প্রাণিসম্পদ

মাছ উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশের অ্যাকুয়াকালচার

বাংলাদেশে অ্যাকুয়াকালচারের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। অ্যাকুয়াকালচার দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ খাতের সম্ভাবনার সুফল লাভের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, তুলনামূলক কম মূলধনে ব্যবসা শুরুর সুযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে কাজে লাগানোর বাস্তবসম্মত উপায় উদ্ভাবন করা জরুরি।

বাংলাদেশে অ্যাকুয়াকালচারের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। অ্যাকুয়াকালচার দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ খাতের সম্ভাবনার সুফল লাভের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, তুলনামূলক কম মূলধনে ব্যবসা শুরুর সুযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে কাজে লাগানোর বাস্তবসম্মত উপায় উদ্ভাবন করা জরুরি। মৎস্য খাতের বিজ্ঞানী এবং সম্প্রসারণ কর্মীদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং উদ্যোক্তা ও মৎস্যচাষীদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। তবে নদী ও অন্যান্য জলাশয় দূষণ এবং অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের মতো কিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হবে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মাছ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। নদী, হাওর, বাঁওড়, খাল, পুকুর, হ্রদ, অন্যান্য জলাশয় এবং বঙ্গোপসাগর আমাদের মাছের বিশাল উৎস। মৎস্য গবেষণা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যা দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। মৎস্য খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং দেশের অনেক মানুষের জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে কাজ করে।

বাঙালির খাদ্যতালিকার প্রধান উপকরণ হলো মাছ ও ভাত। এজন্যই আমাদের বলা হয় ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। বাংলাদেশ যেহেতু নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান দেশ, তাই ভাত ও মাছ আমাদের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকার অংশে পরিণত হয়েছে। একসময় নদী, হাওর ও খালে মাছ প্রচুর পরিমাণে এবং সহজেই পাওয়া যেত। এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না বিধায় আমাদের চাষের মাছের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মাছ আমাদের একটি সুপরিচিত ঐতিহ্যবাহী ও প্রিয় খাবার। মাছ প্রোটিন ও পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা আমাদের শারীরিকভাবে সুস্থ ও সবল থাকতে সাহায্য করে। এ কারণেই ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি বাঙালি চরিত্রের একটি বিশেষ পরিচয় বহন করে।

চার দশক ধরে বাংলাদেশে মাছ উৎপাদন ছয় গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আশি দশকের গোড়ার দিকে দেশে মাছ উৎপাদন ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৫ লাখ টন। আজ আমাদের মাছ উৎপাদনের পরিমাণ ৫০ লাখ টনেরও বেশি। আমাদের কৃষক-মৎস্যচাষী, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের নিষ্ঠা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এ উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদন দ্য স্ট্যাট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২৪ অনুসারে, বাংলাদেশ বিশ্বে ইলিশ আহরণে প্রথম, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য আহরণে দ্বিতীয়, তেলাপিয়া উপাদনে চতুর্থ, অ্যাকুয়াকালচার ও অভ্যন্তরীণ অ্যাকুয়াকালচারে পঞ্চম, কাঁকড়া গলদা চিংড়ি, চিংড়ি উৎপাদনে অষ্টম, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় অ্যাকুয়াকালচারে চর্তুদশতম স্থানে রয়েছে। আয়তনে ক্ষুদ্র অথচ জনসংখ্যায় বৃহৎ এ দেশে মাছ উৎপাদন ও আহরণে আমাদের অবস্থান আশাব্যঞ্জক। এ অবস্থানকে সুদৃঢ় করার জন্য, আরো সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য মাছ উৎপাদন-আহরণ-বিপণন সহায়ক আইন-বিধি-নীতি প্রণয়ন জরুরি।

আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে মৎস্য গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি খাদ্যনিরাপত্তা, প্রাণিজ প্রোটিন সরবরাহ, রফতানি আয়, কর্মসংস্থান, টেকসই উন্নয়ন, জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ সব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও পালন করবে। এ কারণে আমাদের কৃষক, গবেষক ও উদ্যোক্তাদেরকে প্রণোদনা প্রদান করা এবং তাদেরকে সম্মান জানানো আবশ্যক।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও মৎস্য চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক হ্যাচারিগুলো উন্নত প্রজনন পদ্ধতি এবং ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করছে। ফর্মুলেটেড ফিড ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মৎস্য খাদ্যের মান উন্নত হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মৎস্যচাষীদের পানির গুণমান পর্যবেক্ষণ, মাছের খাদ্যমান উন্নয়ন এবং বাজার সম্পর্কিত তথ্য পেতে সহায়তা করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে মানসম্মত অ্যাকুয়াকালচার অনুশীলন এবং ক্লাস্টারভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই চিংড়ি চাষ সমৃদ্ধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের বিস্তর ভূমিকা রয়েছে। মাছের নিরাপদ ও মানসম্মত খাবার এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা মৎস্যচাষীদের জন্য সহনীয় করার জন্য বেসরকারি খাতকে পর্যাপ্ত সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।

মৎস্য চাষে আমাদের সাফল্য সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য আমাদের বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। মৎস্য চাষের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ এবং দুর্বল শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। রোগের প্রাদুর্ভাব এখনো একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় এবং জৈব নিরাপত্তা পদ্ধতিগুলো এখনো আশানুরূপভাবে গৃহীত ও অনুসৃত হয়নি। অসামঞ্জস্যপূর্ণ হ্যাচারি ব্যবস্থাপনার কারণে বীজ ও খাদ্যের গুণমান ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। লবণাক্ততা অনুপ্রবেশ, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহ ইত্যাদি কারণে উপকূলীয় ও প্লাবনভূমি অঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন।

ক্ষুদ্র চাষী, নারী ও যুবকদের জন্য অর্থের সীমিত সুবিধা এবং ট্রেসেবিলিটি ও টেকসইতার ওপর ভিত্তি করে ক্রমবর্ধমান কঠোরতার কারণে বাজারে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে—কার্প ব্রুড ব্যাংক স্থাপন, উন্নত ব্রুডস্টক আমদানি, নির্দিষ্ট রোগজীবাণুমুক্ত চিংড়ি হ্যাচারি সম্প্রসারণ, হ্যাচারি বিধিমালা কার্যকর করা এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় অপারেটরের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

মাছ কেবল বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নয়, এটি পুষ্টি, জীবিকা ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। কিন্তু এ খাতের ক্রমবর্ধমান বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এ প্রবৃদ্ধি টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। সে কারণেই একটি বিস্তৃত জাতীয় অ্যাকুয়াকালচার নীতি প্রণয়নের সময় এসেছে যা আমাদের অর্জনগুলোকে সুরক্ষিত করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।

এ নীতিমালার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনে পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে উৎপাদনশীলতার ভারসাম্য বজায় রেখে স্পষ্ট জোনিং ও লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা উচিত। উদ্ভাবন ও অবকাঠামোর জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বকে উৎসাহিত করা এবং ক্ষুদ্র চাষী, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন করা আবশ্যক। বাংলাদেশের অ্যাকুয়াকালচারের সাফল্য দূরদৃষ্টি, কঠোর পরিশ্রম এবং সাহসিকতা ও সহযোগিতার গল্প।

সবাই একসঙ্গে কাজ করে আমরা এ খাতকে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার একটি স্তম্ভ এবং জাতীয় গর্বের উৎসে রূপান্তরিত করতে পারি। খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের অ্যাকুয়াকালচার খাত বিভিন্ন উদ্যোগ ও অনুশীলনের মাধ্যমে টেকসইতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা অনুশীলন এবং সহায়ক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর ভারসাম্য বজায় রেখে অ্যাকুয়াকালচারের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে। একটি জাতীয় অ্যাকুয়াকালচার নীতি আমাদের মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্ব, আমাদের জনগণের সমৃদ্ধি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।

আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের: সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

আরও