রাজবংশ ছাড়াও হুয়াংইয়ান শহরের সীমানা প্রাচীন, সড়ক, সেতু এমনকি আবাসন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য যে পাথরের প্রয়োজন ছিল, সেগুলোও এ গুহা থেকেই সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু ১৯৮০-এর দিকে এ গুহা থেকে আহরণযোগ্য পাথর শেষ হয়ে যায়। পড়ে থাকে ফাঁপা একটি গুহা।
পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ২০২৩ সালের দিকে। সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল ডিজাইনার এ গুহার শৈল্পিক আবেদন উদ্ধারের প্রচেষ্টা শুরু করে। তারা গুহার অবকাঠামোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি এটিকে শিল্পকলা কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করেন। গুহার সামগ্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার জন্য সৃজনশীল নকশা ডিজাইন করা হয়। কনসার্ট হল ও ক্যাফের মাধ্যমে এখানে পর্যটকদের আমন্ত্রণও নিশ্চিত করা হয়। ২০২৪ সালে গুহাটিকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত এ পর্যটন কেন্দ্র পাঁচ লাখের বেশি পর্যটক আকর্ষণ করেছে। এভাবে গত নভেম্বর নাগাদ এ পর্যটন কেন্দ্র থেকে ১১ মিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৬ লাখ ডলার) রাজস্ব আয় হয়েছে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জোর দিয়ে একটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সামগ্রিক উন্নয়নই মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের চাবিকাঠি।’ ওই বৈঠকে তিনি গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ) প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবে যেকোনো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে তিনি জোর দেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নেয়া এবং উদ্ভাবনী পরিকল্পনা নেয়ার বিষয়টিকেও প্রাধান্য দেয়া হয়। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারে এমন পরিকল্পনাকে নীতি পর্যায়ে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হয়। এ বৈঠকে জাতিসংঘ তাদের এসডিজিতে ১৭টি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অঙ্গীকার করে। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধামুক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, লিঙ্গসমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘ তাদের সদস্যদের বাস্তবসম্মত ফলাফল অর্জনের পরিকল্পনা নেয়ার আহ্বান জানায়। এরই ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে চীন।
২০১৩ সাল থেকে চীন নিজ ঐতিহ্যের চিহ্নগুলোকে আধুনিকায়নের অধীনে আনতে শুরু করে। এজন্য তারা এমন পরিকল্পনা নকশা প্রণয়ন করছে যেগুলো ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এভাবে তারা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারছে। সবুজ উন্নয়ন (গ্রিন ডেভেলপমেন্ট) নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনকল্যাণমুখী উদ্ভাবনও বাড়ছে। এভাবেই সবুজ ও জনকল্যাণমুখী উদ্ভাবনের মাধ্যমে চীনে দ্রুত বাড়ছে প্রবৃদ্ধি। এ প্রবৃদ্ধির মূলে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন মডেল। হুয়াংইয়ান গ্রোটোসের এ রূপান্তর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চীনজুড়ে শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলেই এমন বহু রূপান্তর ঘটছে। একেকটি অঞ্চল তাদের স্থানিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা কৌশল অবলম্বন করছে। শিল্পোন্নয়ন ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য তাদের নিজস্ব সম্পদকেই ব্যবহার করছে। এটিই তাদের স্বশাসন।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিচুয়ান প্রদেশে অবস্থিত পানঝিহুয়া কয়লাখনির জন্য প্রসিদ্ধ। একসময় চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে অবস্থিত কয়লা শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭৮ শতাংশ কয়লার জোগান এ শহর থেকেই আসত। স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এভাবে অর্জনের অনেক উদাহরণ রয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে কয়লা আহরণের ফলে প্রকৃতি ও জলবায়ুগত নানা সংকট বাড়তে শুরু করে। বাধ্য হয়েই এখানের কয়লা শিল্পের সংশ্লিষ্টরা পরিবেশের সঙ্গে সংবেদনশীল সবুজায়ন পরিকল্পনার দিকে এগোতে শুরু করে। সবুজায়ন উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে শহরের ১৩টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতাও কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ছিল না। এছাড়া পরিবেশের দূষণ ঘটায় এমন ১৩৩ কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়। ১০৯টি মজুদ কেন্দ্রও ভেঙে ফেলা হয়। ভাঙা ও বাতিলের এ নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য উপাদান, নবায়নযোগ্য সম্পদের উৎস ব্যবহার করে ভ্যানাডিয়াম-টাইটানিয়াম স্টিল প্রক্রিয়াকরণের কাজ শুরু হয়। নবায়নযোগ্য সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দেয়া হয়।
নীতিগত এসব সিদ্ধান্তের ফলে উল্লেখযোগ্য কিছু সাফল্য মেলে। যেমন ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনে কার্বন নির্গমন এবং নিঃসরণের তীব্রতা—উভয়ই ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টন। ওই সময় বছরে কার্বন নিঃসরণের তীব্রতা ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পায়। জেলাটি গত তিন বছরে একটি ‘জিরো কার্বন’ শিল্প অঞ্চল হওয়ার লক্ষ্য নিয়েই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। উন্নত উপকরণ ও নবায়নযোগ্য শক্তিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার শিল্প খাতকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের উপযোগী করার লক্ষ্য জেলার নীতিনির্ধারকদের রয়েছে। সেভাবেই তারা নিজেদের প্রস্তুত করছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জলবায়ু সংবেদনশীল করা ছাড়াও চীনের বিভিন্ন অঞ্চল নিজস্ব সাংস্কৃতিক শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের গুইঝৌ প্রদেশে তৃণমূল পর্যায়ে ‘চুন ঝাও’ নামে একটি ফুটবল লিগ আয়োজন করা হয়। প্রান্তিক পর্যায়ের এ আয়োজন গোটা চীনের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত এ লিগ আয়োজনের মাধ্যমে ৫ দশমিক ১৯ লাখেরও বেশি পর্যটক, দর্শনার্থী কিংবা ক্রীড়ামোদীকে আকর্ষণ করা গেছে। রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ইউয়ান। ১২ হাজারেরও বেশি নমনীয় কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। উত্তর চীনের হেবেই প্রদেশের বেইদাইহের সমুদ্র তীরবর্তী অরণ্য কমিউনিটিও একই কাজ করছে। এটি এখন পর্যটকদের জন্য নান্দনিক প্রদর্শনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানে থিয়েটার, সংগীত ও নৃত্য উৎসবের আয়োজন হয় নিয়মিত। চীনের অসংখ্য ডিজাইনার ও শিল্পী এ কেন্দ্রে আসেন।
হাঙ্গেরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টির প্রেসিডেন্ট গ্যুলা থার্মার একবার এ বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তার মন্তব্যের সারমর্ম হলো, বিশ্বে নানা অনিশ্চয়তা থাকার পরও চীন তাদের অর্থনীতিতে শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা অর্জন করে দেখিয়েছে। জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দেশগুলোর জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। এ উদাহরণগুলো থেকেই আমরা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির অনুপ্রেরণা নিতে পারি। এসব উদাহরণ পর্যবেক্ষণ করে প্রবৃদ্ধির সুযোগগুলো ঠিকই আদায় করে নেয়া যাবে।
বিশ্বে ক্রমাগত জাতিগত আত্মাভিমান বেড়ে চলেছে। এর ফলে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছে। চীন এ সময় ঘাবড়ে না গিয়ে স্থির অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ধাপে ধাপে উন্মুক্ত করেছে। এভাবে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থিতিশীলতা এসেছে। এ স্থিতিশীলতার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে তার সহযোগী বা অংশীজনদেরও নানা অর্থনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে। গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চীনের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। এভাবেই চীন বিশ্ববাণিজ্যে অবদান বা প্রভাব রাখার মতো অবস্থানে পৌঁছে গেছে। প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষের চাহিদার নিরিখে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাজারে পণ্য, সেবা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চীন বিশ্বের বৃহত্তম পণ্য লেনদেনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
চীনের আন্তর্জাতিক অবদান ও সহযোগিতাও কম নয়। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে জাকার্তা-বান্দুং হাই-স্পিড রেলওয়ে, চীন-লাওস রেলওয়ে এবং গ্রিসের পিরেয়াস পোর্টের মতো যুগান্তকারী প্রকল্পগুলো নির্মিত হয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করে এমন অংশীদার দেশগুলোর অবকাঠামোও উন্নত হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেও সহায়তা হয়েছে। চীন বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তাদের নেতিবাচক তালিকা সংক্ষিপ্ত করেছে। বিশ্বে বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করার মাধ্যমে বাজার বিপণন সুবিধা তৈরি করেছে। এজন্য ‘চায়না ইন্টারন্যাশনাল ইমপোর্ট এক্সপো’-এর মতো প্লাটফর্ম গড়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিশ্ব বাণিজ্যের সম্ভাবনা ও সহযোগিতা উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে চীন বড় উদাহরণ। এ মন্তব্যের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও কম নয়। কয়েকটি দেখেই নেয়া যাক। চীনের বিখ্যাত আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান প্রোলজিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও হামিদ মগাদ্দাম বলেছেন যে চীনা ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা একটি ‘বিরাট সুযোগ’ এবং চীনা বাজারের সমৃদ্ধি সরাসরি তার কোম্পানির ক্রমাগত প্রবৃদ্ধিকে চালিত করে। অন্যদিকে ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যান চীনকে বিশ এবং একুশ শতকের উন্নয়নের একটি ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে আঙ্কটাডও যে শিক্ষা নিচ্ছে সে বিষয়টিও তিনি যোগ করেন।
ইয়াং জুমিন: চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্কের (সিজিটিএন) সম্পাদক
ভাষান্তর: আমিরুল আবেদিন