বিশ্লেষণ

বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির আঘাত

মহামারী-পরবর্তী অর্থনীতির উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বৈষয়িক প্রথা এবং চাপের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত হয়। যার বেশির ভাগই মূলত সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিচালিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষণস্থায়ী বিষয়গুলোও রয়েছে যেমন সরবরাহ খাতের বাধা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো এবং চীনের শূন্য কভিড নীতি এসব সম্ভাব্য কিছু ক্ষেত্রে হ্রাস করতে পারে। কিন্তু বৈষয়িক প্রথাগুলো অনেক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক

মহামারী-পরবর্তী অর্থনীতির উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বৈষয়িক প্রথা এবং চাপের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত হয়। যার বেশির ভাগই মূলত সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিচালিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষণস্থায়ী বিষয়গুলোও রয়েছে যেমন সরবরাহ খাতের বাধা প্রতিবন্ধকতাগুলো এবং চীনের শূন্য কভিড নীতি এসব সম্ভাব্য কিছু ক্ষেত্রে হ্রাস করতে পারে। কিন্তু বৈষয়িক প্রথাগুলো অনেক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাজারে নতুন ভারসাম্য আনায় নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক।

আমরা তৈরি পণ্য এবং মধ্যবর্তী পণ্যগুলোর (বিশ্ব অর্থনীতির ব্যবসাযোগ্য অংশের যথেষ্ট ভাগ) ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংকুচিত শর্তগুলো থেকে উঠে আসতে পারছি, যা আগে অব্যবহূত, স্বল্পমূল্যের এবং উৎপাদনশীল সক্ষমতায় উদীয়মান অর্থনীতির ব্যাপক অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়েছে। এক্ষেত্রে চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে সরবরাহ এবং মূল্যবৃদ্ধির সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সাড়া পাওয়া যেতে পারে। কেননা গত কয়েক দশকে সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির জন্য এমনভাবে চাপ প্রয়োগ করেছে যেন তা অনুমোদন পায়।

কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান অব্যবহূত উৎপাদনশীল সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং লক্ষাধিক ভোক্তা মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে উন্নীত হওয়ায় বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উন্নত অর্থনীতিতে শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। এটির প্রমাণ পাওয়া খুব বেশি কঠিন নয়। দেখা যাচ্ছে, শ্রমিক ইউনিয়নকে সংঘবদ্ধ করা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অধিক মাত্রায় তারা সফল হচ্ছে। মালিক পক্ষ এটিকে একপাশে রেখে বর্তমান আগামী দিনের শ্রমিকদের হাইব্রিড কাজকে পছন্দ করাকে কঠিন হিসেবেই দেখছে।

এদিকে বিশ্বে বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া জনসংখ্যার একটি দিক রয়েছে। জনগণ দিনে দিনে বয়স্ক হচ্ছে, এদের মধ্যে কেউ দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে, বৈশ্বিক জিডিপিতে ৭৫ শতাংশ এর বেশি অবদান রাখা দেশগুলোয় এমনটি হচ্ছে। উপরন্তু দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় ধরনের প্রথা শ্রমশক্তি সরবরাহকে কমিয়ে দিচ্ছে এবং নির্ভরযোগ্যতার হারকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে চাহিদার ক্ষেত্রে কোনো কাটছাঁট করা হচ্ছে না। কিন্তু এসবসহ অন্য বিষয়গুলো বেতন এবং শ্রমের মূল্য বাড়ানোর চাপ বৃদ্ধিতে প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

এসব খাত মহামারীর সময় স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তা এবং উদ্বেগের সম্মুখীন হয়েছিল, যা যেকোনো অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যবসার উপযোগী নয় এমন খাত হিসেবে প্রচুর কর্মসংস্থানের উৎস ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কোটি এবং শিক্ষা খাতে কোটি ৪০ লাখ চাকরি রয়েছে। যেখানে স্বাস্থ্য সরকারের কাছে দ্বিতীয় কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। কিন্তু অনাকর্ষণীয় কাজের পরিবেশ এবং মহামারীর পর কম ক্ষতিপূরণ কর্মী স্বল্পতার সৃষ্টি করছে। যদিও নতুন বাজার কাঠামোর ভারসাম্য এখনো প্রকাশ পায়নি। কিন্তু যখন এটি হবে, তখন অবশ্যই এসব খাতে কাজ করা জনশক্তির বেতন নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি করবে এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

বর্তমানে বড় পরিসরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘন ঘন জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী, যুদ্ধ, সরবরাহ খাতে প্রতিবন্ধকতা, ভূ-রাজনৈতিক দুশ্চিন্তা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতিতে সরবরাহ লাইনে বহুমাত্রিকতার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন থাকায় নতুন অর্থনৈতিক নীতি প্রবলভাবে প্রথাকে শক্তিশালী করছে। যে দিনগুলো অতিবাহিত হয়েছে তাতে এসব শৃঙ্খল সম্পূর্ণরূপে মূল্য এবং স্বল্পমেয়াদি কার্যকারিতা এবং তুলনামূলক সুবিধার ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন বহুমাত্রিক সরবরাহ চেইন অত্যধিক স্থিতিস্থাপক হলেও অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে।

ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ বিশেষ করে প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সরকারগুলো এখন বন্ধুভাবাপন্ন জায়গা থেকে সরে এসে শুল্ক, ভর্তুকি অথবা সরাসরি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কৌশলী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পক্ষে। নিজ দেশগুলোর ব্যবসার প্যাটার্নকে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং অধিক নির্ভরযোগ্য সহযোগীদের কাছে স্থানান্তর এটির উদ্দেশ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে খণ্ডভাবে ব্যবসা আর্থিক সংস্থানের উঠতি ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অথবা সংঘাতে সম্ভাব্য ভাঙনের উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে।  

এসব নীতির নিরাপত্তাজনিত কার্যকারিতা নিয়ে যে কেউ বিতর্ক করতে পারে। তারা স্পষ্টভাবে মূল্যস্ফীতির পক্ষে, যেটি তাদের সাপ্লাই চেইনকে সর্বনিম্ন মূল্যের সূত্র থেকে সরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যা চরমভাবে বন্ধু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তীরে ভেড়ার প্রক্রিয়া। যে নীতিকে এক্ষেত্রে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে তা কেবল যে খাতগুলোয় চরম অর্থনৈতিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার দুর্বলতাকে প্রদর্শন করা হচ্ছে এমন ক্ষেত্রেই ন্যায়সংগত হবে।   

উদাহরণ হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিচালনা করায় ইউরোপ প্রাসঙ্গিকভাবে রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা শেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দ্রুত বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে। প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে দেবে, যতক্ষণ না নবায়নযোগ্য বিদ্যুত্শক্তি বর্তমান সময় থেকে আগামী কয়েক দশকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে এবং এটি পরবর্তী কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ বয়ে আনবে।

যেমন ডলার শক্তিশালী হওয়ায় পণ্যসামগ্রীর মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ডলারের মাধ্যমে আমদানি করা খাদ্য এবং জ্বালানি তেলের মূল্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির পরিবর্তিত ঢেউয়ে দেশগুলোয় বৃহৎ আকারে প্রকাশ পেয়েছে। প্রভাব বিশেষ করে নিম্ন আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শক্তিশালী হয়েছে, যেখানে খাদ্য এবং বিদ্যুতের সমষ্টিগত চাহিদা বসবাসের খরচে পারস্পরিক ব্যাপক চাহিদা মোকাবেলা করতে হয়। এরই মধ্যে দেশগুলো খাদ্য, বিদ্যুৎ এবং ক্রয়ক্ষমতার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক জরিপে প্রমাণ হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিগুলো অনেক বেশি ঘনীভূত হচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে ইউরোপের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ইস্যুর ভিত্তিতে যে কেউ বিতর্ক করতে পারে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিলিপন প্রতিযোগিতাপূর্ণ নীতির ব্যর্থতাকে অনেকাংশে দোষারোপ করেছেন। কিন্তু এখানে সামান্য দ্বিধা রয়েছে যে মূল্যস্ফীতি বাজারের মনোযোগকে বড় সমস্যায় পরিণত করতে পারে কিনা। অর্থনৈতিক তত্ত্ব আমাদের বলে প্রবল প্রতিযোগিতাসম্পন্ন বাজারে মূল্যস্ফীতি উৎপাদনশীলতা অর্জন করার দিকেই ধাবিত করে। কিন্তু প্রণোদনা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারণে অকার্যকর হয়ে থাকে, যেখানে তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে প্রান্তিক সীমারেখা থেকে বর্ধিত সক্ষমতাকে মূল্যবৃদ্ধির উল্লম্ফনের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করে।

চূড়ান্তভাবে মহামারীর সময় থেকে ঋণের মাত্রা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বর্ধিত আকারেই রয়ে গিয়েছে এবং বর্তমান সুদের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারি কোষাগার চুক্তিবদ্ধ থাকতে চাচ্ছে কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রবাহ আগামী তিন দশকে বার্ষিক আনুমানিক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাশা করে। যদিও আর্থিক সংস্থানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঋণ রয়েছে, যা সমষ্টিগত চাহিদার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়ে এরই মধ্যে সরবরাহকে সীমাবদ্ধ করেছে এবং বৈশ্বিক পরিবেশের ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করবে।

বৃহৎ আকারের উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্র এসব মূল্যস্ফীতির চাপের সমন্বিত প্রভাবকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলবে। এক্ষেত্রে ডিজিটাল এবং জীববিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তাদের উন্নয়ন এবং চক্রাকার কার্যক্রমে সময় লাগবে। অন্তর্বর্তী সময়ে আমরা মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমিত করতে কার্যকর স্থিতিশীল সরবরাহের ওপর দীর্ঘসময় নির্ভর করতে পারব না। কাঠামোয় সরকারের রাজকোষ এবং আর্থিক নীতিকে অবশ্যই নতুন কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্য সাযুজ্যপূর্ণ হতে হবে।

[স্বত্ব:প্রজেক্টসিন্ডিকেট]

 

মাইকেল স্পেন্স: অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী; স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর, হুভার ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং জেনারেল আটলান্টিকের সিনিয়র অ্যাডভাইজর।

ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত

 

আরও