ওয়াক্‌ফ তহবিলের মাধ্যমে শরিয়াহ স্কলারদের পারিশ্রমিক দেয়া হোক

প্রতিটি ইসলামী ব্যাংক একটি অঙ্গীকারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেটি হলো ব্যাংকটি যা বিক্রি করছে তা প্রকৃত অর্থেই শরিয়াহসম্মত। এ অঙ্গীকারের সত্যায়ন করেন শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ডের স্কলাররা। তারা প্রতিটি ইসলামী ব্যাংকিং পণ্য পরীক্ষা করেন, সুদ ও অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা থেকে তা মুক্ত কিনা তা যাচাই করেন এবং সেই অনুযায়ী ফতোয়া দেয়ার পর ব্যাংক পণ্যটিকে ‘শরিয়াসম্মত’ বলে অভিহিত করতে পারে। প্রায় সবখানেই এমন স্কলারদের নিয়োগ দেয়া হয় এবং নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠান থেকেই তারা পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এটিকে প্রান্তিক ত্রুটি না বলে এ শিল্পের কেন্দ্রীয় কাঠামোগত দুর্বলতা বলে ভাবতে হবে। গবেষকেরা বারবার লক্ষ করেছেন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যদের নিয়োগ দেয় পরিচালনা পর্ষদ এবং পারিশ্রমিক দেয় ব্যাংক নিজেই, যা পাহারাদার ও যার ওপর পাহারা, এ দুইয়ের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে।

যে স্কলার কোনো লাভজনক পণ্যকে শরিয়াহবিরোধী ঘোষণা করেন, তিনি কার্যত সেই প্রতিষ্ঠানেরই আয় হ্রাসের পক্ষে ভোট দেন। আবার ওই প্রতিষ্ঠানই তার পারিশ্রমিক দিয়ে থাকে। অর্থনীতির হিসাবটি স্পষ্ট: যেহেতু উপদেষ্টার সম্মানী নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ওপর এবং প্রতিষ্ঠানের আয় নির্ভর করে উপদেষ্টার অনুমোদনের ওপর, তাই ‘হ্যাঁ’ বলার দিকেই একটি অন্তর্নিহিত চাপ থেকে যায় (কোজেন্ট ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্স)। এ একক নির্ভরশীলতা থেকে তিন ধরনের বিচ্যুতি ঘটার ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্রথমটি হলো খোদ পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব। সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচালিত এক গবেষণায় আমি দেখিয়েছি যে প্রচলিত পরিচালনা পর্ষদ পরিমাপযোগ্যভাবে শরিয়াহ বোর্ডের সুশাসনকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে পর্ষদ শক্তিশালী হলে ইতিবাচকভাবে, কিন্তু দুর্বল হলে নেতিবাচকভাবেও (সাইফুল্লাহ, মিয়াহ, আজাদ এবং হাসান, ২০২৪)। দ্বিতীয়টি হলো যাকে এ শিল্প নিচু স্বরে ‘ফতোয়া-শপিং’ বলে—কোনো প্রতিষ্ঠান এক বোর্ডের উত্তর পছন্দ না করলে অন্য কোনো স্কলারের কাছে যেতে পারে যিনি তার চাহিদামাফিক উত্তর দেবেন। আমার সহলেখকেরা ও আমি এ চর্চার আইনি তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে দেখেছি যে এটি এ শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য একটি বাস্তব ও ক্ষয়কারী হুমকি (ওসেনি, আহমাদ এবং হাসান, ২০২৮)। তৃতীয়টি হলো প্রতিবেদন-শৃঙ্খল। বহু ব্যাংকে দৈনন্দিন যাচাইয়ের কাজ করা শরিয়াহ বিভাগ স্কলারদের কাছে নয়, বরং ব্যবস্থাপনার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। ফলে যারা সমস্যা শনাক্ত করেন তারা জবাবদিহি করেন তাদের কাছেই, যারা হয়তো সমস্যাটির জন্য দায়ী (এশিয়ান রিভিউ অব অ্যাকাউন্টিং)।

এ নির্ভরশীলতাগুলো ব্যাংকের নিজের জন্যও নিখরচায় নয়। বহু দেশের ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় আমার সহকর্মীরা ও আমি দেখেছি, কোনো ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ডের সুনাম তার মধ্যস্থতা-মুনাফার সঙ্গে সম্পর্কিত—স্কলারদের মর্যাদা আক্ষরিক অর্থেই ব্যবসায়িক মূল্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় (আজমি, হাসান, রাজাক এবং আলী, ২০২৫)। সুনামের যদি মূল্য থাকে, তবে যে স্বাধীনতা সেই সুনামের ভিত্তি, তা ব্যয় হিসেবে কমিয়ে আনার বিষয় নয়, বরং রক্ষা করার মতো এক সম্পদ।

বাংলাদেশের শরিয়াহ সুশাসন নিয়ে আমার নিজস্ব গবেষণায়—সহলেখকদের সঙ্গে দ্য এডিনবার্গ কম্প্যানিয়ন টু শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ইন ইসলামিক ফাইন্যান্সের জন্য পরিচালিত চিত্রটি উদ্বেগজনক। আমাদের বোর্ডগুলো দক্ষ ও আন্তরিক, কিন্তু কাঠামোগতভাবে তারা এমন এক জায়গায় বসানো যেখানে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। স্কলারের জীবিকা, তার পুনর্নিয়োগ এবং শিল্পে তার অবস্থান—সবকিছুই প্রবাহিত হয় সেই প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যাকে তার পাহারা দেয়ার কথা। গৃহকর্তার বেতনভোগী পাহারাদার যখন নিচু স্বরে ঘেউ ঘেউ করে, তখন আমাদের বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। সমস্যা স্কলারদের চরিত্রে নয়। সমস্যা তাদের ঘিরে থাকা কাঠামোয় এবং আমি অন্যত্র যুক্তি দিয়েছি, শরিয়াহ সুশাসনের সমগ্র দৃষ্টান্তটিকেই কেবল সামান্য সংস্কার নয়, পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজ। অন্যান্য বিচার ব্যবস্থা এরই মধ্যে এ কাঠামো নতুন করে গড়ে তুলেছে এবং তাদের অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয়।

মালয়েশিয়া সবচেয়ে বিকশিত উত্তরটি দেয়। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল পরিচালনা করে, যা ১৯৯৭ সালে দেশের ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ শরিয়াহ কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় (ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া)। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০০৯ সালের সেন্ট্রাল ব্যাংক অব মালয়েশিয়া আইনের অধীনে এ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত সব ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তাকাফুল অপারেটর, আদালত ও সালিশকারীর জন্য বাধ্যতামূলক। যে জাতীয় সংস্থার কথাই আইন, তা অপেক্ষাকৃত অনুকূল মতামত খোঁজার প্রবণতা দূর করে দেয়: কর্তৃত্বের একটি মাত্র দরজা থাকে এবং সেটি কোনো ব্যাংকের মালিকানাধীন নয়। ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাইও অনুরূপ কেন্দ্রীভূত মডেল নিয়েছে।

বাহরাইন দ্বিতীয় একটি স্তর দেখায়। রাজ্যটির নতুন জারিকৃত নিয়ন্ত্রক শরিয়াহ সুশাসন মডিউল বিশ্লেষণ করে আমার সহলেখকেরা ও আমি দেখিয়েছি, কীভাবে একটি জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা গোটা ইসলামী ব্যাংকিং শিল্পজুড়ে বাধ্যতামূলক সুশাসন-শর্ত আরোপ করতে পারে—বোর্ডের গঠন, স্বাধীনতা ও প্রতিবেদন-শৃঙ্খলের ওপর। আন্তর্জাতিক মাননির্ধারক সংস্থা এএওআইএফআই, যেটিও বাহরাইনভিত্তিক, যুক্ত করে সমন্বয়ের স্তরটি: এর শরিয়াহ মানদণ্ডগুলোর অস্তিত্বের কারণই হলো ফতোয়াগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনা, স্বার্থের সংঘাত প্রশমিত করা এবং বিচ্ছিন্ন রায় গোটা শিল্পের জন্য যে সুনামগত ঝুঁকি তৈরি করে তা হ্রাস করা। এ মানদণ্ডগুলোর এক সর্বাঙ্গীণ পর্যালোচনায় আমি যুক্তি দিয়েছি যে এএওআইএফআই এর কাঠামোই এ শিল্পের কাছে থাকা একটি অভিন্ন রেফারেন্সের সবচেয়ে কাছাকাছি বিষয় এবং এর ব্যাপকতর গ্রহণ প্রতিষ্ঠানভিত্তিক খামখেয়ালির সুযোগ সংকুচিত করবে।

এ দেশগুলোর শিক্ষা অভিন্ন। স্বাধীনতা তখনই উন্নত হয় যখন স্কলারের কর্তৃত্ব ও স্কলারের বেতন এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমন এক সংস্থার হাতে ন্যস্ত করা হয়, যাকে কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে, বরখাস্ত করতে বা অর্থের জোরে প্রভাবিত করতে পারে না। একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল কর্তৃত্বের সমস্যার সমাধান করে। কিন্তু তা একা অর্থের সমস্যার সমাধান করে না—আর অর্থের সমস্যাটিই হলো সেই জায়গা যেখানে সত্যিকারের একটি নতুন ভাবনা প্রয়োজন।

প্রস্তাবটি এই। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা প্রতি বছরই এমন কিছু অর্থের জোগান দেয় যা কারো রাখার কথা নয়। যখন কোনো শরিয়াহসম্মত প্রতিষ্ঠান বা তহবিল অনিচ্ছাকৃতভাবে শরিয়াহবিরোধী আয় অর্জন করে—বিক্ষিপ্ত সুদ, কোনো স্ক্রিনকৃত কোম্পানির অশুদ্ধ আয়ের ক্ষুদ্র অংশ—তখন সেই কলুষিত অর্থ পরিশোধন করতে হয়, অর্থাৎ দান করে দিতে হয় এবং দাতা তা থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারেন না। এ পরিশোধন বার্ষিক ভিত্তিতে নিরীক্ষিত হিসাবের বিপরীতে গণনা করা হয় এবং মুনাফা বণ্টনের আগেই অশুদ্ধ অংশটি সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমানে এ অর্থপ্রবাহ অস্বচ্ছভাবে নানা দাতব্য খাতে ছড়িয়ে দেয়া হয়; গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতিতে পরিশোধন করে।

এর পরিবর্তে সেই অর্থপ্রবাহকে পরিচালিত করা হোক একটি স্বাধীন, পেশাদার ব্যবস্থাপনায় ওয়াক্‌ফ তহবিলের দিকে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে এ শিল্পে নিয়োজিত শরিয়াহ স্কলারদের বেতন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ব্যয় নির্বাহ করা। তখন স্কলারগণ নিযুক্ত হবেন এবং পারিশ্রমিক পাবেন এমন এক তহবিল থেকে, যা কোনো একক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। ব্যাংক আর কোনো সুবিধাজনক ফতোয়াকে পুরস্কৃত করতে বা অসুবিধাজনক ফতোয়াকে শাস্তি দিতে পারবে না, কারণ অর্থের থলিটি আর তার হাতে থাকবে না। স্কলারের আয় আসবে সমগ্র শিল্প থেকে, একত্রিত ও নিরাপদ দূরত্বে—ঠিক যেমন বিচারকের বেতন আসে রাষ্ট্রের কাছ থেকে, তার সামনে উপস্থিত মামলার পক্ষগুলোর কাছ থেকে নয়।

দুটি আপত্তির সৎভাবে জবাব দিতে হবে, নইলে প্রস্তাবটি উত্থাপনের যোগ্য নয়। প্রথমটি ফিকহের প্রশ্ন: পরিশোধিত আয় সাধারণ দরিদ্রের কল্যাণে ব্যয়িত দাতব্যের জন্য নির্ধারিত এবং কোনো স্কলার যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে তা থেকে শিল্প-বিশেষজ্ঞদের বেতন দেয়া বৈধ কিনা। উত্তরটি নিহিত আছে নকশার ভেতরেই। তহবিলটিকে যেকোনো ব্যাংক থেকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে হবে; এটিকে কোনো দাতার বাণিজ্যিক স্বার্থ নয়, বরং একটি জনকল্যাণমূলক কর্ম সম্পাদন করতে হবে—কোটি কোটি সাধারণ মুসলিম যে ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন, তার সততা রক্ষা; এবং এর বৈধতা সম্পর্কিত রায়টি আসতে হবে একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের কাছ থেকে, উপকারভোগীদের কাছ থেকে নয়। বিজ্ঞ স্কলারদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে এবং সেই বিতর্ক উন্মুক্তভাবেই হওয়া উচিত। দ্বিতীয় আপত্তিটি সুশাসনের: কঠোর ও প্রকাশিত নিরীক্ষা ছাড়া একটি সমন্বিত তহবিল সমস্যার সমাধান করে না, কেবল সমস্যাটির স্থান পরিবর্তন করে। তহবিলটির প্রয়োজন হবে স্বচ্ছ হিসাব, একটি স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ এবং এমন ব্যবস্থা যাতে কোনো দাতা তার দান কোনো নির্দিষ্ট স্কলারের বেতন পর্যন্ত অনুসরণ করতে না পারে।

কোনো আপত্তিই মারাত্মক নয়। উভয়ই সতর্কভাবে নকশা করার কারণ—বর্তমান ব্যবস্থাটিকে অপরিবর্তিত রেখে দেয়ার কারণ নয়; এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে আপনার সঞ্চয় হালাল বলে যিনি সত্যায়ন করছেন, তাকে বেতন দিচ্ছে সেই কোম্পানি যে আপনার কাছে তা বিক্রি করছে। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা জনগণের কাছে এক বিশেষ ধরনের আস্থা প্রত্যাশা করে। সেই আস্থা কেবল ততটুকুই দৃঢ়, যতটুকু দৃঢ় সেই স্কলারদের স্বাধীনতা যারা এর জামিনদার। একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ তাদের এমন এক কণ্ঠস্বর দিতে পারে যা কোনো একক প্রতিষ্ঠান স্তব্ধ করতে পারবে না। এ শিল্প যে অর্থ নিজের কাছে রাখার অধিকার নেই বলে এরই মধ্যে স্বীকার করে নিয়েছে, তা দিয়ে গড়া একটি ওয়াক্‌ফ তহবিল তাদের এমন এক আয় দিতে পারে যা কোনো একক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাহার করতে পারবে না। স্কলারদের এ দুটিই দিন—তাহলে তাদের ফতোয়া হয়ে উঠবে ঠিক তা-ই, যা হওয়ার কথা ছিল: ভয় ও লোভহীনভাবে প্রদত্ত এক অভিমত।

এম. কবির হাসান: ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ফিন্যান্সের অধ্যাপক এবং ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস প্রাইসেস অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের মফেট চেয়ার, ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থ ব্যবস্থায় ২০১৬ সালের আইডিবি পুরস্কারজয়ী এবং এএওআইএফআই এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য

আরও