আলোকপাত

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে?

সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইনের কিছু ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়ায় ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা’র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যিনি নিজের বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে, নামে-বেনামে বা অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা পরিশোধ করবেন না, তাকেই বলা হবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক কর্তৃত্ব কমানো

সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইনের কিছু ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়ায় ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা’র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যিনি নিজের বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে, নামে-বেনামে বা অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা পরিশোধ করবেন না, তাকেই বলা হবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক কর্তৃত্ব কমানো হয়েছে। কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একটি পরিবারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক হতে পারবেন। বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ চারজন পরিচালক নিযুক্ত হতে পারছেন। আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের কর্তৃত্ব হ্রাস পাবে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ খেলাপি হলে তিনি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না। ঋণের অর্থ পরিশোধ করলেও তিনি পরবর্তী পাঁচ বছর আর পরিচালক হতে পারবেন না। অনুমোদন পাওয়া আইনে ঋণখেলাপিরা দেশের বাইরে যেতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হলে ৫০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে প্রতিদিন ১ লাখ টাকা করে জরিমানা দিতে হবে। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন ২০২৩-এ অধিকার ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘ব্যাংক’ শব্দ ব্যবহারের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর বা ৫০ লাখ টাকা দণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মাননা ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না এমন বিধানও অন্তর্ভুক্ত আছে। 

গত ৩১ বছরে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন হয়েছে সাতবার। এর মধ্যে এক পরিবার থেকে চারজন এবং টানা নয় বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকার সুযোগ দিয়ে করা হয়েছিল সর্বশেষ সংশোধন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠককালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে। জানা গেছে, আইএমএফের দেয়া শর্ত অনুযায়ী সরকার ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০২৩ নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। 

মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পাওয়া ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি শনাক্তকরণ প্রসঙ্গে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশক্রমে একটি কমিটি গঠন করবে। ওই কমিটি ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ শনাক্ত এবং চূড়ান্ত করবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকা প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাবে। এ তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশ করতে পারবে। আর চূড়ান্তভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আপিল করতে পারবেন। তবে এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। সেখানে আরো বলা হয়, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা হিসেবে শনাক্ত হলে তার ওপর গাড়ি-বাড়ি, জমি রেজিস্ট্রেশন এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এছাড়া যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলো অধিদপ্তর থেকে কোম্পানির নিবন্ধন এবং ট্রেড লাইসেন্স নিতে পারবে না। 

ব্যাংক খাতে এত দিন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি বলতে আলাদা করে কাউকে চিহ্নিত করা হতো না। তাই এর ফলে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মাননা বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাবেন না। তারা কোনো পেশাজীবী, ব্যবসায়িক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো পদেও থাকতে পারবেন না। সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়, কোনো ব্যাংকের পর্ষদে পরিচালক হিসেবে অন্য কোনো ব্যাংকের পরিচালক নিযুক্ত হতে পারবেন না। তবে এটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এছাড়া ব্যাংকের পরিচালক হওয়া ব্যক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের অন্য ব্যক্তি একই ব্যাংকে পরিচালক হতে পারবেন না। পরিচালনা পর্ষদে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যক্তিকে পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করা যাবে না।

মূলত এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতগুলো ভূমিকা থাকতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঠিক করা বেশ কঠিন কাজ। এখানে উদ্দেশ্য ভালো কিন্তু চিহ্নিত করবে কে। কেউ নিজে এসে বলবে না যে তিনি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। সেটা নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ তার অন্য কোনো ব্যবসা আছে কিনা, অন্য কোথাও টাকা সরিয়েছে কিনা ইত্যাদি দেখতে হবে। অন্য ব্যবসা ভালো করছে কিন্তু এখানে লোকসান কেন করছে বা অন্য ব্যবসা ভালো করলেও ঋণ কেন পরিশোধ করবে না, তা সামনে আসতে পারে। পুরো করপোরেশনটাকে ব্যবসা হিসেবে নেয়া হলে বলা যাবে, যা-ই ব্যবসা থাকুক টাকা নিয়েছ তাই টাকা ফেরত দিতে হবে। এমন ব্যবস্থা না নিলে লাভ হবে না। 

উদ্যোগগুলো ভালো কিন্তু এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা সুশাসনের অভাবের সংকট ঘুচবে ন্যা। তবে সরকারের এবারের আইন সংশোধনে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে যার প্রশংসা করতে হয়। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে প্রয়োগ সক্ষমতার ওপর। ২০১৮ সালে করা সংশোধনটি ছিল ব্যাংক খাতের জন্য একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। সেখানে পরিচালনা পরিষদের সদস্য সংখ্যা দুই থেকে চার করা হয়েছিল, ছয় বছর থেকে তাদের মেয়াদ নয় বছর করা হয়েছিল। তাই এখানে সংশোধন করার মতো তেমন কিছু নেই। আগের অবস্থানেই ফিরে গেল সরকার। তার মানে আগের সংশোধনীটি সঠিক ছিল না। এগুলো বড় আকারের পরিবর্তন আনবে নাকি এটি লোক দেখানোর জন্য করা হয়েছে—সেটি কাজে বোঝা যাবে। 

১৯৯১ সালের আইনে বেশ কয়েকটি ধারা আছে, তা মোটেও সুশাসনের জন্য সহায়ক নয়। ব্যাংক অধিগ্রহণ সম্পর্কিত একটা ধারা রয়েছে। যেমন সরকারের অনুমতি ব্যতীত কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্য কোনো ব্যাংক অধিগ্রহণ করতে পারবে না। আইনের এ অসংগতিকে আমি বলব সুশাসনের অন্তরায়। আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রয়েছে। বিশ্বের খুব কম দেশেই এ ধরনের ব্যবস্থা আছে। এখানে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিদ্যমান। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে অনেক সময় উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শও নেয়া হয় না। কিন্তু কোনো সমস্যা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঁধে দায় চাপানো হয়। জনগণ মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপারগতার কারণে ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু এর নেপথ্যে যে কারণগুলো রয়েছে তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। এ বিষয়গুলো কিন্তু আইনের বাইরে। তাই শুধু আইনের সংস্কার দিয়ে হবে না, এখানে যেমন প্রশাসনিক সংস্কারের ব্যাপার আছে, তেমনি সরকারের সদিচ্ছার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। 

এবার আইনের সংশোধন প্রসঙ্গে আসি। সংশোধনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ। এরপর দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধার শিরোনামে আলাদা অধ্যায় যোগ করা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত ও চূড়ান্ত করার জন্য ব্যাংকের কমিটি তৈরির কথা বলা হয়েছে। বিষয়গুলো ইতিবাচক। তবে এখানে একটা দুর্বলতা বিদ্যমান। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সেখানে বাস্তব প্রয়োগে সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, আমরা কীভাবে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণকে সংজ্ঞায়িত করব? যেমন কেউ ব্যবসা করছেন, তার শেয়ারের দাম বেড়ে গেছে, তার লাভ হচ্ছে কিন্তু তিনি ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের অর্থ ফেরত দিচ্ছেন না। আবার কোনো ব্যবসায়ী হয়তো ব্যবসায় লোকসান করছেন। কেউ হয়তো একটি এলসি খুলেছেন কিন্তু টাকা-পয়সা দিতে পারছেন না কিংবা তার অন্য ঋণ আছে, সেগুলোও তিনি দিতে পারছেন না। তবে শিল্পে লাভ করছেন। এক্ষেত্রে তাকে ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকাভুক্ত করা সমীচীন হবে না।

বলা হয়েছে, ঋণখেলাপি হলে সুযোগ-সুবিধা পাবে না, বিদেশে যেতে পারবে না। তার মানে খেলাপি ঋণের তালিকা অন্যদের কাছে পাঠানো হবে। কে এই পাঠানোর দায়িত্বটা নেবে? এমনিতেই ব্যাংকগুলো নিজেদের খেলাপি ঋণের টাকা আদায়ের জন্য তালিকা ঠিকমতো মেইনটেন করে না সেখানে এমন তালিকা সবখানে পাঠানোর বিষয়টি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। আর তালিকা দিয়ে কি করবে? কারণ এখন পর্যন্ত তালিকা তৈরি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু করছে না। বিএফআইইউ অনেক কিছু জানে কিন্তু কিছু করছে না। 

আইএমএফ এর চাপে কোনো পরিবর্তন না করে বাংলাদেশের অথনীতির জন্যই ব্যাংক খাতে সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংক খাতে চারটি জিনিসের প্রতি নজর দিতে হবে। একটি তো অবশ্যই আইনি সীমাবদ্ধ কাটিয়ে উঠতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদকে ব্যাংক পরিচালনায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংক খাতকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক এবং গোষ্ঠীর প্রভাব মুক্ত করতে হবে। 

আমাদের ব্যাংক কোম্পানি আইনে যে বিষয়টিতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা হলো, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। এটিকে আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এ-জাতীয় সমস্যা সমাধানে দক্ষ, সৎ ও শুভবুদ্ধির মানুষগুলোকে নিয়ে ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক একটি প্যানেল করা যেতে পারে। সেখান থেকেই বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। কমিটির সবাইকে যে অর্থনীতিবিদ হতে হবে তা নয়। ওই প্যানেল থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালকদের নাম বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অনুমোদন দেবে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিএফও, সিইও এবং তার থেকে এক স্তরের অধস্তন কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নেয়ার বিধান করা এখন সময়ের দাবি।

সদ্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইনে বলা আছে, ব্যাংক পরিচালকরা নিজস্ব ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন না। একই সঙ্গে তারা অন্য ব্যাংকের পরিচালকও হতে পারবেন না, যা গুরুত্বপূর্ণ। বিধান করা উচিত কোনো ব্যাংকের পরিচালক কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা বীমা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করব বিষয়টি ভেবে দেখতে।

পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার অতীত কাজের রেকর্ড ও অভিজ্ঞতাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে সব ব্যাংককেই নিরপেক্ষ, বিজ্ঞ ও দক্ষ লোকের নিয়োগ দেয়া উচিত। ব্যাংকের নীতিনির্ধারক কর্তৃপক্ষের বন্ধুত্ব বা আত্মীয়তার পরিচয়ে কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া সঠিক নয়। অন্ততপক্ষে সম্ভব হলে পরিচালনা পর্ষদে এক-তৃতীয়াংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখা বাঞ্ছনীয়। 

ব্যাংক পরিচালনায় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন ট্রেড বডিস ও স্টেকহোল্ডারদের প্রভাবটা কী হবে, সে সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার। যেমন অনেক ক্ষেত্রে সুদ হার, ঋণের হার ইত্যাদি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত চেয়ারম্যান বা পরিচালকরা জোট করে ঠিক করেন। অসুবিধা হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো বিভাজিত। তারা নিজ বলয়ে নিজ নিজ গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করে। কিন্তু তাদের যখন নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া হয় তখন সব ব্যাংক আবার এক হয়ে বাধা দেয়। ব্যাংকগুলো মিলে সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে। এটি পৃথিবীর কোনো দেশে হয় না।

সুশাসন খুব শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এটি শুধু আইন প্রণয়ন বা তার সংস্কার করে প্রতিষ্ঠিত হবে না। এটি চর্চার বিষয়। আর কাজটি বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে করতে হবে যেমন বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক করছে। রেগুলেশন ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এদিকে আইন করা হবে আর অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের নানা সুবিধা দেয়া হবে, তাহলে সেটি হবে সাংঘর্ষিক। আইন কাগুজে থেকে যাবে বাস্তবে তার ফল হবে খারাপ। আইনি সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বটে, তার পাশাপাশি তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণও জরুরি। আমাদের এখানে ঘটনা ঘটার পর সবার টনক নড়ে। তদন্তের নামে দীর্ঘ সময় পার করা হয়। ফলে ঘটনার কোনো বিচার হয় না। এতে অপরাধীরা আরো উৎসাহিত হয়। যেকোনো অনিয়ম ঘটলে দ্রুতই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সেটি প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। আমাদের এখানে উল্টোটি ঘটে। একই ধরনের অপরাধ বছরের পর বছর হয়ে যাচ্ছে সেটি বন্ধের উদ্যোগই নেয়া হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন ধরনের সুযোগ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে, যা বন্ধ করতে হবে। ভালোভাবে তদন্ত করা না হলে মানুষ আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করবেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আর্থিক অপরাধের ব্যাপারে আরো সতর্ক হতে হবে। 

অ্যাডহক ভিত্তিতে কোনো সংস্কার সুফল বয়ে আনে না। বাংলাদেশের ব্যাংক কোম্পানি আইনটি পুরনো হয়ে গেছে। বর্তমান যুগের জন্য সেটি অনেকটাই মানানসই নাও হতে পারে। তাই ব্যাংক কোম্পানি আইনের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। দরকার হলে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনপূর্বক নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। আইন প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাটিকেও স্বাধীন ও ক্ষমতায়িত করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক একই সঙ্গে দুটো সংস্থা থাকলে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। 

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

আরও