বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে একটি শীর্ষস্থানীয় বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটি ২০০০ সালে বিজিএমইএর উদ্যোগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্বল্প কিছু সংখ্যক কোর্স নিয়ে বিজিএমইএ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইএফটি) নামে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিআইএফটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে জড়িত জনশক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প হচ্ছে এ দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। প্রায় ৫০ লাখ লোক এ খাতে সরাসরি জড়িত এবং দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। বিআইএফটির তৎকালীন সক্ষমতা এবং সুযোগ বিভিন্ন কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। বৈশ্বিক তৈরি পোশাক শিল্পে বিদ্যমান প্রতিযোগিতা ও সংকটময় পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিজিএমইএ বোর্ড বিআইএফটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে সরকার বিইউএফটিকে পূর্ণাঙ্গ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমাসহ সার্টিফিকেট কোর্সে মোট ২৩টি প্রোগ্রামে শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে রফতানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে বিইউএফটিতে প্রথম থেকেই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বিভিন্ন গবেষণাগার স্টেট অব দি আর্ট মেশিনারিজ ও ইকুইপমেন্ট দিয়ে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বর্তমানে বিইউএফটিতে পদার্থ ল্যাব-৩, রসায়ন ল্যাব-৩, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং ল্যাব-২, মেকানিক্যাল ল্যাব-১, ইলেট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ল্যাব-২, কম্পিউটার ল্যাব-২, কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন ল্যাব-২, প্যাটার্ন ল্যাব-৬, প্যাটার্ন ড্রাপিং-২, ইলাসট্রেশন ল্যাব-২, এসিটি ল্যাব-১, সারফেস অর্নামেন্টেশন ল্যাব-২, ফটোগ্রাফি ল্যাব-১, ডিজাইন স্টুডিও-২, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ-১, অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাব-৬, স্পিনিং ল্যাব-১, ওয়েব নিটিং ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাব-১, ফ্যাব্রিক স্ট্রাকচার ডিজাইন ল্যাব-১, সার্কুলার নিটিং-১, সোয়েটার নিটিং-১, অ্যাডভান্স নিটিং-১, ডাইং ল্যাব-৩, টেক্সটাইল টেস্টিং ল্যাব-২, অ্যাডভান্স রিসার্চ ল্যাব-১ ও টেক্সটাইল মিউজিয়াম রয়েছে। প্রয়োজনীয় আরো উন্নতমানের ল্যাবরেটরি স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও চাকরি প্রদানের নিমিত্তে এখানে রয়েছে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার।
শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা, যুক্তিবাদী সমাজ বিনির্মাণ, সৃজনশীলতা, ক্রীড়া, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকশিত করার লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বিভিন্ন ক্লাব, যথা রোভার স্কাউট, সাংস্কৃতিক ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, গেমস ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব, ডান্স ক্লাব, মিউজিক ক্লাব, থিয়েটার ক্লাব, ফিল্ম ক্লাব, পোয়েট্রি ক্লাব, ফ্যাশন ক্লাব, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিজনেস ক্লাব, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ক্লাব, টেক্সটাইল ক্লাব, অ্যাপারেল ক্লাব, নিটওয়্যার ক্লাব ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি। অত্যাধুনিক জিমনেসিয়াম, খেলার মাঠ, সুইমিং পুল ইত্যাদির সুব্যবস্থা রয়েছে। ৯০০ আসনবিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক মানের অডিটোরিয়াম এবং একটি ৫০০ আসনবিশিষ্ট বহুমুখী হল রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি অনুষদে তিনটি স্নাতকোত্তর কোর্সসহ ১৬টি কোর্স চালু রয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসম্পন্ন জ্ঞান অর্জন করে তাদের কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচন করতে পারে সে লক্ষ্যেই কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ডিগ্রি কোর্স চালু করা হয়েছে। এছাড়া ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পকে এগিয়ে নেয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিইউএফটি পরিবেশ সচেতনতা এবং সংরক্ষণের ওপর খুব জোরালোভাবে জোর দিয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই প্রযুক্তির বিষয়গুলোকে পাঠ্যসূচিতে একীভূত করে পাঠদান শুরু করেছে। পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বা পরিবেশ বিজ্ঞান প্রোগ্রামও চালু করেছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে।
বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের চলমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি খুবই আশাব্যঞ্জক এবং এ পর্যন্ত ৩০টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের এমওইউ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া বিদেশী সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প চালু রেখেছে। এগুলো খুবই কার্যকরভাবে আমাদের শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। এসব প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যেই আমাদের ১৭ জন শিক্ষক নেদারল্যান্ডসের নাইনরোড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি লেভেল ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেছে এবং একজন শিক্ষক পিএইচডি সম্পন্ন করছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করেছে। এসব শিক্ষক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন বলে আশা রাখি। আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তা সবার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্পের টেকসই উন্নয়নে কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার জন্য যৌথ পরিচালনায় বিইউএফটির ১৫ জন শিক্ষক জার্মানির কেমনিট্জ (Chemnitz) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছেন।
একুশ শতকের চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলার জন্য বহুমুখী দক্ষতা অর্জনে ও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে বিইউএফটি প্রতিষ্ঠা লাভের পর অতি অল্প সময়ে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমির ওপর নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস (নিশাতনগর, ধউর, তুরাগ,) দুটি বেজমেন্টসহ ১২ তলা স্থায়ী ভবনের (পাঁচ লাখ বর্গফুট) নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং পাঠ্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ভবনের নির্মাণ কৌশল ও এর অবয়ব একটি নান্দনিক রূপ লাভ করছে। স্থায়ী ভবনের সামনের সবুজ লন শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের মন ভরিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য যথাযথ মাঠ ছিল না, ফলে শিক্ষার্থীদের প্রায়ই কাছাকাছি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাঠে গিয়ে খেলাধুলা পরিচালনা করতে হতো। ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্বাস্থ্য গঠনে নানা অসুবিধা হতো। এ দিক বিবেচনা করে একটি ফুটবল মাঠ তৈরি করাসহ এ-সংলগ্ন ১৮ বিঘা জমি ক্রয় করা হয়েছে। অচিরেই একটি ভলিবল কোর্টসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির মহাপরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক ক্যাম্পাস ও অবকাঠামোগত সব সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের সুবিধার্থে ৩০টিরও অধিক সুপরিসর বাস সার্ভিস চালু করছে। এছাড়া মেধা ও বিভিন্ন কোটায় বিশাল অংকের বিইউএফটি নিজস্ব ফান্ড, বিইউএফটি ট্রাস্ট ফান্ড এবং সফিউদ্দিন-তসরিফা স্কলারশিপ ফান্ডের মাধ্যমে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য ও মেধাসম্পন্ন শিক্ষক দ্বারা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে বিইউএফটি গোল্ড কাপ আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২২ আয়োজন করা হয়েছিল। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের দুটি স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৬ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় অংশগ্রহণ করছে। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের সৃজনশীল ও মননশীলতাকে বিকশিত করার জন্য সুস্থ, সুন্দর ও সবল স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। এজন্য খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
পরিশেষে বলা যায়, বিইউএফটি একটি নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত, যা শুধু বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্পের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেই নয়, বরং পরিবেশগত দায়িত্ব, শারীরিক সুস্থতা এবং এর শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মেধা বিকাশের জন্যও কাজ করছে। ভবিষ্যতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যা রয়েছে, তা হলো এর প্রোগ্রাম এবং সুযোগ-সুবিধার আরো সম্প্রসারণ করে ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা এবং দেশের অর্থনীতি ও বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করার কাজে সক্রিয় অবদান রাখা।
মো. রফিকুজ্জামান: রেজিস্ট্রার, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব।