নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে চাই সরকারের বিচক্ষণ কর্মপদক্ষেপ

এবারের নির্বাচনে জয়ী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তৈরি করলেন এক অনন্য নজির। এবারের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ভোটের মাঠের প্রধান প্রতিপক্ষদের সঙ্গে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর দেখা করেছেন। এমন আচরণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও আস্থার সংকেত পৌঁছে দেয়। তবে এ ধারা নির্বাচনের পরেই থামিয়ে দিলে চলবে না।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন ভোটার হিসেবে ভোটদানের অভিজ্ঞতা ছিল এককথায় অপূর্ব। এ নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক যে হতাশা ছিল তার মাঝে আশার আলো দেখা গেছে। এ ভোটে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ববোধ আর আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ভোটের ব্যবস্থাপনা দেখে মনে হয়েছে, পরিবেশ মানুষকে তৈরি করে এ কথা যেমন সত্য, তেমনি মানুষই পরিবেশকে সৃষ্টি করে এ কথাও সত্য।

এ নির্বাচন আয়োজনের কাজটি সহজ ছিল না। নির্বাচনের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল সুষ্ঠু ও ভোটদানের জন্য ভালো একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার সদিচ্ছা দেখানো। একই সঙ্গে নানা পক্ষের আস্থাহীনতাও দূর করার প্রতিবন্ধকতাও ছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে ছিল। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন সংগ্রামে ন্যুব্জ থাকায় গোটা দেশের মানুষই ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশ কোনো ইতিবাচক ও দেশপ্রেমসম্পন্ন নেতৃত্ব পায়নি। তাই জাতি ক্ষণে ক্ষণে বিচ্যুত হয়েছে। দিশেহারা হয়েছে, হয়েছে পথহারা।

এবারের নির্বাচনে জয়ী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তৈরি করলেন এক অনন্য নজির। এবারের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ভোটের মাঠের প্রধান প্রতিপক্ষদের সঙ্গে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর দেখা করেছেন। এমন আচরণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও আস্থার সংকেত পৌঁছে দেয়। তবে এ ধারা নির্বাচনের পরেই থামিয়ে দিলে চলবে না। বরং ভবিষ্যতেও প্রতিপক্ষদের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পথচলা নিশ্চিত করার বার্তা পৌঁছানোও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য জরুরি। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এখনো রাজনীতিকদের মধ্যে সৌজন্যতা, শিষ্টাচার ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের রীতি আমাদের দেশে খুব কম। সে ধারায় বদল আনার সুযোগ এখনই। এক্ষেত্রে জয়ী দলের দায়িত্ব সর্বপ্রথম।

সংসদে এবার বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়েও জনমনে কৌতূহল রয়েছে। বিরোধী পক্ষ হিসেবে তাদের ভূমিকা সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করা। এ সহযোগিতা মূলত পরামর্শ দিয়ে, সমালোচনা এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদ করে করতে হবে। বিরোধী দল সংসদে মূলত ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করে। একটি দায়িত্বশীল ‘ওয়াচডগ’ গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য বলেই স্বীকৃত। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে নির্বাচনে পরাজিত পক্ষ কখনই সহিংসতার যুক্তি, অনুপ্রেরণা এমনকি অজুহাতও পায় না। তবু কিছু ঝুঁকি থাকে। বিএনপিকে এখন এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। নির্বাচনে প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে অভূতপূর্ব দায়িত্ব পালন করেছে সেদিকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বিএনপির একাধিকবার সরকার গঠনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দলটিতে অনেক অভিজ্ঞ, দায়িত্বশীল নেতাকর্মী রয়েছেন। জনমানুষের কাছে দলটির জনপ্রিয়তা আছে। নির্বাচনে তাই নিরঙ্কুশ সংখাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এদিক থেকে বিচার করলে দলটির জন্য সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়ায় চ্যালেঞ্জ কম। কিন্তু সরকার গঠন করার পর সুশৃঙ্খলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আছে অনেক প্রতিবন্ধকতা। সরকারকে এখন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে প্রশাসন, সামরিক বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব পক্ষের সঙ্গেই আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি আস্থার বাণী পৌঁছনো দরকার। সব ধরনের প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধমূলক কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকতে হবে। আর বাস্তবতা ও জন-আকাঙ্ক্ষার পূরণার্থে, দুর্নীতি আর অপশাসন রোধকল্পে এবং সর্বোপরি নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নযোগ্য মন্ত্রিপরিষদ গঠনে অধিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।

সিকদার আনোয়ার: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব

আরও