কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরেও মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার। দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশ। এ দেশকে তাই তাচ্ছিল্য করা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে। তবে সেই তকমা ছুড়ে ফেলে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন সর্বজনস্বীকৃত। মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে দেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, দেশে শ্রমিক রয়েছে ৬ কোটি ৩৫ লাখ, যারা কাজ করেন বিভিন্ন খাতে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৩২ লাখ নারী। ৮০ ভাগেরও বেশি রফতানি আয়ে রয়েছে যাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) ভূমিকা রাখছে ১৪ ভাগের বেশি। অথচ প্রতি ১০ নারী শ্রমিকের আটজনই ভোগেন রক্তস্বল্পতায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল অ্যাল্যায়েন্স ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশনের (জিএআইএন) এক গবেষণায় এ ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা ও ময়মনসিংহের চারটি তৈরি পোশাক কারখানার ওপর গবেষণাটি চালিয়েছিল সংস্থাটি।
জিএআইএনের
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্তস্বল্পতার কারণে নারী শ্রমিকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এতে করে উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও দেখা দেয় ঘাটতি। গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশের বেশির ভাগ নারী শ্রমিকের বয়স ২৩ থেকে ৩২ বছরের মধ্যে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই বিবাহিত। অভিজ্ঞতা বিনিময় করে শ্রমিকরা গবেষক দলটিকে জানান, তাদের কারখানার বাইরে নাশতা খেতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। কেউ যদি কর্তৃপক্ষের কাছে বাইরে যাওয়ার জন্য অনুমতি চায়, তখন বলা হয় প্রচুর কাজ পড়ে আছে, কেন বাইরে যাবে?
বেসরকারি
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গত ১৭ ডিসেম্বর ‘সংকটে অর্থনীতি, কর্মপরিকল্পনা কী হতে পারে?’ শীর্ষক
এক সংলাপের আয়োজন করে। তাতে উপস্থাপন করা মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে ঢাকা শহরে চার সদস্যের একটি পরিবারের মাছ, মাংসসহ স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে মাসে ২৩ হাজার ৬৭৬ টাকা প্রয়োজন। তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিলে এ প্রয়োজন দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৫৭ টাকায়। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের যে আয় তা দিয়ে খাদ্যপণ্য কিনে টিকে থাকা কঠিন। আর বেশির ভাগ শিল্পের কর্মীদের পক্ষে কেবল বেতনের অর্থ দিয়ে পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব না। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে ২০টি শিল্পের কর্মকর্তা ও শ্রমিকের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, সব শিল্পের কর্মীদেরই চার সদস্যের পরিবারের জন্য রেগুলার ডায়েট বা মাছ ও মাংসসহ খাবারের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা নেই। মাছ-মাংস বাদ দিয়ে কম্প্রোমাইজড ডায়েটের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা আছে কেবল আটটি শিল্পের কর্মকর্তাদের এবং ছয়টি শিল্পের শ্রমিকদের। অথচ প্রতি বছরই তাদের ৫ শতাংশ হারে বেতন বেড়েছে। সিপিডি বলছে, বেশির ভাগ শিল্পের কর্মীদের পক্ষেই পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে পণ্যের দাম বাড়ছে, তার চেয়েও বেশি হারে বাড়ছে দেশের স্থানীয় বাজারে। বিশেষ করে চাল, আটা, চিনি, ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও স্থানীয় বাজারে সেই প্রভাব নেই। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত পণ্যের দামও কারণ ছাড়া ঊর্ধ্বমুখী। লাগামহীন এ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকেই খাদ্য ব্যয় কমিয়ে আনতে খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন আমিষ। এজন্য ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো উচিত।
কুড়িগ্রামের
চরাঞ্চল থেকে আসা শিউলি খাতুন রাজধানীর বাড্ডার একটি পোশাক কারখানায় অপারেটরের কাজ করেন। তার সঙ্গে একদিন কথা হলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, মাত্র ৮ হাজার ২০০ টাকা বেতন পাই। দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্বামী নিয়ে আমার পরিবার। স্বামীর রোজগারের টাকা চলে যায় বাসা ভাড়ায়। আর আমার আয় দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাই। ছেলেদেরও লেখাপড়া শেখাচ্ছি। ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে ঠিকমতো ডাল-ভাতের ব্যবস্থাও হয় না। অসুখ-বিসুখ হলে টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারি না। মাছ-মাংস খাওয়া তো আমাদের কাছে দিবাস্বপ্ন।
শ্রমিক
নেতাদেরও দাবি, পোশাক শ্রমিকরা এখন যে মজুরি পায়, তা দিয়ে তারা এবং সন্তানেরা পুষ্টিকর খাবার খেতে পারে না। তাই নারী শ্রমিকদের রক্তশূন্যতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। শুধু এ সমস্যাই নয়, তারা আরো মারাত্মক সব রোগে ভোগেন—কিডনি, শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্মা ইত্যাদি। এমনকি অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেক নারী সন্তানধারণের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। পাশাপাশি ৪০-৪৫ বছর বয়স্ক পোশাক শ্রমিকের পক্ষে আর কাজ করার শক্তি থাকে না। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই আমরা একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। তাতে কিছুটা হলেও সমস্যাগুলো লাগব হতো।
পোশাক
কারখানার মালিকরা অবশ্য বারবারই দোষ চাপান নারী শ্রমিকদের ওপর। তারা দাবি করেন, এসব নারী গ্রাম থেকে আসায় তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করা যাচ্ছে না। একসময় পোশাককর্মীদের দুপুরের খাবার দেয়া হতো কারখানায়। কিন্তু তারা খাবার না খেয়ে টাকা নিতে চায়। অথচ সে টাকায় তারা কোনো খাবারই খায় না। ফলে তাদের জীবনযাপনের পদ্ধতি ও খাদ্যাভ্যাসের কারণেই এসব স্বাস্থ্যগত সমস্যা।
চিকিৎসকরা
অবশ্য বলে থাকেন শুধু দামি খাবারই পুষ্টিকর, এমন ধারণা ভুল। বলা হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যের কথা। একজন শ্রমিক প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না খেয়ে এতে পরিবর্তন আনতে পারেন। যেমন একদিন লালশাক খেলে আরেকদিন খাবেন পুঁইশাক। এতে খাবারে যেমন বৈচিত্র্য আসবে তেমনি দূর হবে পুষ্টির অভাবও। বাজারে বিভিন্ন ধরনের ছোট মাছ পাওয়া যায়। একেক দিন একেক রকম ছোট মাছেও শ্রমিকের পুষ্টির অভাব পূরণ হতে পারে।
এদিকে
মূল্যস্ফীতি যোগ করলে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে সব ধরনের পুষ্টিকর খাবারের দাম। ফলে এগুলো দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। এ কারণে দরিদ্ররা ভাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। একসময় দেশে পুষ্টির প্রধান উৎস ছিল মাছ। সেই খাবার তো এখন মধ্যবিত্তেরই ধরাছোঁয়ার বাইরে। সবজি, দুধ থেকে শুরু করে সব ধরনের পুষ্টিকর খাবারের দামও উল্লেখযোগ্য বেড়েছে। দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়ায় আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রেখে পুরো পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেককেই হিমশিম খেতে হয়। আর পরিবারের ব্যয় সংকোচনের ক্ষেত্রে সেই চিরচেনা ভূমিকাতে বরাবরই অবতীর্ণ হন নারী। নানা ব্যয়ভার মেটাতে তারা সমঝোতা করেন নিজের পুষ্টির চাহিদা কিংবা সাধ-আহ্লাদের সঙ্গে।
নিজের
ও পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এ দেশের বেশির ভাগ পোশাক শ্রমিকই দৈনিক ১২ ঘণ্টা শ্রম দেন। তবে এ শিল্পে দিন দিনই কমে যাচ্ছে নারীর সংখ্যা। আগে যেখানে ৮০ শতাংশই নারীকর্মী ছিল, এখন তা কমে হয়েছে ৪৬ দশমিক ১৮ শতাংশ (বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী)। মূলত প্রযুক্তি ও দক্ষতায় ঘাটতি, পুরুষ শ্রমিক বেড়ে যাওয়া, অপুষ্টি আর নানা ধরনের নির্যাতনের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জীবনে মজুরিবৈষম্যসহ নানা ধরনের বঞ্চনা, দুর্দশার গল্প। নারী শ্রমিকের বৈষম্য ও বঞ্চনাটা অবশ্য অপেক্ষাকৃত বেশি। মজুরিবৈষম্য ছাড়াও তারা কারখানার ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। আবার অধিকাংশ নারী শ্রমিকই নিয়োগপত্র পান না, ফলে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তবু বাংলাদেশের নারী পোশাক শ্রমিকরা থেমে নেই। নিত্যদিনের পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতাসহ শারীরিক নানা ধরনের রোগব্যাধি; সঙ্গে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতনকে মাড়িয়েই তারা শ্রম দিয়ে চলেছেন। নিজেরাই হয়তো জানেন না তাদের কাঁধেই সওয়ার হয়েছে দেশের অর্থনীতি। তাদের ঝরা ঘামেই গত অর্থবছরেও ৪ হাজার ৪১৩ কোটি ৩১ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক পণ্য রফতানি করেছে দেশ, যা মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ। তবে এদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই।
ওবায়দুল্লাহ সনি: সাংবাদিক