তারুণ্য

তরুণদের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি থেকে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তরুণরা দেশের মূলধারার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তরুণরা দেশের মূলধারার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আন্দোলনের সময় তরুণদের নেতৃত্বে রাজপথে নেমে এসেছিল বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ। আন্দোলন-পরবর্তী এক বছরে তরুণদের আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। তেমনি তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে বিভিন্ন সময়ে জনরোষের সম্মুখীনও হতে হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, গত এক বছরে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণরা দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পেরেছে এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ার এক বছরে আদৌ কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে কিনা।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, পরিচালিত পালস সার্ভের তৃতীয় পর্বের ফলাফল অনুযায়ী চলতি বছরের জুলাইয়ে মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ তরুণদের রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেয়ার কথা বিবেচনা করেছে। যদিও এটি আগের বছরের অক্টোবরের জরিপের তুলনায় দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি, সমর্থনের হার এখনো খুবই কম। তরুণ রাজনৈতিক দল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এখনো মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে।

বিআইজিডি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশে তরুণ রাজনীতি’ শীর্ষক একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচলনা করছে ঢাকা, খুলনা ও রংপুরে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন যে দলগুলো গড়ে উঠছে, সেগুলোর গঠন, কর্মকৌশল ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এ গবেষণার অনুসন্ধান। গবেষণাটিতে আরো দেখা হচ্ছে—বর্তমান সময়ে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় তরুণ রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পারছে এবং কোথায় তাদের সীমাবদ্ধতা রয়ে যাচ্ছে?

নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির নেতৃত্বের কাছে জনগণের প্রত্যাশা তুলনামূলক বেশি। বড় রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও উপজেলা শহরে সভা-সমাবেশে সীমাবদ্ধ থেকেছে, সেখানে গ্রামের সাধারণ মানুষ চায় নতুন রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছাক, তাদের সমস্যাগুলো শুনুক এবং সমাধানের চেষ্টা করুক। তবে গ্রামবাসীর তরুণদের ব্যাপারে আগ্রহ থাকলেও কিছুক্ষেত্রে আক্ষেপও রয়েছে—‘‌আমাদের কাছে কেউ আসে না, আমাদের কথা শোনে না।’ রংপুরের এক কৃষক বলেন, ‘‌গাছের শিকড় যদি ঠিক না থাকে, উপরে যত পানি দেন আর যত সার দেন, কাজ হবে না। আমরা তো চাই তারা আমাদের কাছে আসুক, কথা বলুক। অফিসে বসে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে ভিডিওকলে কথা বলে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব না।’

যদিও জুলাই পদযাত্রায় এনসিপি উল্লেখযোগ্য জনসমাগম করতে পেরেছিল, সেটিও মূলত শহরকেন্দ্রিক ছিল। এখানেই গ্রাম ও শহরের রাজনীতির ফারাক স্পষ্ট। পালস সার্ভের ফলাফলও একই বার্তা দিচ্ছে—জাতীয় নির্বাচনে শহরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ এনসিপিকে ভোট দেয়ার কথা বিবেচনা করছে, অথচ গ্রামে এই হার মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে গণ-অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা আরেক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশকেও (আপ বাংলাদেশ) তাদের জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের সাধারণ মানুষ এসব নতুন রাজনৈতিক দল সম্পর্কে তেমন কিছু জানেই না।

তবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ ইতিবাচক মনোভাব আছে। মানুষ বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চায়। তবে এ পরিবর্তনের দায়িত্ব দেশের জনগণ তরুণদের হাতে তুলে দিতে কতটা প্রস্তুত তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিআইজিডি পালস সার্ভে অনুযায়ী ৩৮ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে তরুণ নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো দেশের রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবে। সেটার জন্য প্রয়োজন নতুন চিন্তার শক্তি, ইতিবাচক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, সাহস এবং সর্বোপরি সততা। অন্যদিকে প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষ মনে করছে অভিজ্ঞতার অভাবই তরুণ রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। এছাড়া যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সাংগঠনিক দুর্বলতা তাদের টিকে থাকার পেছনে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। বাস্তবে নতুন রাজনৈতিক দলের সাম্প্রতিক কিছু কার্যক্রমেও এ সীমাবদ্ধতার আভাস পাওয়া যায়।

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে তৈরি হওয়া তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে পুরনো ধারার রাজনীতির ছাপই বেশি দেখা যাচ্ছে। দলের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা রক্ষায় ‘‌কারণ দর্শানোর নোটিস’ ব্যবহারের প্রবণতা এরই একটি উদাহরণ। কিন্তু মূল পার্থক্য হলো—এসব নোটিস এবং তার জবাব ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যায়। দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এমন খোলামেলা আলোচনা আমরা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখি না। কেউ এটিকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে, আবার অনেকের কাছে তা হাস্যরসের কারণ হয়ে উঠছে।

কিন্তু সমস্যার জায়গা হলো—নতুন রাজনৈতিক দলগুলোও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারি, নিয়োগ বাণিজ্য, তদবিরসহ নানা অনিয়মের খবর এরই মধ্যে মানুষকে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য ক্রাউডফান্ডিং ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, ব্যক্তিপর্যায়ে কীভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা এখনো নেই। ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সম্প্রতি সিলেটের পাথর লুটের ঘটনায় এনসিপির স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ততার খবর পাওয়া গিয়েছে, যা ব্যক্তিপর্যায়ের জবাবদিহির ঘাটতি স্পষ্ট করে।

এনসিপির মতো তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দল দেশের ইতিহাসে প্রথম। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিংবা রাজনীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগ সেই অর্থে এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে জনসাধারণের কাছে নতুন বিকল্প নিয়ে চিন্তা বেশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিকল্প হিসেবে নতুন শক্তির উত্থানের ব্যাপারে অনেকেই আশাবাদী। এনসিপি যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে দরকষাকষি সামলাতে সক্ষম হয় এবং নির্বাচনের মাঠে শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, তবেই দেশে তারুণ্যনির্ভর রাজনীতির একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

মো. আবরার হাসান: প্রোগ্রাম সহকারী, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)

রায়হান আহমেদ: প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)

[নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব, প্রতিষ্ঠানের নয়]

আরও