ঢাকাকে সচল রাখতে গণপরিবহনকে শৃঙ্খলিত কাঠামোয় আনার বিকল্প নেই

অতীতের উদ্যোগগুলো কেন টেকসই হয়নি, তা মূল্যায়ন করা জরুরি। তবে বর্তমান উদ্যোগে পরিবহন খাতের নেতৃত্বের মধ্যে কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

ড. মো. হাদিউজ্জামান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ অধ্যাপক। বুয়েট থেকে পুরকৌশলে বিএসসি ও এমএসসি সম্পন্ন করে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়ন ও নানা সংকট নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা করেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এসএম সোহান

ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর পর মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে; মানুষ নিয়ম মানছে। এ প্রকল্পের শুরু থেকে যুক্ত থেকে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন?

অতীতে কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন উদ্যোগটি নিয়ে মানুষের সংশয় ছিল। আমরা সেই সংশয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পরামর্শক এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেছে। ট্রাফিক পুলিশের সহযোগিতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হলো, চালক ও পথচারীদের একটি বড় অংশ এখন সিগন্যাল মেনে চলছেন। আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া; এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে ঢাকায় যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা আশাব্যঞ্জক।

প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জংশনে সিগন্যাল স্থাপন করা হয়েছে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরো ৫০টি সিগন্যাল নিয়ে কাজ চলছে। ভবিষ্যতে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সময় পরিবর্তন করতে সক্ষম অ্যাডাপটিভ সিগন্যালিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে সিগন্যাল ব্যবস্থা তৈরি হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত সহজ হবে। একই বিনিয়োগে বিদেশী প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি জংশনে ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দেশের জন্য ইতিবাচক।

সিগন্যাল ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ইউটার্ন চালু করায় যানজট কমাতে কতটা সুবিধা হয়েছে? বিশেষ করে বিজয় সরণির মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এর প্রভাব কেমন?

ইউটার্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল। উপযুক্ত নকশায় ডানদিকে মোড় নেয়ার পরিবর্তে ইউটার্ন ব্যবহার করা গেলে চার ফেজের পরিবর্তে দুই ফেজে সিগন্যাল পরিচালনা সম্ভব হতে পারে। এতে অপেক্ষার সময় ও সিগন্যালের লস টাইম কমে।

বিজয় সরণির মতো গুরুত্বপূর্ণ জংশনে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। আগে কোনো কোনো সময়ে এ এলাকা পার হতে ৩০-৪০ মিনিট লাগত, এখন ১০-১৫ মিনিটে পার হওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সময়ের এ পার্থক্য যানবাহনের চাপের ওপর নির্ভরশীল। কাউন্টডাউন টাইমারও চালকদের মানসিক স্বস্তি দিচ্ছে। তারা জানতে পারছেন কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। অনেক জায়গায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার ক্যামেরা না থাকলেও চালকদের সিগন্যালে থামতে দেখা যাচ্ছে। তবে সিগন্যালের পূর্ণ সুফল পেতে বাস রুট পুনর্বিন্যাস, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা এবং ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে সমাধান করতে হবে।

ঢাকায় বাস রুট রেশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর আলোচনা দীর্ঘদিনের। নতুন করে আবার কাজ শুরু হলো—এবার সফলতার সম্ভাবনা কতটা দেখছেন?

অতীতের উদ্যোগগুলো কেন টেকসই হয়নি, তা মূল্যায়ন করা জরুরি। তবে বর্তমান উদ্যোগে পরিবহন খাতের নেতৃত্বের মধ্যে কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ঢাকাকে সচল রাখতে গণপরিবহনকে শৃঙ্খলিত কাঠামোয় আনার বিকল্প নেই। শুধু একটি রুটে একটি কোম্পানিকে দায়িত্ব দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিনিয়োগকারীদের জন্য টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে হবে। রুট নির্ধারণ, যাত্রী চাহিদা মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং সেবার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। গণপরিবহন শুধু ব্যবসা নয়, জনসেবারও অংশ। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তুকির বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। ঢাকার যানজটে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। সঠিক ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করতে পারলে কোম্পানিভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু হলে একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস চলাচল করবে, তারা কোনো কারণে বাস বন্ধ করে দিলে যাত্রীরা সমস্যায় পড়বেন। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় কী ব্যবস্থা থাকা উচিত?

কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়ার আগে তার আর্থিক ও পরিচালনাগত সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। চুক্তিতে সেবার মানদণ্ড, জবাবদিহি এবং নির্ধারিত সেবা দিতে ব্যর্থ হলে করণীয় স্পষ্ট থাকতে হবে। কোনো কোম্পানি সেবা বন্ধ করলে বিকল্প অপারেটরের মাধ্যমে কীভাবে বাস চলাচল সচল রাখা হবে, সেটিও আগেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন বাস, রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে যেন পুরো রুটের যাত্রীরা জিম্মি না হন, সেজন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ট্রাফিক সিগন্যাল, ক্যামেরা, ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি প্রযুক্তির সমন্বয় কীভাবে যানবাহন ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে?

অ্যাডাপটিভ সিগন্যালিং চালু করতে প্রতিটি জংশনে যানবাহনের সংখ্যা, গতি ও চলাচলের প্রবাহ রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ক্যামেরা ও সফটওয়্যারভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করে অ্যালগরিদমের সাহায্যে সিগন্যালের সময় সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যামেরার সাহায্যে স্টপলাইন অতিক্রম, নির্ধারিত দিক অমান্য করে চলাচল এবং বিপরীত দিক থেকে যানবাহন প্রবেশের মতো আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে ট্রাফিক পুলিশের আইন প্রয়োগ আরো কার্যকর হতে পারে।

আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন ব্যবস্থা সমন্বিত করা গেলে সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজায় দীর্ঘ সারি কমানো সম্ভব। ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রবেশমুখেও টোল আদায়ের কারণে যানজট তৈরি হয়। প্রযুক্তিটির কার্যকর ব্যবহার টোল আদায়ে সময় কমানোর পাশাপাশি যান চলাচল সহজ করতে পারে।

ঢাকা-আশুলিয়া ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বড় প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের দায়িত্ব নিলেই হবে না; তার প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে। অর্থায়নের ঘাটতি, নকশা পরিবর্তন এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালতে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রতার একটি কারণ ছিল। অন্যদিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ ও ইন্টারচেঞ্জ-সংক্রান্ত পরিবর্তন প্রকল্পের ব্যয় ও সময়কে প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্রকল্পের পরিধি বাড়লেই অনির্দিষ্টকাল সময় বাড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রকল্প দীর্ঘায়িত হলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পেতে দেরি হয়। তাই প্রকল্প গ্রহণের আগেই বাস্তবায়ন সক্ষমতা যাচাই এবং নির্মাণকালীন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিকল্প পথ ও সড়ক নিরাপত্তার পরিকল্পনা করা জরুরি। ঢাকায় ভবিষ্যতে আরো মেট্রোরেল ও পাতালপথের কাজ হবে। একাধিক প্রকল্প একই সময়ে চললে যান চলাচল সচল রাখা কঠিন হবে। এ কারণে প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।

সড়ক সম্প্রসারণ, চার লেন ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। সড়ক নিরাপত্তায় আর কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

আমাদের উন্নয়ন অনেকটা সড়কের সক্ষমতা ও যানবাহনের গতি বাড়ানোর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কিন্তু শুধু গতি বাড়িয়ে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনার সঙ্গে সড়কের নকশা, যানবাহনের অবস্থা, চালকের দক্ষতা, গতিসীমা এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের বিষয়গুলো জড়িত।

সড়ক উন্নত হলেও যানবাহনের মান ও চালকের দক্ষতায় সমান অগ্রগতি হয়নি। এখনো ফিটনেসবিহীন বাস, পুরনো যানবাহন ও অনভিজ্ঞ চালকের সমস্যা রয়েছে। মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহন চলাচল করলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য অর্জনে প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। দক্ষ চালক তৈরি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর গতিসীমা, সড়কের পাশের হাটবাজার ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করে সমাধানে কাজ করা জরুরি।

ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, দুর্ঘটনা ও ব্যাটারির বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের কী করা উচিত?

ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনের বাস্তব চাহিদা রয়েছে। ঢাকার অনেক সড়কে বড় বাস চলাচল সম্ভব নয়। গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকায় মানুষ ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল। তাই পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা প্রয়োজন।

যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণ, নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, চলাচলের এলাকা ও নিরাপত্তার মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। কিউআর কোডযুক্ত নিবন্ধন চালু করা গেলে যানবাহনের পরিচয় যাচাই এবং নম্বর প্লেটের জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি মান ও ফিটনেস নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাটারি চার্জিং, মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারি সংগ্রহ এবং পরিবেশসম্মত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও নীতিমালায় থাকতে হবে। তবে চালক ও মালিকদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মতভাবে নীতিমালা কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে যাত্রীদের চাহিদা, জীবিকা ও সড়কের ধারণক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে।

ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও আবার দখল হয়ে যায়। স্থায়ী সমাধান কী?

ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্মিত। দখলের কারণে পথচারীদের সড়কে নামতে হয়, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং যান চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়। তবে বিষয়টিকে শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। অনেক হকার ফুটপাতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে উচ্ছেদের পর পুনর্দখল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরে শিল্প, ব্যবসা এবং সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি। এতে রাজধানীকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের চাপ কমবে।

ঢাকার বাইরে শিল্প ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে রাজধানীর ওপর চাপ কমতে পারে। এখন কি ঢাকার বাইরে বিনিয়োগ বাড়ানোয় বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত?

অবশ্যই। একটি শহরের ধারণক্ষমতা রয়েছে। জনসংখ্যা, যানবাহন, সড়ক ও নাগরিক সেবার সক্ষমতা বিবেচনায় ঢাকা এরই মধ্যে বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। নতুন যোগাযোগ অবকাঠামো স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলে দীর্ঘমেয়াদে আবার চাপ বাড়বে। তাই শুধু ঢাকার মধ্যে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে অন্যান্য শহরে শিল্প-কারখানা, সরকারি অফিস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। এটি শুধু যানজট কমানোর বিষয় নয়; সুষম নগরায়ণ ও আঞ্চলিক উন্নয়নেরও প্রশ্ন। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাজধানীকেন্দ্রিকতা কমানোর পরিকল্পনা এখন থেকেই শুরু করা প্রয়োজন।

ঢাকার বাইরে শিল্প-কারখানা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করা গেলে নতুন যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর চাপ এবং সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজনও কমতে পারে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

আমি এ চিন্তার সঙ্গে একমত। তবে বিকেন্দ্রীকরণ পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। ঢাকায় নতুন মেগা প্রকল্প নির্মাণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও শিল্প-কারখানা যদি রাজধানীকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে নতুন অবকাঠামোও একসময় চাপের মুখে পড়বে। ঢাকার বাইরে শিল্প, ব্যবসা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে মানুষকে জীবিকার জন্য রাজধানীতে আসতে হবে না। এতে ঢাকার জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

ঢাকার যোগাযোগ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের চাহিদা মেটাতে এসব প্রকল্প প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্মাণকালীন যানজট, বিকল্প পথ, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। চাহিদা ব্যবস্থাপনা, বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সুষম নগরায়ণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের অর্থে নেয়া প্রতিটি প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

আরও