প্রতিক্রিয়া

শুধু কোটা সংস্কার নয়, বহু মানুষের প্রাণ গেল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে এলাম

গত কয়েক সপ্তাহে ছাত্রছাত্রীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছে। ২০১৮ সালে একই আন্দোলনের পর সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট কোটা সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। যদিও আন্দোলনকারীরা কোটা বাতিল চায়নি, তার ন্যায্য সংস্কার চেয়েছিল। ২০১৮ সালের আগেও বেশ কয়েকবার কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। মোট

গত কয়েক সপ্তাহে ছাত্রছাত্রীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছে। ২০১৮ সালে একই আন্দোলনের পর সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট কোটা সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। যদিও আন্দোলনকারীরা কোটা বাতিল চায়নি, তার ন্যায্য সংস্কার চেয়েছিল। ২০১৮ সালের আগেও বেশ কয়েকবার কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। মোট কোটার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্তুতিদের জন্য বরাদ্দ করা নিয়ে সংক্ষোভের জায়গা ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা অবশ্যই সম্মানের পাত্র, তাদের জন্য দেয়া সুবিধা ঠিক আছে। কিন্তু সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য সুবিধা ধরে রাখা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত। এমনকি সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর পদোন্নতির ক্ষেত্রেও মুক্তিযোদ্ধা কোটাধারীরা সুবিধা পাচ্ছেন। অর্থাৎ কোটা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশের পরও একই কোটায় একাধিকবার সুবিধা পাচ্ছেন। এটা কখনই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত ছিল না। 

একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক কোটা থাকতে পারে; এটা স্বাভাবিক। বিশ্বের অনেক দেশেই কোটা রয়েছে। বঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা থাকা যৌক্তিক। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ কোটা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সে কোটা একবার নেয়ার পর বারবার সুবিধা নেয়া যুক্তিসংগত হতে পারে না। আবার মুক্তিযোদ্ধার ছেলে কোটা সুবিধা নেয়ার পর নাতি-নাতনি নেয়ার বিষয়টি একেবারেই অযৌক্তিক। যুক্তরাষ্ট্র বলেন, ভারত বলেন—অনেক দেশেই কোটা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রেড ইন্ডিয়ানসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের জন্য কোটা রয়েছে, ভারতেও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা রয়েছে। অর্ধেকেরও বেশি কোটায় নিয়োগ কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। 

বাংলাদেশে কোটা ইস্যু নিয়ে উচ্চ আদালত গতকাল একটি রায় দিয়েছেন। মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বাকি ৭ শতাংশ অন্যান্য গোষ্ঠীর জন্য রাখা হয়েছে। উচ্চ আদালতের এ রায় ছাত্ররা মানবে কি মানবে না এটা তাদের ব্যাপার। অবশ্য ছাত্রদের মূল দাবির কাছাকাছি জায়গাতেই রায়টি এসেছে। আগে থেকেই চাকরির কোটায় বেশকিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। পদোন্নতি থেকে বিশেষ জায়গায় পদায়নের ক্ষেত্রেও প্রকৃত মেধাবীদের চেয়ে কোটায় আসা লোকজন প্রাধান্য পায়। আমি অনেক আমলাকে চিনি যারা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং বিসিএসে প্রথম, দ্বিতীয় হয়েছিলেন তবে চাকরিজীবনে প্রত্যাশিত পদোন্নতি পাননি। অনেকেই খুব হতাশার মধ্যে আছেন, আবার কেউ কেউ আগাম অবসরে যেতেও বাধ্য হয়েছেন। নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা কোটায় নিয়োগ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু পদোন্নতি ও বিশেষ পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও পারফরম্যান্সের ওপর জোর দিতে হবে। এটা যদি সুনিশ্চিত না করা যায় তাহলে সংকট রয়ে যাবে। 

কোটা আন্দোলনের ফলে কী হলো এবার তাতে মনোযোগ দেয়া যাক। শিক্ষার্থীরা ১ জুলাই থেকেই আন্দোলন করে আসছিল। দুই সপ্তাহ আন্দোলন চলার পরও সরকারের অনড় অবস্থান—তারা কোটা মানবে না। এখন জ্বালাও-পোড়াও ও সরকারি স্থাপনা ধ্বংসের মতো কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা ছাত্রদের আন্দোলন ছিল না। এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম কখনই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার তার দায় এড়াতে পারে না। আন্দোলনকারীদের অনেক দাবিই এখন সরকার মেনে নিচ্ছে, কিন্তু বহুত দেরি হয়ে গেল। 

সরকার বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে তাও কাম্য নয়। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। মোবাইল ডাটাও কাজ করছে না, ওয়াই-ফাইও কাজ করছে না। ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ও লেনদেন বন্ধ থাকার কারণে পুরো অর্থনীতি থমকে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রোববার ও সোমবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে অফিস-আদালত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এগুলো তো ঠিক ইতিবাচক কোনো কাজ হচ্ছে না। এমনিতেই আমাদের অর্থনীতি বহুমুখী সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট, জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণসহ নানামুখী সমস্যায় এমনিতেই অর্থনীতি বেহাল ছিল। মূল্যস্ফীতি প্রশমন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে যখন শৃঙ্খলা আনা জরুরি ছিল সে মুহূর্তে অর্থনীতি পুরোপুরি স্থবির করে দিল। সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। কারফিউ ও সাধারণ ছুটির ফলে পণ্য সরবরাহ তো আরো বন্ধ হয়ে যাবে, এতে দ্রব্যমূল্য কোথায় গিয়ে ঠেকবে? 

এদিকে সমুদ্রবন্দরেও কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। যদিও বিমানবন্দর সচল রাখা হয়েছে বলা হচ্ছে কিন্তু অনেক ফ্লাইটও বাতিল হচ্ছে, বিমানবন্দরে পৌঁছতে ভোগান্তির মধ্যে পড়ছে মানুষ। ব্যবসায়ীদের যোগাযোগের প্রধান বাহন ছিল ইন্টারনেট। যত রকমের অর্ডার দেয়া, কনফার্মেশনসহ যাবতীয় বিষয় তো ইন্টারনেট ছাড়া সম্ভব নয়। এছাড়া সাধারণ মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেসব বিল দিত, পরিষেবা গ্রহণ করত তা থমকে দাঁড়িয়েছে। যেসব গ্রাহক কার্ড রিচার্জের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগসহ বিভিন্ন পরিষেবা নিচ্ছিল তারা তো বেশ বিপাকে পড়েছেন। ই-কমার্স খাতের কার্যক্রমও একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। ইন্টারনেটে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ। ফলে সরবরাহ চেইনেও অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পণ্য উৎপাদন, বাজারজাত থেকে শুরু করে সরবরাহ সব থমকে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ যোগাযোগ ও লেনদেন যদি না করা যায় তাহলে কীভাবে এ কাজগুলো সম্পন্ন হবে? 

ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও বিদেশের সঙ্গে আমাদের অনেক ধরনের যোগাযোগ করতে হয়। যারা এ দেশে বিনিয়োগ করবে তারা বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ রকম ব্ল্যাকআউটের ফলে তারা তো এ দেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী হবে না। সামষ্টিক অর্থনীতিতে আগে থেকেই সমস্যা ছিল, এখন পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দেশের মানুষের আস্থা আগে থেকেই কমে গিয়েছিল। আমাদের অনেক ব্যবসায়ীই দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে বিনিয়োগমুখী হচ্ছিলেন। এ ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে এখন তারা তো বিনিয়োগে আগ্রহী হবেনই না, বরং বিদেশীরা আর আগ্রহ দেখাবেন না। আমাদের ভাবমূর্তির একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেল এবং এর সুদূরপ্রসারী একটি প্রভাব রয়ে যাবে। 

আমরা আগে থেকেই বলছিলাম অর্থনীতি সঙ্গিন, এখন তো বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে এলাম। বিপর্যয় ঠেকাতে দ্রুত অ্যাকশন নিতে হবে। কোটা আন্দোলনের পক্ষে কিন্তু সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমে এসেছে। শুধু সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধেই নয়—বিভিন্ন জায়গায় অনেক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল তারা। মানুষের চাকরি-বাকরি, ভবিষ্যৎ কোথাও কোনো রকমের নিশ্চয়তা নেই। যে মাদ্রাসায় বা স্কুলে পড়ছে, সেও চিন্তা করছে, আমি কী করব, আমার বড় ভাই তো এখনো বেকার। বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। আমি নিজে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। সেখানে দেখছি বহু ছাত্রছাত্রী চাকরি পাচ্ছে না। নিজেদের দোষে নয়, বাজারের দোষ—সবচেয়ে বড় দোষ হলো এখানে সুষ্ঠু গভর্ন্যান্স নেই, স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা নেই—সরকারি পর্যায় বলুন আর বেসরকারি পর্যায়ে বলুন। সামষ্টিক অর্থনীতিই বেহাল। ফরেন রিজার্ভ আপনি কীভাবে বাড়াবেন তার কোনো স্পষ্ট পথনির্দেশিকা নেই। এডিবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, যারা লোন দেবে বা এরই মধ্যে দিয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠু ব্যবহার হবে কিনা তা নিয়েও তারা যথেষ্ট চিন্তিত থাকবে। তারা তো চেয়েছে এগুলো ব্যবহার করবেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হবে, মানুষের জীবন-জীবিকায় প্রভাব ফেলবে। 

এখন জীবন-জীবিকার ব্যাপারটায় আসি। দেখবেন বহু লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে আসছে। সবাই কি দুষ্কৃতকারী? সবাই দুষ্কৃতকারী নয়। সবাই তো ধ্বংসযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেনি। অনেকে নীতিগতভাবে সমর্থন জানাতে গেছে। কারণ সবাই দেখছে তারাও তো অনেক জায়গায় বঞ্চিত হচ্ছে, তাদেরও অনেক জায়গায় অসুবিধা হচ্ছে। তাদের বাসস্থান থেকে শুরু করে ইউটিলিটি সার্ভিস, গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি, ওয়াসা—সবখানেই তাদের সমস্যা হচ্ছে। জীবন-জীবিকা সবার জন্যই কঠিন হয়ে পড়েছে। সেটা মধ্যবিত্ত বলুন, নিম্ন মধ্যবিত্ত বলুন আর দরিদ্রের কথা বাদই দিলাম। 

সরকারের একটা লক্ষ্য মনে হচ্ছে—এখানে থাকব, প্রশাসন মেনটেইন করব, আর জনগণের দাবিগুলোয় পাত্তা দেব না। কিন্তু জীবন-জীবিকার যে বিভিন্ন উপাদান; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ইত্যাদি দিন দিন তা মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর গত কয়েক দিনের আন্দোলনে এটা আরো পিছিয়ে গেছে। এমনিতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা অন্য ব্যাপার। এসব ক্ষয়ক্ষতি তো আপনি পুষিয়ে নিতে পারবেন। মানুষের যে আস্থা নষ্ট হলো, সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কর্তাব্যক্তি ও সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর প্রতি মানুষের যে সন্দেহ চলে এল, সেটা মোটেও ভালো হয়নি। এটা কিন্তু ভবিষ্যতেও খারাপ আবহ সৃষ্টি করবে। আমরা যে ব্যবসায়িক আবহের কথা (বিজনেস এনভায়রনমেন্ট) তা নষ্ট হয়ে গেল। ভবিষ্যতে যে তা উদ্ধার করতে পারবেন তার নিশ্চয়তা কী? পারবেন যদি সেখানে জনগণের সহযোগিতা থাকে—সেটা না হলে তা হয়তো আর সম্ভব হবে না। 

যে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে তা শেষ হয়ে যাবে—আমি মনে করি না। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকবে। বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—সামষ্টিক অর্থনীতি এবং গ্রাহক লেভেলে মানুষের জনজীবনে যে প্রভাব, সে সংক্রান্ত উপাত্ত নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। আমরা ফরেন রিজার্ভ নিয়ে কথা বলি, মূল্যস্ফীতি নিয়ে কথা বলি, বেকার সমস্যা নিয়ে কথা বলি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন সূচকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। যেমন আমরা বলি, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলব, তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি সাধন করব। স্মার্ট বাংলাদেশ কীভাবে গড়ে তুলবেন আপনি? এই যে সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ পেয়েছে ৬২ পয়েন্ট, ভিয়েতনাম ৮৫, ভুটান ৮৫ দশমিক ৯, বৈশ্বিক গড় সেখানে ৭৪ দশমিক ৮। আর নিম্ন আয়ের দেশের গড় হলো ৬৪ দশমিক ৮। অর্থাৎ বাংলাদেশের পয়েন্ট নিম্ন আয়ের দেশের গড় পয়েন্টের চেয়েও কম। অথচ বলছি, আমরা তথ্যপ্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে। তার ওপর আবার এখন ইন্টারনেট বন্ধ করা আছে, তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, টেলিভিশনে অনেক আগে থেকেই সেন্সর দেয়া। এসব করে আমাদের লাভ কী হচ্ছে? এর সঙ্গে যুক্ত আছে আমাদের তথ্যে অসংগতি। কিছুদিন আগেও আমরা দেখেছি, আমাদের রফতানি তথ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে এবং একই অবস্থা মূল্যস্ফীতি, দরিদ্রতার হার, মানুষের পুষ্টিমান প্রভৃতি ক্ষেত্রেও; সঠিক তথ্য নেই। একদিকে এসব বিষয়ে ঠিকমতো তথ্য সংগ্রহ করা হয় না, আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক গোষ্ঠী মানুষকে অগোচরে রাখার জন্য নানা কৌশল ব্যবহার করে। তথ্য যদি ঠিক না থাকে তাহলে সঠিক নীতি ও তার বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৩-এর দিকে যদি লক্ষ করি, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিক বিবেচনায় ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হলো ১০৫। প্রথম স্থানে আছে সুইজারল্যান্ড, দ্বিতীয় সুইডেন এবং তৃতীয় হলো যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের নানা বিষয় আমরা অনুসরণ করতে যাই। এ সূচকে ভারতের অবস্থান ৪০তম। তাহলে এক্ষেত্রে ভারতকে কেন অনুসরণ করছি না? আবার অনেক টালমাটাল অবস্থার মধ্যেও শ্রীলংকার অবস্থান ৯০তম। সবচেয়ে শেষের দিকে আছে অ্যাঙ্গোলা, নাইজারের মতো আফ্রিকার কিছু দেশ। বাংলাদেশ কি ওই কাতারে চলে যাচ্ছে! এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। 

এসব কিছুই তো সামষ্টিক অর্থনীতির অংশ। এসব ছাড়া কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য হবে? কীভাবে প্রতিযোগিতা করবে বাংলাদেশ? অতএব এগুলো যদি ঠিক না করি তাহলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা আনব কী করে। কোটা আন্দোলন কিন্তু সাধারণ মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরিতে অধিকার ও সমতা নিয়ে সচেতন করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের বিপর্যয়ের সামনে দাঁড় করিয়েছে। এ থেকে উদ্ধার পেতে হলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, দ্রুত ইন্টারনেট চালু করতে হবে। ডাটা সেন্টার মেরামতের কথা বলে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে। তারপর রবি-সোম, দুইদিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা দেয়া হয়েছে যেন সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এভাবে বন্ধ করে দিয়ে কি সমস্যা সমাধান করা যাবে? ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ায় নানা ধরনের ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে। এতে তো আরো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। 

জরুরি ভিত্তিতে ইন্টারনেট চালু করতে হবে, অফিস-আদালত খুলে দিতে হবে, পরিবহন ব্যবস্থা সচল করে দিতে হবে। এ রকম বদ্ধ অবস্থায় বিভিন্ন গুজব ছড়াচ্ছে যা কাম্য হতে পারে না। মেট্রোরেলের কয়েক জায়গায় ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু সার্বিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়নি। এমন নয় যে বিরাট ঝড়-ঝাপটা, ভূমিকম্প হয়ে গেছে, বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে। এটা তো মনুষ্যসৃষ্ট ঘটনা; সরকারের ব্যর্থতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা। যা-ই হোক, এখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন নয়। জাপানের হিরোশিমার মতো বোমা ফেলা হয়নি, যুদ্ধ হয়নি। এর থেকে বের হতে হলে সরকারের সদিচ্ছা লাগবে।

শুধু কোটা সংস্কার নয়, সরকারের যে সংস্কারভীতি রয়েছে তার একটা প্রমাণ আমরা এবার পেলাম। ১ জুলাই থেকে আন্দোলন শুরু হয়েছে, এক-দুদিন পর সরকার বলতে পারত—হ্যাঁ, এটা সংস্কার করা যেতে পারে। তা না বলে বলা হলো ‘এটা কোনো সমস্যা না’। এই তো সংস্কারভীতি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হচ্ছে না। একই কথা প্রযোজ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেলায়ও। নীতিগত ব্যর্থতার জন্য রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের যথেষ্ট আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। শুধু সরকার নয়, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও যথেষ্ট ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। সরকার ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাদেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ সময় যাতে কেউ নেতিবাচক কর্মকাণ্ড না করে, এজন্য সব রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মীদের নির্দেশনা দেয়া দরকার।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

আরও