শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে আইটি খাত

বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে এ খাত শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এবং পোশাক শিল্পের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীর দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দেশ। প্রথমটি হলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (ফোরআইআর) আর দ্বিতীয়টি হলো, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে সফলভাবে উন্নীত হওয়া। এ লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে বাংলাদেশ আর পুরনো, কম খরচের উৎপাদননির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেলের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। এর পরিবর্তে প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবাকে (আইটিইএস) ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি নতুন উৎপাদনশীলতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির মডেল।

এলডিসি থেকে উত্তরণ মূল্যায়ন করা হয় মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে। কিন্তু উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া শুধু এসব সূচকের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিক বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং উচ্চ দক্ষ মানবসম্পদ।

গত কয়েক দশকে সস্তা শ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। এ কৌশল আমাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিলেও অটোমেশন ও ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে এর সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে এখনই রাতারাতি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় স্মার্ট কারখানা গড়ে তুলতে হবে বা বিদ্যমান শ্রমনির্ভর শিল্পকে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। বরং প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত, এআই-ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি কৌশল, যার ভিত্তি হবে কৃষি, সেবা ও এমএমই। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে তরুণরা নিজ নিজ বিষয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি ডিজিটাল দক্ষতা, এআই-সাক্ষরতা এবং বহুমুখী সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

কৃষিতে এআই প্রযুক্তি বাড়াবে উৎপাদনশীলতা

কৃষি এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশের প্রায় ৩৫-৩৭ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান এ খাতে, আর জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১১-১২ শতাংশ। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামাল জোগায় এবং রফতানি আয়েও অবদান রাখে। তবু কম উৎপাদনশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বাজারদরের অস্থিরতা এবং সময়মতো তথ্যের অভাবে অনেক কৃষক এখনো ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

এআই এ চিত্র বদলে দিতে পারে। নিখুঁত চাষাবাদের (প্রিসিশন এগ্রিকালচার) মাধ্যমে কৃষকেরা মোবাইল ফোনেই ফসলের রোগ, আবহাওয়া, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং সেচ ও সার ব্যবহারের প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেতে পারেন। এতে ব্যয় কমবে, ফলন বাড়বে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও দামের পূর্বাভাস কৃষকদের উৎপাদন ও বিপণন বিষয়ে আরো ভালো সিদ্ধান্ত নিতে এবং ফসল-পরবর্তী লোকসান কমাতে সাহায্য করবে।

তবে প্রযুক্তি উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়; সেটিকে সহজ, সাশ্রয়ী এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। এআই-ভিত্তিক অ্যাপ ও ডিজিটাল সেবাগুলো সহজ বাংলা ভাষা ও ভয়েস কমান্ডে পরিচালনার সুযোগ থাকতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সমবায় সমিতি, এনজিও এবং কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ডিজিটাল ও এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে প্রান্তিক কৃষকেরাও এর সুফল পান। এভাবেই এআই বাংলাদেশের কৃষি রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প আইটি সেবার প্রসার

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ ব্যবসায়িক উদ্যোগ এবং শিল্প খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান এ খাতের আওতাভুক্ত। কিন্তু অর্থায়নের অভাব এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে থাকায় এদের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। এআই এ ব্যবধান দূর করতে পারে। প্রশাসনিক কাজ সহজ করা, পণ্যের মজুদ ঠিক রাখা, জালিয়াতি রোধ এবং ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে সহজ করে এআই ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে ব্যাংকের কাছে নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে।

প্রথাগত এসএমই খাতের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা (আইটিইএস) খাতের সামনে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। ভারী শিল্পের তুলনায় এ খাতে কম পুঁজিতেই সফটওয়্যার উন্নয়ন, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) এবং ক্লাউড সলিউশনের মতো উচ্চ মূল্যের সেবা দেয়া সম্ভব। বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে এ খাত শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এবং পোশাক শিল্পের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এআই-ভিত্তিক নাগরিক সেবা

উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো সেবা খাত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক প্রযুক্তি (ফিনটেক) এবং অন্যান্য সেবায় এআই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। এআই এ খাতগুলোকে আরো দক্ষ, দ্রুত ও জনবান্ধব করে তুলতে পারে। ফলে মানুষ কম খরচে, কম সময়ে এবং আরো সহজে সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাবে, একই সঙ্গে সেবার মানও উন্নত হবে।

স্বাস্থ্য খাতে এআই-চালিত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা চিকিৎসকদের দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। অন্যদিকে আর্থিক খাতে এআই ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা মূল্যায়ন, ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষের কাছেও আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা খাতে এআই-ভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার (পারসোনালাইজড লার্নিং) ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার সুযোগ বাড়াতে এবং শিক্ষার মান উন্নত করতে পারে। এভাবে এআই শুধু সেবার দক্ষতাই বাড়াবে না, বরং নাগরিক সেবাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবার জন্য সহজলভ্য করে তুলবে।

প্রয়োজনীয় নীতিমালা উদ্যোগ

এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার, শিল্প খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ডিজিটাল ও এআই-সাক্ষরতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু তরুণদের নয়, কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও মাঠপর্যায়ের সেবাদানকারীদেরও এআই ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে। কারণ এআই তখনই অর্থনীতিতে প্রকৃত পরিবর্তন আনবে, যখন এর সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

একই সঙ্গে এআই-ভিত্তিক উদ্ভাবনের জন্য পরীক্ষামূলক নীতিগত কাঠামো (রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স), সহজ অর্থায়ন ও প্রণোদনা চালু করতে হবে, যাতে দেশীয় স্টার্টআপগুলো বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো, নিরাপদ ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা। এ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষি, সেবা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে পরিকল্পিতভাবে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ সস্তা শ্রমনির্ভর প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতাভিত্তিক নতুন অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু জাতীয় আয় দিয়ে নয়, বরং এআইয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা কতটা উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারি, তার ওপর। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, উদ্ভাবননির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়তে সেই প্রস্তুতি শুরু করার সময় এখনই।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও সাবেক উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

আরও