শ্রীলংকা
নামটিই এখন
যথেষ্ট বাংলাদেশের
পাঠকদের মনোযোগ
আকর্ষণের জন্য।
রাশিয়া-ইউক্রেন,
দ্রব্যমূল্য, টিপ
কাহিনী ইত্যাদির
সঙ্গে দেশীয়
প্রায় প্রতিটি
পত্রিকার খবরে
সার্কভুক্ত এ
শ্রীলংকা আছে।
শ্রীলংকার বর্তমান
দুর্দশার সঙ্গে
সম্ভবত চীনের
নামই সবচেয়ে
বেশি উচ্চারিত
হচ্ছে। দেশী-বিদেশী
লাখ লাখ
শেয়ার কমেন্ট
পাচ্ছে এসব
ভিডিও। অনেকে
জেনে কিংবা
অল্প জেনে
অথবা ইচ্ছা
করেই চীনের
নাম জুড়ে
দিচ্ছে। অনেকে
আবার চীন
থেকে ঋণ
নিয়ে দেশীয়
প্রকল্প বাস্তবায়নেরও
ঘোর বিরোধী।
মোটামুটি এ
ধারণা এখন
অনেকের মাঝে
খুবই প্রবল
চীন শ্রীলংকাকে
ইচ্ছে করে
অনেক টাকা
ধার দিয়ে
ঋণের জালে
আবদ্ধ করে
ফেলেছে। আর
বোকা শ্রীলংকাও
বাছবিচার না
করে বিশাল
বিশাল অপ্রয়োজনীয়
প্রকল্প হাতে
নিয়ে তার
মাশুল দিচ্ছে।
আসলে বাস্তবতা
কী আর
তার কতটুকু
সত্য। সত্যি
হলো, গত
এপ্রিল পর্যন্ত
চীনের কাছে
শ্রীলংকার স্টক
ঋণ মাত্র
১০ শতাংশ।
এমনকি জাপানও
তার থেকে
বেশি ঋণ
দিয়েছে শ্রীলংকাকে।
অন্যদিকে শ্রীলংকার
সিংহভাগ বহিস্থ
ঋণের স্টক
আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে
পাওনা, যা
প্রায় ৪৭
শতাংশ! আরো
প্রায় ২২
শতাংশ বহুপক্ষীয়
উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর
হাতে। তার
মানে দেখা
যাচ্ছে শ্রীলংকার
এ দুর্দশার
জন্য চীনের
অবদানের আগে
আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার,
উন্নয়ন ব্যাংকগুলো,
জাপানের নাম
আসা উচিত।
কিন্তু সেটা
খুব একটা
উচ্চারিত হয়
না, কারণ
যত দোষ
‘চীন’
ঘোষ। আর
এ ঘোষ
বানানোর প্রধান
কারিগর হলো
পশ্চিমা মিডিয়াগুলো।
সংক্ষিপ্ত আকারে
এবার শ্রীলংকার
ঘটনাটা একটু
বোঝার চেষ্টা
করি। কেন
এমন হলো:
১. প্রেসিডেন্ট
গোতাবায়া রাজাপাকসের
অধীনে শ্রীলংকার
বর্তমান সরকার
তার দেশে
বড় ধরনের
কর কমিয়েছে।
ব্যক্তিগত কর
ও প্রতিষ্ঠানের
কর উভয়ই
তার আওতাভুক্ত
ছিল। অতিমাত্রায়
কর কমানোর
ফলে সরকারের
আয় কমে
রাজস্ব ও
রাজস্বনীতিকে প্রভাবিত
করেছে এবং
যার ফলে
বাজেট ঘাটতি
বেড়েছে। কিন্তু
বিভিন্ন সরকারি
খরচ তো
সে অনুপাতে
কমেনি, বরং
বেড়েছে। সেই
অতিরিক্ত খরচ
মেটানোর জন্য
শ্রীলংকার কেন্দ্রীয়
ব্যাংক অতিরিক্ত
টাকা (শ্রীলংকান
রুপি) ছাপতে
শুরু করে।
যদিও আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিল
(আইএমএফ) অর্থ
ছাপানো বন্ধ
করার জন্য
এবং পাশাপাশি
সরকারি খরচ
কমাতে সুদের
হার বাড়ানো
এবং কর
বাড়াতে শ্রীলংকার
সরকারকে পরামর্শ
দিয়েছিল। সেই
সঙ্গে আইএমএফ
সতর্ক করে
দিয়েছিল টাকা
ছাপানো অব্যাহত
থাকলে একটি
অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ
হতে পারে।
সেটাই হলো
শ্রীলংকার ক্ষেত্রে।
এটা তো
আমরা অনেকেই
জানি, প্রয়োজনের
অতিরিক্ত টাকা
যদি বাজারে
বিচরণ করে,
সেটা মূল্যস্ফীতি
তৈরি করে।
২. ২০২১
সালের এপ্রিলে
প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া
রাজাপাকসে ঘোষণা
করেছিলেন শ্রীলংকা
কেবল কৃষি
রাসায়নিকভিত্তিক সার
সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
করে জৈব
চাষের অনুমতি
দেবে। পরিবেশ
আগে না
অর্থনীতি আগে,
দীর্ঘ সময়
ধরে চলা
এ বিতর্কের
পরিপ্রেক্ষিতে শুধু
এ সার
নিষেধাজ্ঞার ফলে
শ্রীলংকায় চা
উৎপাদন কমে
যায় প্রায়
৪২৫ মিলিয়ন
ডলারের। শ্রীলংকার
অন্যতম প্রধান
রফতানি পণ্য
হলো চা।
শুধু তা-ই
নয়, হঠাৎ
এমন অবিবেচনাপ্রসূত
নীতির ফলে
শুধু প্রথম
ছয় মাসের
মধ্যে চাল
উৎপাদন ২০
শতাংশ হ্রাস
পায় এবং
ধান উৎপাদনে
আগে অর্জন
করা স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে
উল্টিয়ে ৪৫০
মিলিয়ন ডলারের
ধান আমদানি
করতে বাধ্য
হয়। একবার
ভাবুন, আমাদের
তৈরি পোশাক
যদি হঠাৎ
করে এভাবে
ধসে পড়ে,
আমাদের কী
অবস্থা হবে?
রফতানি করে
যদি ডলারই
না পায়,
তাহলে একটি
দেশ কীভাবে
বিদেশী ঋণ
পরিশোধ করবে
আর আমদানি
করবে?
৩. আবার
বড় বড়
প্রকল্প বাস্তবায়নের
জন্য শ্রীলংকাকে
অনেক দামি
দামি যন্ত্রপাতি
আমদানি করতে
হয়। এসব
আমদানির জন্য
প্রয়োজন প্রচুর
ডলারের। আমদানির
বিপরীতে রফতানি
কম হওয়ায়
২০২২ সালের
মার্চে বৈদেশিক
রিজার্ভ ২
দশমিক ৩
বিলিয়ন ডলারে
নেমে গিয়ে
শ্রীলংকাকে দেউলিয়া
হওয়ার দ্বারপ্রান্তে
নিয়ে যায়,
যা বিদেশী
ঋণের দায়
পরিশোধের জন্য
অপর্যাপ্ত। গত
নভেম্বরের শেষে
শ্রীলংকার বৈদেশিক
রিজার্ভ মাত্র
১ দশমিক
৫ বিলিয়ন
ডলারে নেমে
এসেছে, যা
মাত্র এক
মাসের মূল্যের
আমদানির জন্য
যথেষ্ট। কারণ
শুধু ২০২২
সালের জন্য
শ্রীলংকাকে ৭
বিলিয়ন ডলার
বৈদেশিক ঋণ
এবং আরো
১ বিলিয়ন
ডলার আন্তর্জাতিক
বন্ড (আইএসবি)
পরিশোধ করতে
হবে। আবার
আমাদের মতো
শ্রীলংকার এত
বিশাল জনগোষ্ঠী
প্রবাসে থাকে
না কিংবা
বিদেশ থেকে
ডলার পাঠায়
না, যাতে
আমদানি-রফতানির
গ্যাপ সহজে
পূরণ করতে
পারবে। বর্তমানে
জাতীয় ভোক্তা
মূল্যসূচক অনুসারে
শ্রীলংকায় মূল্যস্ফীতির
হার ফেব্রুয়ারি
২০২২-এ
১৭ দশমিক
৫ শতাংশ
পর্যন্ত বৃদ্ধি
পেয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া
যুদ্ধ, আমদানিনির্ভরতার
ফলে জীবনযাত্রার
ব্যয় বৃদ্ধির
কারণে শ্রীলংকায়
সামাজিক অস্থিরতা
ও প্রতিবাদ
দেখা দেয়।
৪. এমনিতেই
দেশটির অন্যতম
প্রধান আয়ের
ক্ষেত্র পর্যটন
খাত, যা
আবার ২০১৯
সালের সন্ত্রাসী
হামলার দ্বারা
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছিল। তার
পরে মড়ার
উপর খাঁড়ার
ঘা হিসেবে
কভিড-১৯
মহামারী এটিকে
পুনরুদ্ধার করাকে
বাধা দেয়।
জুন ২০১৯-এ
বিশ্বব্যাংকের মতে,
শ্রীলংকার অর্থনীতি
এবং এর
জনগণের জীবনে
কভিড-১৯
মহামারীর ব্যাপক
ক্ষতি সত্ত্বেও
২০২১ সালে
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার
করবে এমন
ধারণা পোষণ
করা হলেও
সেটা বাস্তবে
হয়নি। যদিও
কিছু ক্ষেত্রে
সেই ক্ষতি
কাটিয়ে ওঠার
ইতিবাচক লক্ষণ
এরই মধ্যে
পরিলক্ষিত হচ্ছে,
কিন্তু শ্রীলংকাকে
আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে
তুলতে এবং
ভবিষ্যতে বিদেশী
ঋণের ওপর
উচ্চনির্ভরতা এড়াতে
যথাযথ কর
আরোপকে অত্যন্ত
উৎসাহিত করা
হয়েছে। বর্তমান
ঋণ সংকটের
সময় যারা
চাকরি হারিয়েছেন
তাদের সাহায্য
করার জন্য
বর্তমান সামাজিক
সুরক্ষা উদ্যোগগুলো
কার্যকর বলে
বিবেচিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ
দিয়েছিলেন সঠিক
করের পাশাপাশি
বর্তমান ঋণ
সংকট থেকে
শ্রীলংকার অর্থনীতিকে
উন্নীত করতে
আরো রফতানিমুখী
প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
ফিরে আসি
আবার সেই
চীন ঘোষের
কাছে। নগদ
সংকটে পড়া
শ্রীলংকা তার
বিশাল চীনা
ঋণের বোঝা
পুনরায় নির্ধারণ
করতে চেয়েছে
এবং চীন
তাতে সম্মতি
দিয়েছে। পাশাপাশি
বর্তমান অবস্থা
সামাল দেয়ার
জন্য শ্রীলংকা
ভারত ও
চীন উভয়ের
কাছেই আবারো
হাত পাতে
এবং উভয়
দেশই আবারো
ঋণ সহায়তা
দেয়ার কথা
ব্যক্ত করেছে।
চীন হচ্ছে
শ্রীলংকার সবচেয়ে
বড় দ্বিপক্ষীয়
(একক) ঋণদাতা।
২০২১ সালের
এপ্রিল পর্যন্ত
শ্রীলংকার ৩৫
বিলিয়ন ডলারের
বৈদেশিক ঋণের
প্রায় ১০
শতাংশ চীনের
ছিল। অবশ্য
কর্মকর্তারা বলেছেন,
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন
উদ্যোগ ও
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে
ঋণ নেয়ার
সময় চীনের
মোট ঋণ
অনেক বেশি
হতে পারে।
শ্রীলংকা অবকাঠামো
তৈরির জন্য
চীনের কাছ
থেকে প্রচুর
ধার নিয়েছে,
যার মধ্যে
কিছু ‘সাদা
হাতি’ হিসেবে
শেষ হয়েছে।
যেমন দক্ষিণ
শ্রীলংকায় একটি
বন্দর নির্মাণের
জন্য ১
দশমিক ৪
বিলিয়ন ডলারের
ঋণ পরিশোধ
করতে অক্ষম
হলে ২০১৭
সালে একটি
চীনা কোম্পানির
কাছে ৯৯
বছরের জন্য
লিজ দিতে
বাধ্য হয়েছিল।
এটি কি
চীনের ইচ্ছাকৃত
ঋণের ফাঁদ
নাকি শ্রীলংকার
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি,
অক্ষমতা, সেটা
নিয়ে তর্ক-বিতর্ক
হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
ও ভারত
সতর্ক করেছিল
যে হাম্বানটোটা
বন্দর অত্যাবশ্যক
পূর্ব-পশ্চিম
আন্তর্জাতিক শিপিং
রুট বরাবর
অবস্থিত ভারত
মহাসাগরে চীনকে
একটি সামরিক
আধিপত্য দিতে
পারে। আমেরিকা
ও ভারতের
এই সাবধান
করা যতটা
না অর্থনৈতিক,
তার চেয়ে
বেশি সামরিক
বলে গুঞ্জন
রয়েছে। যদিও
কলম্বো ও
বেইজিং উভয়ই
বলেছে, শ্রীলংকার
বন্দরগুলো কোনো
সামরিক উদ্দেশ্যে
ব্যবহার করা
হবে না।
আবার এটাও
অস্বীকার করার
উপায় নেই
যে চীন
শ্রীলংকা ও
মালদ্বীপের মতো
দেশগুলোয় অবকাঠামো
রক্ষণাবেক্ষণ, চিকিৎসা
সহায়তা ও
ভিসা ছাড়ের
প্রস্তাব দিয়েছে।
কারণ বেইজিং
কৌশলগতভাবে স্থাপন
করা দ্বীপপুঞ্জগুলোর
সঙ্গে তার
সংযোগ জোরদার
করতে চায়।
এসব দিক
পর্যালোচনা করে
আবারো সেই
পুরনো প্রবাদই
মনে পড়ে,
দুটি হাতি
যখন মারামারি
করে তখন
ঘাস মারা
পড়ে, আবার
যখন তাদের
ভালোবাসা হয়
তখনো সেই
ঘাসই মারা
পড়ে। এবার
শ্রীলংকা হয়তো
সেই ‘ঘাস’!
এখানে একমাত্র
চীনা ঘোষই
দায়ী কিংবা
তার চেয়ে
বেশি দায়ী
কে বা
কারা, সেটা
বুঝে ওঠাও
শ্রীলংকার জন্য
জরুরি।
ড. মিরাজ আহমেদ: সহযোগী
অধ্যাপক, অর্থনীতি
বিভাগ
গুয়াংডং
ইউনিভার্সিটি অব
ফাইন্যান্স অ্যান্ড
ইকোনমিকস