পদ্মা ব্যারাজকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পানি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে

পদ্মা ব্যারাজের গুরুত্ব শুধু পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও একটি সম্ভাবনাময় প্রকল্প। এ ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, মাছ উৎপাদন বাড়বে। প্রকল্প থেকে বছরে আনুমানিক ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এ ভূখণ্ডে নদী ভূগোল, অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সমন্বয়ক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। নদীনির্ভর হওয়ার পরও গত পাঁচ দশক ধরে ভয়াবহ পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এর নীরব মূল্যও চুকাতে হচ্ছে নদীর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মানুষের জীবন। এর প্রধান কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নদীর নাব্য নিয়ন্ত্রিত এবং এ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই। নদীর অববাহিকায় উজানের দেশ বলে পরিচিত চীন এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত—এ দুটো দেশ নদী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আর এ দুটো দেশের পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভূরাজনীতির কারণে ভুগতে হচ্ছে আমাদের।

১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো ধীরে ধীরে প্রাণ হারাতে শুরু করে। দেশের চারটি বিভাগের অন্তত ১৯টি জেলার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ১৯টি জেলায় সমগ্র জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশ মানুষের বাস। এ অঞ্চলগুলোতে থাকা গড়াই, মধুমতি, হিসনা, মাথাভাঙ্গা, বড়াল কিংবা ইছামতির মতো মিঠাপানির নদীগুলো একসময় প্রবাহিত হতো। সেগুলো নাব্যের অভাবে শুকিয়ে গেছে। অনেক নদীতে বেড়েছে লবণাক্ততা। ফলে কমছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও অস্তিত্ব সংকটে। এ নদীগুলোর পানির প্রধান উৎস পদ্মা নদী। গঙ্গার অববাহিকা এ নদী। এদিকে গঙ্গার পানি ভারত ও চীনের নিয়ন্ত্রণে। পদ্মার পানির নিয়ন্ত্রণ ভারতের কাছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ এ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। পদ্মার বড় একটি অংশ বাংলাদেশে এবং এ পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের থাকলেও নিয়ন্ত্রণের অধিকার নেই। এমন বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে নিছক অবকাঠামো প্রকল্প ভাবার সুযোগ নেই। বরং দেশের নিরাপত্তা, প্রাণ-প্রকৃতি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির পুনর্জাগরণের কৌশলগত উদ্যোগও এটি।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের মাধ্যমে অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ প্রকল্প মূলত ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলার একটি বাস্তবভিত্তিক উত্তর। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে গঙ্গার পানিবণ্টনে ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের ঘাটতি থেকেই গেছে। ফলে নদী পুনরুদ্ধার ও পানি সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব অবকাঠামো তৈরি ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প ছিল না। পদ্মা ব্যারাজ সেই প্রয়োজনের তাগাদা থেকেই এসেছে। রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মিতব্য ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে। পরে সেই পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন শাখা নদীতে সরবরাহ করা হবে। ফলে মৃতপ্রায় নদীগুলোয় আবারো প্রবাহ ফিরবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌচলাচল ও পরিবেশে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

বিশেষ করে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে এ প্রকল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি, সুপেয় পানি ও বনসম্পদ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সুন্দরবনের কেওড়াসহ বিভিন্ন উদ্ভিদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়লে শুধু কৃষিই নয়, পুরো উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র নতুন প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

পদ্মা ব্যারাজের গুরুত্ব শুধু পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও একটি সম্ভাবনাময় প্রকল্প। এ ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, মাছ উৎপাদন বাড়বে। প্রকল্প থেকে বছরে আনুমানিক ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা এটিকে বহুমুখী প্রকল্পে পরিণত করেছে। নদী ব্যবস্থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘কাঠামো’ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। দেশে অনেকদিন নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এটি নদী ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।

এদিকে এত বড় প্রকল্পের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বদলে গেলে উজানে ভাঙন এবং ভাটিতে পলি জমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, নদীর হাইড্রো মরফোলজিক্যাল পরিবর্তন মোকাবেলা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকানো হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগ থাকে। পদ্মা ব্যারাজের ক্ষেত্রেও এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি এবং দক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। এ প্রকল্পকে শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতীক বানালে চলবে না। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পানি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ আগামী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হবে পানি। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

ড. আমানুর আমান: লেখক ও গবেষক

আরও