পর্যালোচনা

কেন্দ্রীভূত ব্যাংকঋণ, বিতরণে বৈষম্য ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ঋণ দেয়া ব্যাংকের সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদ আছে। তারা নীতিমালা ঠিক করে কীভাবে ঋণ দেবে এবং কীভাবে তা আদায় করবে। তবে প্রতিটি ব্যাংককেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশিত ঋণ (ডিরেক্টেড লোন) প্রদান করা হয়। যেমন কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষিঋণ দেয়া হয়। এখন যেমন পোশাক খাতে প্রণোদনার ঋণ দেয়া হচ্ছে। এটা মূলত বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে প্রদান করা হয়।

ঋণ দেয়া ব্যাংকের সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিচালনা পর্ষদ আছে। তারা নীতিমালা ঠিক করে কীভাবে ঋণ দেবে এবং কীভাবে তা আদায় করবে। তবে প্রতিটি ব্যাংককেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশিত ঋণ (ডিরেক্টেড লোন) প্রদান করা হয়। যেমন কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষিঋণ দেয়া হয়। এখন যেমন পোশাক খাতে প্রণোদনার ঋণ দেয়া হচ্ছে। এটা মূলত বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে প্রদান করা হয়।

সাধারণত ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কতগুলো বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়। ঋণগ্রহীতার ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা (ক্রেডিট ওয়ার্দিনেস), জামানতের শর্ত পূরণ করতে পারবেন কিনা, ট্র্যাক রেকর্ড কেমন, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা কেমন, ব্যবসাটা কেমন লাভজনক, সেখান থেকে রিটার্ন আসবে কিনা, আর ভবিষ্যত্টা কেমন (আউটলুক) প্রভৃতি বিষয় দেখে ঋণ প্রদান করা হয়। আরেকটি বিষয় দেখা হয়, যে খাতের প্রতিষ্ঠান বা উদ্যাক্তাকে ঋণ দেয়া হচ্ছে, ওই খাতের অবস্থা কেমন। এভাবেই ব্যাংকগুলো সাধারণত ঋণ প্রদান করে। বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝেমধ্যে কিছু নির্দেশনা দেয়, কিছু গাইডলাইন দেয়। যেমন কভিডের সময় ঋণ প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যেমনটা দিয়ে থাকে। এর বাইরে নিজস্ব বিবেচনায় ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে থাকে।

ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কতগুলো বিধিনিষেধ রয়েছে। একটি ব্যাংক মোট আমানতের কতটুকু ঋণ দেবে, তা নির্ধারিত। বিধান আছে, নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য ঋণ নিতে পারবেন না। সিঙ্গেল এক্সপোজার লিমিটও আছে, অর্থাৎ একটা প্রতিষ্ঠানকে কত ঋণ দেয়া যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী, ব্যাংক পরিশোধিত মূলধনের ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ঋণ দিতে পারবে। আরেকটি গাইডলাইন আছে ফান্ডেড আর নন-ফান্ডেড ঋণ প্রদানের। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের মোট মূলধনের ৩৫ শতাংশের বেশি কোনো একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া যাবে না। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ফান্ডেড আর ২০ শতাংশ নন ফান্ডেড। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যেমন রফতানিতে মোট মূলধনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়া যেতে পারে। সেখানেও ১৫ শতাংশের বেশি ফান্ডেড ঋণ দেয়া যায় না। নন ফান্ডেড  হলো ব্যাংকের গ্যারান্টি প্রদান। যেমন এলসি খোলা। প্রকৃত টাকা দেয়া হয় না, কিন্তু গ্যারান্টি দেয়া হয়। ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি দেয়া হয় কিংবা আমদানির বিপরীতে ট্রাস্ট রিসিপ্ট দেয়া হয়। এগুলো নন-ফান্ডেড সুবিধা, যা ব্যাংক প্রদান করে। এগুলোর ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট গাইডলাইন আছে। একটা সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়া আছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ব্যাংকই এটি যথাযথভাবে পরিপালন করছে না। কারণেই একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে অনেক ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণ অনেক বেশি। এটা হওয়ার কারণ কোনো ব্যাংক ওই প্রতিষ্ঠানকে ঋণ তো দেয়ই, অনেক সময় ওভারড্রাফট হিসেবেও ঋণ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্যিক ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা সরাসরি দিতে পারে, আবার ওভারড্রাফট হিসেবেও দিতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় বড় প্রতিষ্ঠান তৈরির ক্ষেত্রে। ধরা যাক, কোনো হাসপাতাল কিংবা কোনো স্টিল মিল করা হবে। তার জন্য ৫০০ কোটি বা হাজার কোটি টাকা দরকার। সেক্ষেত্রে একটা লিড ব্যাংক থাকে। তার সক্রিয়তায় সবকিছু ব্যবস্থা করা হয়। সে অন্য ব্যাংকগুলো বা ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে। লিড ব্যাংক খুব বেশি টাকা দেয় তা নয়, ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ৩৫-৪০ কোটি টাকা দেয়। ১০-১২টি ব্যাংক মিলে অর্থায়ন করে। এটাকে সিন্ডিকেট লোন বলা হয়। সব ব্যাংক একটি সুনির্দিষ্ট সুদহারের ব্যাপারে সম্মত হয়। এভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের ঋণ দেয়া হয়।

তবে বলে রাখা দরকার, সিন্ডিকেটেড লোনের বাইরেও অনেক টাকা চলে যাচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিপুল ঋণ নিচ্ছে, ব্যাংকও দিচ্ছে। আমাদের দেশে ব্যবসার আউটলুক, রিটার্ন ভালো কিনা তা যাচাই না করে অনেক সময় ঋণ দিয়ে দেয়া হয়। আবার অনেক সময় রিলেশনশিপ ব্যাংকিংয়ের সুবাদে পরস্পরের আলোচনার ভিত্তিতে কোনো গ্রুপকে বড় অংকের ঋণ দিয়ে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল ডিউ ডিলিজেন্স ভালোভাবে বজায় রাখা হয় না। সামর্থ্য, সক্ষমতা, কারখানা সরেজমিনে পরির্দশন করে প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি যাচাই করা হয় না। প্রথমত, এগুলো হলো বেআইনি এবং দুর্নীতির নামান্তর। কিছু ব্যাংক সত্যিই ভালো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়। কিন্তু অত্যধিক মাত্রায় দিয়ে দেয়। হয়তো দরকার ৫০ কোটি টাকা, ব্যাংক দেয় ১০০ কোটি টাকা। তখন ঋণ অন্য খাতে চলে যায়। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ঋণটা ব্যবহার হয় অনুৎপাদনশীল খাতে। বিষয় এখন বেশি ঘটছে। এটি দেখার দায়িত্ব ব্যাংক পরিচালকদের। তারা সেটি দেখছেন না।

বর্তমানে ব্যাংক পরিচালকরা তাদের স্বার্থটা আগে দেখেন। পরিচালকদের আরেকটা প্রবণতা খুবই খারাপ আর তা হলো, তারা অনেক সময় মাইক্রো ম্যানেজমেন্টে হস্তক্ষেপ করেন। পরিচালকরা মাইক্রো ম্যানেজমেন্টে গেলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রভাবিত হয়ে যান। তারা অনেক সময় অনুরোধ শোনেন বা শুনতে বাধ্য হন। এটা সুশাসনের ঘাটতি বলা চলে। সুশাসনের অভাবটা বাংলাদেশে বেশি। এখানে পরিচালকদের হস্তক্ষেপ আছে, তার বাইরে আমলা রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তার মানে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে সব কাজ করতে পারে না। আবার এক্ষেত্রে অনেকের কমফোর্ট জোনও রয়েছে। অনেক সময় কিছু ব্যবস্থাপনা পরিচালক চেয়ারম্যানের সঙ্গে খাতির বাড়ায় নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য। এটা ব্যাংকের স্বার্থ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। এমন প্রবণতা পরিহার করা জরুরি।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকে কতগুলো ম্যানেজমেন্ট নর্মস আছে, আর কতগুলো ফাইন্যান্সিয়াল/ প্রুডেনশিয়াল নর্মস আছে। দুটো মিলে যে নিয়ম-নীতিগুলো আছে তার পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি বিষয় লক্ষ রাখা দরকার, ব্যাংক কোম্পানি আইন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক ক্ষমতা আছে। আবার যৌথ মূলধন কোম্পানিরও কিছু আইন আছে। সব মিলিয়ে অনেক নিয়ম-নীতি বিদ্যমান। তার মধ্যে আবার ব্যাসেল-, ব্যাসেল-, ব্যাসেল--এর মতো আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যান্ডার্ড আছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে নিয়ম-নীতিগুলো আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু সেগুলোর কমপ্লায়েন্স অত্যন্ত দুর্বল। যেমন নতুন ব্যাংকগুলোর অনুমোদন। সেগুলো অনেকটা রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনেক রফতানিকারক-আমদানিকারক বলছেন, এসব ব্যাংকে আমরা লেনদেন করব না। কারণ অনেক ব্যাংকই এলসি খুলতে পারে না। তার মানে ব্যাসেল--এর অধীনে তাদের কমপ্লায়েন্স, ক্যাপিটাল অ্যাডুকোয়েসি প্রভৃতি শর্ত পূরণ করতে পারছে না।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, ব্যাংকগুলো ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদানে যতটা আগ্রহী, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদানে ততটা আগ্রহী নয়। এমনকি তাদের সক্ষমতা থাকলেও তারা আঞ্চলিক পর্যায়ে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে চান না। প্রবণতা থেকে ব্যাংককে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের অঞ্চলনির্বিশেষে কুটির, ক্ষুদ্র, মাঝারি উদ্যোগ বা উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করতে হবে। সবই বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হবে তা নয়, কিছু ছোট উদ্যোগও থাকতে হবে। বাংলাদেশে সম্ভাবনা অনুপাতে এসএমই খাতের অবদান এখনো অনেক কম। মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া এসএমই খাতের ক্ল্যাসিক উদাহরণ। সেখানে খাতটির অবদান অনেক বেশি। এর কারণ অর্থায়ন। আমাদের এসএমই খাতে অর্থায়ন একেবারে কম। এদের অর্থায়ন করলে ঋণের ক্ষেত্রে বড় প্রতিষ্ঠান বা অঞ্চলভিত্তিক কেন্দ্রীভূত ব্যাংক ঋণ বিতরণের হার অনেকটাই কমে আসবে। এজন্য পিকেএসএফ, বেসরকারি সংস্থা, এমএফআইগুলো, ছোট ছোট চেম্বার এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের সহাযোগিতা নেয়া প্রয়োজন।

দেখা যাচ্ছে, অনেক ঋণের বিপরীতে জামানত যথাযথভাবে থাকে না এবং জামানত বিষয়ে মূল্যায়ন/প্রাক্কলন খুবই খারাপ। ধরা যাক, একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক পাঁচ ভাই। অথচ একজনের নামে জামানত রেখে তাকেই ঋণ দেয়া হচ্ছে। ব্যাংক যখনই অর্থঋণ আদালতে মামলা দিতে গেছে বা নিলাম ডাকা হয়েছে, তখনই বলা হচ্ছে এটা করা যাবে না। কারণ এর মালিক পাঁচজন। অনেক সময় একজন ভাড়াটে জমির মালিক দেখিয়ে ঋণ নিয়ে নেন। রকম অনেক ঘটনা ঘটেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কাজেই ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে জামানতটা ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। জামানতবিহীন ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, সুনাম, মূলধন, উৎপাদন, আয়, ব্যয়, কমপ্লায়েন্স প্রভৃতি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অনেক ব্যাংক সম্পদ বা সম্পত্তিকেন্দ্রিক জামানত থেকে বেরিয়ে এসেছে। বর্তমানে তারা কোম্পানির ক্লাশ ফ্লো দেখছে। এটা ভালো, বিশেষ করে এসএমইগুলোর স্থিতিপত্রে সম্পদ দায় দেখলে খুব একটা লাভ হবে না। দেখতে হবে তাদের ক্যাশ ফ্লো। গতানুগতিক জামানত প্রথা থেকে বেরিয়ে এলে আমাদের জন্য ভালো। আরেকটি বিষয় বাংলাদেশে দুঃখজনকভাবে হয়নি, সেটি হলো সিকিউরিটাইজেশন।  শিল্প-কারখানার ক্ষেত্রে ফ্যাক্টরিং করা হয়নি। শ্রীলংকা বা চীনে অনেক কারখানা ফ্যাক্টরিংয়ের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনও আছে, তার পরও ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্টরিং ডমিস্টিক ফ্যাক্টরিং তেমন করা হয় না। সিকিউরিটাইজেশন, ফ্যাক্টরিং প্রভৃতি কৌশল শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা অবলম্বন করতে পারেন। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকারদের বিষয়গুলো অ্যাড্রেস করার কথা বলা প্রয়োজন। দক্ষতাগুলো ব্যাংকারদের গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। 

বিদ্যমান অবস্থায় ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে ঋণ পোর্টফোলিও বহুমুখীকরণ করতে হবে। পোর্টফোলিও ঝুঁকিতে থাকলে ব্যাংকের বিপদ বাড়বে। ব্যাংকের চূড়ান্তভাবে নৈতিক বিপত্তি (মরাল হ্যাজার্ড) আমানতকারীদের টাকা চলে যাওয়া। সেদিক থেকে ব্যাংক কোম্পানি অন্য কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা আলাদা। কারণ ব্যাংক অন্যের টাকা নিয়ে কাজ করে। সেগুলো আমানতকারীর আমানত। কাজেই ব্যাংকারদের স্বতন্ত্র বাধ্যবাধকতা দায়িত্বশীলতা আছে। সেটি বুঝতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে করপোরেট সুশাসনেরও অভাব রয়েছে। যেকোনো দেশে প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য পেশাদার অডিট প্রতিষ্ঠান দিয়ে ব্যাংকের অডিট করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অডিটর, ম্যানেজমেন্ট আর মালিক এক হয়ে রিপোর্ট তৈরি করে। এটা করপোরেট সুশাসনের একেবারে সাংঘর্ষিক। অডিটর কোনো দিনই ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলে অডিট করতে পারবেন না। পরিচালকদের তুষ্ট করতে তাদের মতো করে অডিট করা যাবে না। একেবারে স্বাধীন প্রভাবমুক্তভাবে অডিট করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় অডিটররা যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন না। এটা বন্ধ করতে হবে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটি হলো বাংলাদেশে শিল্প ব্যবসা-বাণিজ্যও ব্যাংকের অর্থায়নের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কোনো দেশে পুরোপুরি ব্যাংকের অর্থায়নে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে না। পুঁজিবাজার থেকে মূলধন আহরণ করে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে যেতে হবে। করপোরেট বন্ড বা শেয়ার ইস্যু করার মতো ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাংলাদেশে করপোরেট বন্ড নেই বললেই চলে। সরকারি কয়েকটা বন্ড আছে। ব্যক্তি খাতের ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানও বন্ড ইস্যু করতে চায় না। আবার শেয়ার মার্কেটেও যেতে হবে। উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে শেয়ার মার্কেট আরো সুশৃঙ্খল করতে হবে। ভালো করতে হবে। ইনসাইড তথ্য ব্যবহার করে কেউ যেন ট্রেডিংকে প্রভাবিত করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। গভর্ন্যান্সের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তবেই লোকজন শেয়ারবাজারে আসবে। বর্তমানে শেয়ারবাজার কিছুটা প্রাণবন্ত, কিন্তু বন্ড মার্কেট একেবারেই নিষ্প্রভ। আমাদের বন্ড মার্কেট ইকুইটি মার্কেটে যেতে হবে। তখন ঝুঁকিটা শুধু উদ্যোক্তার ওপর থাকবে না। পুঁজি সংগ্রহে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক অর্থায়ন নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে শেয়ার মার্কেটকে কাজে লাগানোর সময় এসেছে।

ঋণমানের ওপর ভিত্তি করে ঋণ প্রদানের একটি প্রবণতা দেশে বিরাজমান। শুধু ঋণমানের ওপর নির্ভর করে ঋণ দিলে ক্ষতির শঙ্কা থেকেই যায়। বাংলাদেশের অনেক কোম্পানির ঋণমান ভালো, কিন্তু তাদের অবস্থা ভালো নয়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এজেন্সিগুলো সাধারণত ঋণমান মূল্যায়ন করে রিপোর্ট দেয়। এতে অনেকের ঋণমান ভালো। তার বাইরে প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্র্যাক রেকর্ড, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা-সামর্থ্য এগুলোও দেখতে হবে। নইলে খেলাপি ঋণের প্লাবন ঠেকানো যাবে না।

কিছুদিন আগে সজীব গ্রুপের একটা কারখানায় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনায় ঋণ প্রদানে কমপ্লায়েন্সের বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। শুনেছি কয়েকটি ব্যাংক সেখানে অর্থায়ন করেছে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ক্রেডিট অ্যাপ্রাইজালটা গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পরিবেশগত প্রভাব, আর্থিক দুর্নীতি-দেউলিয়াত্ব, সাকসেশন প্ল্যান প্রভৃতি দেখা হয়। এগুলো ব্যাংকারদের দেখার কথা। এগুলো দেখলে কারখানার কর্মপরিবেশ ভালো হতো। কমপ্লায়েন্স ঠিকমতো পরিপালন করা হতো।  কাজেই ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এখন বিষয়গুলোও দেখা জরুরি।

ব্যাংকিং খাতে গভর্ন্যান্স রিফর্ম করতে হবে, একই পরিবার থেকে পর্ষদ সদস্য সংখ্যা মেয়াদ যে বাড়ানো হয়েছে, তা কমাতে হবে। তিন বছরের স্থলে ছয় বছর এখন নয় বছর করা হয়েছে। অনেক সময় চেয়ারম্যানরা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর রয়ে যাচ্ছেন, এখানে পরিবর্তন আনতে হবে। অন্য পরিচালকদেরও সুযোগ দিতে হবে। বছরের পর বছর একজন চেয়ারম্যান থাকবেন, সেটি ভালো নয়। এটা করপোরেট গভর্ন্যান্সের পরিপন্থী। গভর্ন্যান্স আর ব্যবস্থাপনা আলাদা রাখতে হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিকদের সঙ্গে দহরম-মহরম করে টিকে থাকবে, তা কাম্য নয়। পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সামগ্রিকভাবে ভারসাম্য আনা প্রয়োজন।

 

. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

আরও