কিন্তু এ অর্জনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল বাস্তবতা। দেশের শ্রমবাজারের ৮৪ শতাংশের বেশি এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রম খাতের। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন কর্মজীবীর মধ্যে অন্তত আটজন এমন কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মসংস্থা, স্বাস্থ্য বীমা, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা কিংবা পেনশনের নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গ্রামাঞ্চলে এ হার আরো ভয়াবহ (৯২ শতাংশের ওপরে)। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি হলো উচ্চশিক্ষার সনদ পাওয়া তরুণদের ৫৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখনো এ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার বেকারত্বের হারও এ উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেশি (১৩ শতাংশের ওপরে)। মানে শিক্ষার বিস্তৃতি যত বাড়ছে, তার সঙ্গে বেকারত্বের ঝুঁকিও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কারণ শ্রমবাজারের চাহিদার নিরিখে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ পর্যাপ্ত দক্ষ বলে বিবেচিত হন না। শিক্ষা ও টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের মধ্যকার এ বিপরীত সমীকরণ গোটা জাতির জন্য এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে। এ সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য যদি টেকসই নীতিমালা প্রণয়ন করা না যায়, তাহলে বর্তমানে সম্ভাবনাময় জনমিতিক লভ্যাংশ আর এক দশক পরেই দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। দিন দিন সার্টিফিকেটের স্তূপ বাড়বে, কিন্তু দক্ষ কর্মী শ্রমবাজারে যুক্ত হবে না।
কোনো উচ্চশিক্ষা পাওয়া ব্যক্তিই স্বেচ্ছায় অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না। বিশেষত উচ্চশিক্ষা লাভের পর অধিকাংশ তরুণই চান প্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হয়ে সহজ-স্বাভাবিক জীবনযাপনের। কিন্তু যখন প্রাতিষ্ঠানিক খাতে পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না, তখন বাধ্য হয়েই অনেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হন। দেশের শিল্পায়ন অনেকাংশে তৈরি পোশাক খাতের গণ্ডিতে আটকে আছে। এদিকে গিগ ইকোনমি, ফ্রিল্যান্সিং ও এসএমই খাতের বিস্তার শুরু হলেও এগুলোও পর্যাপ্ত শ্রমঘন শিল্প হয়ে ওঠেনি। এজন্যই লাখ লাখ সার্টিফিকেটধারী তরুণ শ্রমবাজারে এসে দেখছেন, তাদের চাহিদার নিরিখে উপযুক্ত কর্মসংস্থান নেই। আইএলওর গবেষণা যেমনটি বলছে, দেশে কর্মসংস্থান কাঠামোগতভাবে উল্টোদিকে পরিবর্তন হচ্ছে। এখানে নানা কারণে শিল্পের বিকাশ থমকে যাওয়ায় মানুষ আবার কৃষি এবং স্বকর্মসংস্থানের মতো কম উৎপাদনশীল ও শ্রমঘন খাতে ফিরে যাচ্ছে। প্রতি বছর শ্রমবাজারে ২০ লাখেরও বেশি তরুণ যুক্ত হন। এদের বড় একটি অংশ ফ্রিল্যান্স, ছোটখাটো ব্যবসা কিংবা রাইডশেয়ারিং পরিষেবার মাধ্যমে নিজ নিজ আর্থিক চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তরুণদের একটি বড় অংশ এখনো সরকারি চাকরির দিকেই ঝুঁকে আছেন। বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানের বিষয়ে তাদের অনীহার বড় কারণ বেতন কাঠামো, সুযোগ-সুবিধার অভাব ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তার অভাব। আবার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলাম বা পঠিত বিষয়গুলোর সঙ্গে শ্রমবাজারের সামঞ্জস্য নেই। ফলে উচ্চশিক্ষার সনদ নেয়ার পরও বেসরকারি খাতের ‘পেশাদার’ প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছেন অসংখ্য তরুণ। এমনকি সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গেও তাদের স্নাতকের পাঠ্যক্রমের মিল খুব বেশি থাকে না। শ্রমবাজারের কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি শিক্ষা খাতের মেলবন্ধনের অভাব থাকায় শিক্ষিত তরুণরা পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করছেন না এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় দেশী-বিদেশী কোনো কর্মসংস্থানের সঙ্গেই যুক্ত হতে পারছেন না। এ সংকট থেকে বের হওয়ার আদৌ উপায় কী? তা আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে।
শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য গড়ার ক্ষেত্রে অনেক দেশই উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পেরেছে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির ‘ডুয়াল সিস্টেম’ বিশ্বের সবচেয়ে সফল কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিক্ষা মডেলগুলোর একটি। এখানে শিক্ষার্থীরা একদিকে ক্লাসরুমে পড়াশোনা করে, অন্যদিকে সপ্তাহের কয়েক দিন সরাসরি কোম্পানিতে প্রশিক্ষণ নেয়। ফলে স্নাতকের আগেই তারা চাকরির জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এ মডেল বাস্তবায়নের কারণেই জার্মানিতে যুব বেকারত্বের হার ইউরোপে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর তরুণদের সামগ্রিক দক্ষতাভিত্তিক জাতীয় কাঠামোর অধীনে রাখে। দেশটির ‘স্কিলসফিউচার’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক আজীবন নিজ দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পান। শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যৌথভাবে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করে। এজন্য দেশটির সনদপ্রাপ্তরা যখনই কর্মসংস্থানে যুক্ত হন, প্রাসঙ্গিক থাকেন। এশিয়ার আরেক দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ‘ওয়ার্ক-লার্ন ডুয়াল সিস্টেম’ চালু করেছে। এ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরাসরি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এভাবে স্নাতকদের জন্য একটি নির্দিষ্টসংখ্যক পদ আগে থেকেই নিশ্চিত রাখা হয়। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে ব্রাজিল। দেশটিতে ‘সিম্পলস নেশিওনাল’ কর সরলীকরণ কর্মসূচিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এভাবে লাখ লাখ অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আসার পাশাপাশি শ্রমিকরাও পেয়েছে সামাজিক সুরক্ষা। এমনকি পাশের দেশ ভারতও কেন্দ্রীয়ভাবে ‘প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা’ চালু করে কোটি কোটি তরুণকে শিল্পপ্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সেক্টরভিত্তিক স্কিল কাউন্সিল গঠন করে শিক্ষা ও শিল্পের মাঝে সমন্বয় করা হয়েছে।
এসব উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়, বাংলাদেশকেও শ্রমবাজারে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর যেমন জোর দিতে হবে, তেমনি করনীতি সংস্কারের মাধ্যমে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিকীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষত করনীতি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক হলেই করের বোঝা—এ বাস্তবতা না বদলালে অপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কমবে না। সরকারকে এমন একটি স্তরভিত্তিক কর কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ নিবন্ধিত হতে উৎসাহ পাবে, ভয় পাবে না। এদিকে দক্ষতামুখী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে একাত্ম হয়ে কাজ করতে হবে। জার্মানি বা সিঙ্গাপুরের মতো শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারত্বের মডেল চালু করা যেতে পারে। এমনকি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে বিশেষায়িত পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার মাধ্যমে পাঠ্যক্রম প্রণয়নের কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। পড়তে পড়তেই যাতে শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপ ও হাতেকলমে অভিজ্ঞতা পায়, এমন কাঠামোগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জনপ্রিয় করতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে নতুন শিল্প খাত গড়তে হবে। এক্ষেত্রে চামড়া, আসবাব, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোয় বড় বিনিয়োগ টানার দিকে মনোযোগ বাড়ানো দরকার। যেহেতু দেশের অনেক তরুণ আইটি ও ফ্রিল্যান্স খাতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তাই তাদের আনুষ্ঠানিক সুবিধার আওতায় আনা জরুরি। আইটি খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষা ও শিল্প খাতের সমন্বয় ছাড়া বহুমুখী কর্মসংস্থানের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার সম্ভব নয়। এজন্যই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো অর্থনৈতিক শক্তির বিনিয়োগের ঘাঁটি না করে স্থানীয় শিল্প উদ্যোগের পরিবেশ হিসেবে গড়তে হবে। নারী কর্মসংস্থানকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে মাত্র ২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত। এমন বৈষম্য মেনে নেয়া যায় না। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুসেবা সুবিধা ও নারীবান্ধব কর্মনীতি ছাড়া কর্মসংস্থানের বৈষম্যের চিত্র বদলাবে না।
যারা ঝরে পড়েছে তাদের কথাও ভাবতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শুধু উচ্চশিক্ষিতদের জন্য নয়। এসএসসির আগেই যারা ঝরে পড়েছে, তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃত দক্ষতা সনদের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্নটি এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটি কঠিন নয়, সদিচ্ছার অভাবই মূল বাধা। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, এসডিজি অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ শ্রমশক্তির ৮৪ শতাংশকে সামাজিক সুরক্ষার বাইরে রেখে সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার নয়। শিক্ষিত তরুণের সনদ যদি কর্মসংস্থানের দরজা না খোলে, তাহলে তেমন শিক্ষা বেশি কাজে আসে না। তাই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মেলবন্ধন ঘটানো এখন আর শুধু নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার প্রশ্নও।