বিশ্ব অর্থনীতি

বিশ্ব অর্থনীতিতে যুগল আঘাত হিসেবে এল যুদ্ধ ও শুল্ক

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের সূচনা এবং ধ্বংসাত্মক শুল্কযুদ্ধ আগে থেকে সংকটে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরো ঝুঁকি তৈরি করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের সূচনা এবং ধ্বংসাত্মক শুল্কযুদ্ধ আগে থেকে সংকটে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরো ঝুঁকি তৈরি করেছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা থাকলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এখন অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি যে দেশের ওপরই আরোপিত হোক না কেন সেটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করেছে। যেখানে মন্থরগতির অর্থনীতিতে মন্দা তৈরিতে ট্রাম্পের শুল্কনীতিই যথেষ্ট ছিল, সেখানে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি ধাক্কা—ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ পরিস্থিতি আমার ‘চক্রাকার ঝুঁকি’ তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যদি একটি অর্থনীতিতে শ্লথগতি নেমে আসে তাহলে একটি ছোট আঘাতও তাকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এ তত্ত্ব গত ৪৫ বছরে বৈশ্বিক মন্দার পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। যেকোনো দেশের মন্দা বলতে সাধারণত উৎপাদনের পরিমাণ কমে আসাকে বোঝায়। কিন্তু বৈশ্বিক মন্দা মানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক অর্থনীতির আকার সংকুচিত হয়ে আসা, যদিও বাকি অর্ধেক দেশের অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। যে কারণে বিশ্ব মন্দা বলতে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারে শ্লথগতিকে বোঝানো হয়। এটি সাধারণত ২ থেকে ২.৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে যেটি দশমিক ৮ থেকে ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্টে নেমে আসে, যা ১৯৮০-পরবর্তী সময়ের বৈশ্বিক জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশের কম। তবে ২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০২০ সালের করোনা মহামারীর সময় এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছিল। কারণ সে সময় আসলেই বৈশ্বিক উৎপাদন সংকুচিত হয়ে পড়েছিল।

‘শ্লথগতি’ হলো চক্রাকার ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। শ্লথগতির অর্থ হলো গড় প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া। যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যেকোনো অভিঘাত মোকাবেলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। গত ৪৫ বছরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ শতাংশে মধ্যে থাকলে সেটাকে শ্লথগতির অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যখন বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ২-৩ শতাংশে নেমে আসে তখন সামান্য অভিঘাতও মন্দা সৃষ্টি করতে পারে। এমনই আমরা আগের চারটি বৈশ্বিক মন্দার ক্ষেত্রে হতে দেখেছি।

এখনকার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসবে—যা শ্লথ প্রবৃদ্ধির হারকে নির্দেশ করছে। আর আগের মন্দাগুলো যেখানে একক কোনো অভিঘাতের কারণে তৈরি হয়েছিল, সেখানে এবার বিশ্ব অর্থনীতি একসঙ্গে দুটি বড় ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। শুল্কযুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এই দ্বৈত সংঘাত বৈশ্বিক মন্দার শঙ্কা আরো বাড়িয়ে তোলে। অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত।

আরেকটু বিস্তারে দেখলে শঙ্কা জাগানিয়া বিষয় হলো এই যুগল ধাক্কার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির অনেক জায়গায় অনুরণন হতে পারে, যা প্রত্যক্ষভাবে প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করবে। শুল্কযুদ্ধ এখন নতুন কিছু নয়। আমার ধারণা, আইনি জটিলতাগুলো শেষ হলে ট্রাম্পের যে শুল্ক প্যাকেজ সামনে আসবে, তাতে গড়পড়তা প্রায় ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক নির্ধারিত হবে। চীনের জন্য তা আরো বেশি। বিশেষ কিছু পণ্যে (যেমন মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম) কঠোর শুল্ক আরোপ করা হবে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো শিল্পগুলোকে রক্ষা করা যায়।

এই ১০ শতাংশ শুল্ক গত ৩০ বছরের গড় শুল্কহার ১ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি—এটি যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই একটি বড় আঘাত। এতে চীনের মতো রফতানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো বিপদে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। ফলে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ ও নিয়োগ কমিয়ে দেবে। আর যেহেতু ২০১০ সাল থেকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে ৪০ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাই এ শুল্কযুদ্ধের বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অবমূল্যায়ন করা যাবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব সাধারণত জ্বালানি তেলের দামের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর জ্বালানি তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ে যায়, তবে তা ছিল তিন বছরের সর্বনিম্ন মূল্য থেকে এবং ২০২২ সালের পরবর্তী সময়ের গড় দামের তুলনায় এখনো অনেক নিচে। এরপর ২৩ জুন ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই তেলের দাম সেই বৃদ্ধির বেশির ভাগটাই হারিয়ে ফেলে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে—এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। কারণ ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেল উৎপাদন ও পরিবহন বা গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুটে বিঘ্ন ঘটাতে পারে—এমন শঙ্কা বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সর্বশেষ ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণ স্থাপনায় বোমা হামলা এ অস্থিতিশীল বিশ্বে এক নতুন অনিশ্চয়তার মাত্রা যোগ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সরাসরি অংশ হয়ে ওঠায় বৈশ্বিক জ্বালানি দামে কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা অত্যন্ত কঠিন। তবে একটি দিক থেকে পরিস্থিতিটি ১৯৯০ সালের আগস্টে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আগ্রাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়, ফলে মাত্র তিন মাসের মধ্যে তেলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে, তখন বৈশ্বিক অর্থনীতি আগেই মন্থর হয়ে ১৯৯১ সালে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ‘স্টল স্পিড’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল এবং যুদ্ধঘটিত জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ১৯৯২-৯৩ সালে এক সাময়িক বৈশ্বিক মন্দার দিকে নিয়ে যায়।

সাময়িক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বা ইরান যুদ্ধ নয়, বরং এ দুটি ঘটনার ভূরাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়া। এ ধাক্কাগুলো পরস্পরকে আরো উসকে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা এমন এক বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, যা এরই মধ্যে স্থবিরতার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনৈতিক চক্রভিত্তিক পূর্বাভাস কখনোই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে চলতি বছরের এ দুটি বড় আঘাত বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কাকে আরো জোরালো করে তুলেছে।

[স্বত্ব:প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৫]

স্টিফেন এস রোচ: যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মরগান স্ট্যানলি এশিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান

আরও