কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, এমন যুক্তিতে অনেকেই নিম্নমানের পোশাক, জুতা কিংবা বৈদ্যুতিক পণ্য কিনে ফেলেন। শুরুতে মনে হয়, এতে কিছু টাকা বেঁচে গেল। কিন্তু অল্পদিন পর পণ্যটি নষ্ট হয়ে গেলে আবার নতুন করে কিনতে হয়। তখনই বোঝা যায়, যে টাকা বাঁচানোর জন্য কম দামের পণ্যটি কেনা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিতে এমন পরিস্থিতিকে বলা যায় ‘ফলস ইকোনমি’। অর্থাৎ এমন সাশ্রয়, যা আপাতদৃষ্টিতে ব্যয় কমায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আরো বাড়িয়ে দেয়। ব্যক্তিজীবন থেকে ব্যবসা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রীয় প্রকল্প, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর নানা উদাহরণ রয়েছে।
পণ্যের ক্রয়মূল্যই তার প্রকৃত মূল্য নয়; এর সঙ্গে যুক্ত করতে হয় স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, প্রতিস্থাপন ও ব্যর্থতার সম্ভাব্য খরচও
সমস্যার জায়গাটি হলো, কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমরা সাধারণত হিসাব করি, কত টাকা খরচ হচ্ছে বা কত টাকা বাঁচানো যাচ্ছে। কিন্তু সে সিদ্ধান্তের প্রভাব আগামী এক বছর, পাঁচ বছর কিংবা ১০ বছরে কী দাঁড়াবে, তা অনেক সময় বিবেচনায় নেয়া হয় না। অথচ প্রকৃত সাশ্রয়ের হিসাব শুধু আজকের ব্যয়ে নয়; বরং ভবিষ্যতে সে সিদ্ধান্তের কারণে কতটা বাড়তি খরচ, ক্ষতি কিংবা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।
দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনে ‘ফলস ইকোনমি’-এর প্রবণতা খুব বেশি। কম দামের জুতা কিনে কয়েক মাস পর সেটি নষ্ট হলে আবার নতুন জুতা কিনতে হয়। আবার নিম্নমানের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কেনার কারণে তৈরি হতে পারে আগুন লাগার ঝুঁকি। কম দামের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে ভবন বানানোর পর কয়েক বছরেই সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ একটু গভীরে ভাবতে গেলে, পণ্যের ক্রয়মূল্যই তার প্রকৃত মূল্য নয়; এর সঙ্গে যুক্ত করতে হয় স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, প্রতিস্থাপন ও ব্যর্থতার সম্ভাব্য খরচও।
ব্যবসা খারাপ গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রথমেই কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন কিংবা গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় কমায়। কারণ এসব খরচ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আয় দেখা যায় না। কিন্তু দক্ষ কর্মীর অভাবে উৎপাদনশীলতা কমে, ভুল বাড়ে, গ্রাহকসেবা খারাপ হয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশের শিল্প খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, অটোমেশন, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কর্মী তৈরি ছাড়া শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কঠিন। তার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণকে বিনিয়োগের বদলে ব্যয় হিসেবে দেখে। অথচ প্রশিক্ষণের অভাবে কর্মী যদি যন্ত্রপাতি ভুলভাবে পরিচালনা করেন, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ তখন ব্যর্থ হয়। সে ক্ষতির পরিমাণ প্রশিক্ষণ ব্যয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি হতে পারে। আবার দক্ষ কর্মী তৈরি না করে বদল করতে থাকলে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও নতুন কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার পেছনেও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।
দেশের অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো পুরনো সফটওয়্যার, যন্ত্রপাতি এবং তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে অর্থ লাগে, এ যুক্তিতে পুরনো ব্যবস্থাই চালিয়ে নেয়া হয়। অথচ পুরনো প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সময়ে সময়ে বাড়তেই থাকে, কাজের গতি কমিয়ে দেয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়। একপর্যায়ে পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের সংস্কার করতে হয়। তখন শুধু প্রযুক্তি বদলের খরচই হয় না; বন্ধ থাকে সেবা, ব্যাহত হয় উৎপাদন, নষ্ট হয় তথ্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠানের সুনাম। অর্থাৎ যে বিনিয়োগটি কয়েক বছর আগে ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে করা যেত, সেটিই তখন করতে হয় জরুরি ভিত্তিতে, অনেক বেশি খরচে।
সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—কম খরচে প্রকল্প শেষ করাই কি সাশ্রয়, নাকি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই একটি অবকাঠামো তৈরি করাই প্রকৃত সাশ্রয়? একটি সড়ক, সেতু, কালভার্ট কিংবা ড্রেন নির্মাণে শুরুতেই ভালো মানের উপকরণ ব্যবহার করলে প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে। কিন্তু স্থায়িত্ব বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে মেরামত ও পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন কমে। অন্যদিকে নিম্নমানের কাজের কারণে কোনো সড়ক নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে গেলে সেখানে আবার বরাদ্দ দিতে হয়। একই সড়ক বারবার সংস্কার করতে গিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ, মানুষের সময় এবং ব্যবসার উৎপাদনশীলতা সবকিছুর ওপরই চাপ পড়ে।
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়ও ‘আজ খরচ বাঁচাই, পরে দেখা যাবে’ মানসিকতার মূল্য দিতে হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা করা তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল। কিন্তু চিকিৎসা নিতে দেরি হলে অনেক রোগ জটিল আকার ধারণ করে। তখন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, পরিবারের আয় কমে এবং কর্মক্ষম একজন মানুষ দীর্ঘ সময় কাজের বাইরে থাকেন। একইভাবে সরকারি পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কম হলে পরবর্তী সময়ে বড় আকারের রোগ মোকাবেলায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
একটি দেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ শিক্ষা। তাই এখানে ব্যয় কমানোর প্রবণতা আরো বিপজ্জনক। শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, প্রযুক্তি এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ কমিয়ে দিলে বাজেটের হিসাবে কিছু টাকা বাঁচতে পারে। কিন্তু এর মূল্য দিতে হয় একটি প্রজন্মকে। দক্ষতা না থাকা একজন তরুণের জন্য চাকরির বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তখন আবার প্রশিক্ষণ দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে দক্ষ জনবলও আনতে হয়। অর্থাৎ শিক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না করার প্রভাব কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরো গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জ্বালানি ব্যবস্থা সস্তা মনে হচ্ছে বলে সেটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারদর, বিনিময় হার কিংবা সরবরাহ সংকটের কারণে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একইভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস অবকাঠামোয় সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ না করলে পরে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে হয়। তখন ব্যয় বাড়ে এবং উৎপাদনও ব্যাহত হয়। তাই জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু আজকের কম দাম নয়; সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, ভবিষ্যৎ মূল্য, অবকাঠামোর স্থায়িত্ব এবং আমদানির ঝুঁকিও এর অংশ।
সাশ্রয় অবশ্যই ভালো। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র সবারই অপচয় কমানো দরকার। কিন্তু সাশ্রয়ের নামে এমন জায়গায় ব্যয় বন্ধ করা উচিত নয়, যা সাময়িক না হলেও ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির মুখে নিয়ে যাবে। নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয়, কিন্তু মান কমিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সত্যিকারের সাশ্রয় হলো অপচয় কমানো। আর মিথ্যা সাশ্রয় হলো প্রয়োজনীয় ব্যয় কেটে ভবিষ্যতের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ এখন এমন এক অর্থনৈতিক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি অর্থ আরো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা জরুরি। সরকারি অর্থের চাপ বাড়ছে, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, জ্বালানি ও কাঁচামালের বাজার অস্থির এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও চাপ রয়েছে। এ বাস্তবতায় খরচ কমানো দরকার, কিন্তু কোথায় কমানো হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ওবায়দুল্লাহ সনি: প্রধান সহসম্পাদক, বণিক বার্তা