অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পূজনীয়। তিনি এমন একজন চিন্তাবিদ, যিনি তার বিখ্যাত ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ ও ‘দ্য থিওরি অব মোরাল সেন্টিমেন্টস’ গ্রন্থে বাজার অর্থনীতি কীভাবে কাজ করে, তা নির্ণয় করে দেখিয়েছেন। তবে যেসব পরিজ্ঞান তাকে উজ্জ্বল খ্যাতি এনে দিয়েছে, তা কিন্তু আর অতীতের মতো অখণ্ডনীয় কোনো বিষয় নয়।
সম্ভবত স্মিথের সেরা অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে সুকার্যকর ও সুনিয়ন্ত্রিত বাজার প্রসঙ্গ। যেমন ব্যক্তিরা তাদের নিজস্ব স্বার্থ অনুসারে কাজ করেন, যা কিনা সামগ্রিকভাবে ভালো ফল দেয়। ‘ভালো’ শব্দটিকে আজকালকার অর্থনীতিবিদরা ‘প্যারাটো অপটিমাল’ বলে অভিহিত করেন; যার মানে একটি রাষ্ট্রের সম্পদের এমন একটি বণ্টন ব্যবস্থা, যেখানে কারো খারাপ না করে অন্য কাউকে ভালো রাখা সম্ভব নয়।
স্মিথের প্রস্তাবটি সমস্যাযুক্ত। কারণ এটি বাজারের কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা নেই বলে অবিচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করে। বাহ্যিক প্রভাবশূন্যতা (বিভিন্ন প্রভাব যেমন দূষণ, যা কিনা বাজারের দামে প্রতিফলিত হয় না), কোনো বড় ধরনের তথ্যগত ফাঁক বা অসম্পূর্ণতা এবং তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য শক্তিশালী অনুঘটকের অনুপস্থিতি। উপরন্তু, এটি বিতরণের ফলাফলগুলোকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে (যা প্যারাটো কার্যকারিতাকে অন্তর্ভুক্ত করে না)।
স্মিথের আরেকটি মূল দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, শ্রমিক বা সংস্থার সামগ্রিক উৎপাদন একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে বিশেষায়িতকরণের সঙ্গে শ্রমের বর্ধমান বিভাগ উৎপাদনশীলতা এবং আয় বৃদ্ধি করতে পারে। এটি মূলত বিশ্বায়নের যুক্তি। বাজারের সম্প্রসারণ ও সংহতকরণ কোম্পানি এবং রাষ্ট্রকে তুলনামূলক সুবিধার জন্য মূলধন তৈরি করতে সক্ষম করে। ফলে নাটকীয়ভাবে সামগ্রিক দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি ঘটে।
আবারো বলছি, যা-ই হোক না কেন, স্মিথ সম্পদ বণ্টনের বিবেচনা ছাড়াই বাজার অর্থনীতির সম্পদ তৈরির সক্ষমতার দালালি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে বৃহত্তর বাজারগুলোয় বর্ধিত বিশেষায়নের সম্ভাব্য বড় বিতরণ প্রভাব রয়েছে, কিছু অংশগ্রহণকারী বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে। অর্জনের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতার যথেষ্ট অভাব বিদ্যমান, কারণ এটি বাস্তবায়নের কোনো জুতসই পন্থা নেই।
বাজারগুলো হলো সামাজিক পছন্দের প্রক্রিয়া, যেখানে ডলার কার্যকরভাবেই ভোটের সমান। যাদের ক্রয়ক্ষমতা বেশি, বাজারের ফলাফলগুলোর ওপর তাদের প্রভাবও বেশি। একইভাবে সরকারও সামাজিক পছন্দের প্রক্রিয়া। কিন্তু ভোট প্রদানের ক্ষমতা কিংবা যেমনটা হওয়ার কথা সম্পদ নির্বিশেষে সমানভাবে বণ্টনের জন্য রাজনৈতিক সমতাকে এক্ষেত্রে অবশ্যই বাজারের ওজনযুক্ত ‘ভোটদান’ শক্তির বিপরীতে একটি পাল্টা শক্তি হিসেবে কাজ করা উচিত।
এ লক্ষ্যে সরকারকে কমপক্ষে তিনটি মূল কার্য সম্পাদনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রথমত, তাদের অবশ্যই বাজারের ব্যর্থতা হ্রাসের বিভিন্ন কারণ যেমন বহিরাগত উপাদান, তথ্যগত শূন্যতা বা অসম্পূর্ণতা কিংবা একচেটিয়াকরণ নিয়ন্ত্রণে প্রবিধানের ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাদের অবশ্যই বস্তুগত ও অবস্তুগত সম্পদে বিনিয়োগ করতে হবে, যেখানে বেসরকারি রিটার্ন সামাজিক সুবিধার চেয়ে কম এবং তৃতীয়ত, তাদের অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য বিতরণ ফলাফলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
কিন্তু বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো তাদের এসব দায়িত্ব প্রতিপালনে যারপরনাই ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ কোনো কোনো গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারী দেশে ক্রয়ক্ষমতা অবৈধভাবে রাজনীতির দখলে চলে গেছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে নির্বাচনের বিষয়টি দৃঢ়ভাবে সম্পদ নয়, তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত; যা বাজারজাতকারীদের স্বার্থের সঙ্গে নীতিগুলোকে একত্র করতে রাজনীতিবিদদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি করে।