিল)। নভেল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আমেরিকার তুলনায় যুক্তরাজ্যে বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। তবে শীত ঘিরে এ প্যাটার্ন পরিবর্তিত হতে পারে, বিশেষ করে নির্বাচন-উত্তর আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়টা স্বাস্থ্য ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। যদিও এখনো ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহের মতো যথেষ্ট সক্ষমতা আমেরিকার রয়েছে, তবে বৈশ্বিক বাজারে আমেরিকার সরকারি ও করপোরেট ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি ভঙ্গুরতার নির্দেশ দেয়। 

সহজ করে বলতে গেলে, বিশ্ববাজারে মার্কিন ঋণের ক্রমবর্ধমান শেয়ার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মার্কিন আউটপুটের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের মৌলিক অসামঞ্জস্য বিদ্যমান। (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আশা করে যে ২০২১ সালের শেষে চীনের অর্থনীতি ২০১৯ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বড় হবে)। এ ধরনের একটি সমস্যা অবশেষে ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ রবার্ট ট্রিফিন কর্তৃক প্রথম শনাক্তকরণের পর যুদ্ধ-পরবর্তী স্থির বিনিয়ম হারের ব্রেটস উডস পদ্ধতিকে ভেঙে দিয়েছিল। এটি ঘটেছিল ব্রেটস উডস পদ্ধতি নির্ধারণের এক দশক পর। 

স্বল্প থেকে মাঝারি মেয়াদে—অবশ্যই ডলারের মূল্য বাড়তে পারে—বিশেষ করে কভিডের ঢেউ যদি আর্থিক বাজারকে আরো চাপে ফেলে সুরক্ষার উপায় খুঁজতে বাধ্য করে। বিনিময় হারের অনিশ্চয়তাকে একদিকে সরিয়ে রেখে যে অপ্রতিরোধ্য সম্ভাবনাটি তৈরি হয়েছে, তা হচ্ছে ২০৩০ সালে নেতৃত্বের আসনে থাকবে গ্রিনব্যাক। তবে এটি মনে রাখা উচিত এখন আমরা যে ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিঘাতসংক্রান্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা প্রায়ই যন্ত্রণাপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে প্রমাণিত।  

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


কেনেথ রগফ: আইএমএফের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও পাবলিক পলিসির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও