জনপ্রশাসন

এশীয় অভিজ্ঞতার আলোকে কর আহরণ বাড়াতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপান্তরমুখী চাহিদা আজ অত্যন্ত প্রবল। ফলে প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারেরই অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে টেকসই ও সুদূরপ্রসারী অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জনগণের এ উন্নয়ন-প্রত্যাশা পূরণ করা।

তবে এখানে একটি প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য বা পরস্পরবিরোধী মনোভাব লক্ষ করা যায়; নাগরিক সমাজ রাষ্ট্র থেকে উন্নত অবকাঠামো, মানসম্মত সেবা ও দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রত্যাশা করলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর প্রদানের ক্ষেত্রে একধরনের প্রথাগত অনীহা বা উদাসীনতা প্রদর্শন করে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত কর অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত হারের চেয়ে লক্ষণীয় মাত্রায় কম।

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো জনকল্যাণে ও জনস্বার্থে অর্থ সংগ্রহ করা এবং সেই সংগৃহীত অর্থ দ্বারা নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধানসহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদা পূরণ। আধুনিককালে সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জননিরাপত্তার ধারণা যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জনকল্যাণমুখী নানা চাহিদা। সীমিত অভ্যন্তরীণ সম্পদ নিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে এ বিপুল চাহিদা পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকারকে প্রতিনিয়ত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর এভাবেই একটি রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে ‘ঋণনির্ভর রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনার’ এক জটিল দুষ্টচক্রে নিপতিত হয়, যার থেকে বর্তমান বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। আমাদের পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ ও এর সুদ পরিশোধের দায় এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে এখনই একটি সর্বাত্মক ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে দেশের ভবিষ্যৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন অভিযাত্রা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে।

উন্নয়ন ঋণের এ ক্ষতিকর জাল ছিন্ন করতে হলে আমাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের মাত্রা ও ক্ষেত্র প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই। আর অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সবচেয়ে টেকসই ও প্রধান উৎস হলো ‘কর’। কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, দুর্নীতির মূলোৎপাটন, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণে সম্ভাব্য সব প্রশাসনিক ও আইনি কৌশল কাজে লাগানো এখন সময়ের দাবি। এ প্রেক্ষাপটে কর বিভাগের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রেখে স্থানীয় প্রশাসনের চালিকাশক্তি হিসেবে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রজ্ঞা, তদারকি ও সমন্বিত উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং একটি সমৃদ্ধ কর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ পরিকাঠামো তৈরি করার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জেলা প্রশাসনের আইনি সক্ষমতা: কর বিভাগ সৃষ্টির আগে মূলত কর আদায়ের লক্ষ্য নিয়েই ‘কালেক্টর’ পদের সৃষ্টি হয়েছিল। আজও রাজস্ব-সংক্রান্ত বিষয়ে তারা কালেক্টর হিসেবে কাজ করেন। তবে তা মূলত ভূমি রাজস্বের ক্ষেত্রে। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেলা প্রশাসকরা কর আহরণ এবং করের আওতা (ট্যাক্স নেট) বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। যদিও কর নির্ধারণ ও আদায়ের মূল আইনি দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর), তবু মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসকদের প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে করের পরিধি ব্যাপক বিস্তৃত করা সম্ভব।

এক্ষেত্রে তারা নিম্নলিখিত উপায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন:

এক. স্থানীয় তথ্য ও ডেটাবেজ শেয়ারিং: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনবল মূলত শহর বা বড় শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল, রাইস মিল বা আবাসন ব্যবসার যে দ্রুত প্রসার ঘটছে, তার নিখুঁত চিত্র জেলা প্রশাসনের কাছে থাকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনারের (ভূমি) মাধ্যমে জেলা প্রশাসকরা মাঠ পর্যায়ের নতুন করদাতাদের চিহ্নিত করে সেই তথ্য স্থানীয় কর অঞ্চলের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন।

দুই. ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএন সংযোগ: পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদগুলো স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে কাজ করলেও জেলা প্রশাসক এগুলোর অন্যতম প্রধান তদারককারী। ব্যবসা বা বাণিজ্যের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে যখন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়ন করা হয়, তখন ই-টিআইএন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি জেলা প্রশাসন কঠোরভাবে নজরদারি করতে পারে। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করের আওতা বাড়বে।

তিন. সমন্বিত রাজস্ব সভা ও কর মেলার আয়োজন: জেলা প্রশাসক হলেন জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি। এ কমিটিতে জেলার ব্যবসায়ী নেতা, চেম্বার অব কমার্স এবং ভ্যাট-ট্যাক্স কর্মকর্তারা থাকেন। জেলা প্রশাসক প্রতি মাসে এ সমন্বয় সভায় কর-জালের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি অন্যতম প্রধান আলোচ্যসূচি (এজেন্ডা) হিসেবে রাখতে পারেন। জেলা পর্যায়ে বার্ষিক ‘আয়কর মেলা’ বা ‘ভ্যাট সপ্তাহ’ সফল করতে জেলা প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা, স্থান বরাদ্দ ও প্রচারণাগত লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে করদাতাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

চার. বকেয়া রাজস্ব আদায় (সার্টিফিকেট কেইস): সরকারের আটকে থাকা অনেক বকেয়া রাজস্ব বা পাওনা আদায়ের জন্য ‘‌পিডিআর অ্যাক্ট’ (পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট) অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা পরিচালনার চূড়ান্ত আইনি ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের হাতে থাকে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করলে সরকারের একটি বড় অংকের রাজস্ব কোষাগারে জমা হবে।

পাঁচ. সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা: আমাদের দেশে অনেকের মধ্যেই কর দেয়া নিয়ে একধরনের ভীতি বা অনীহা কাজ করে। জেলা প্রশাসক যেহেতু জেলার অভিভাবক সমতুল্য, তাই স্থানীয় ব্যবসায়ী বা সুধী সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কর দেয়া নাগরিক দায়িত্ব এবং এলাকার উন্নয়নের চাবিকাঠি—বার্তাটি তিনি কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে পারেন।

ছয়. ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধিতে তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ: জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বর্তমানে ভূমি খাত থেকে বার্ষিক ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আয় হলেও ডিজিটাল ব্যবস্থার শতভাগ বাস্তবায়ন এবং ইজারার পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এ আয় আরো কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। এটি অর্জনের জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। প্রথমত, আধুনিক ডেটাবেজের মাধ্যমে সব অকৃষি ও বাণিজ্যিক জমির সঠিক শ্রেণী নির্ধারণ এবং করদাতাদের মোবাইলে স্বয়ংক্রিয় বকেয়া নোটিস পাঠিয়ে শতভাগ আদায় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, দেশের সব হাট-বাজার, জলমহাল ও বালুমহালকে স্থানীয় সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করে শতভাগ উন্মুক্ত অনলাইন প্রতিযোগিতামূলক ইজারার (ই-টেন্ডারিং) আওতায় আনা জরুরি। তৃতীয়ত, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি টাকার সরকারি খাসজমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করে তা নিয়মমাফিক দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক লিজের আওতায় আনা আবশ্যক।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রেক্ষাপট ও সফল দৃষ্টান্ত: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমগোত্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির একাধিক সফল উদাহরণ রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জেলা প্রশাসনের সক্রিয় অংশগ্রহণ কীভাবে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে।

সাত. ভারতের ‘‌কালেক্টর’ মডেল ও আন্তঃদপ্তর সমন্বয়: ভারতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা কালেক্টর (ডিসট্রিক্ট কালেক্টর) পদটির মূল উৎসই ছিল রাজস্ব বা ‘‌রেভিনিউ’ সংগ্রহ। বর্তমানেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে (যেমন: গুজরাট ও মহারাষ্ট্র) জিএসটি এবং আয়কর বিভাগের সঙ্গে জেলা কালেক্টরের কার্যালয় নিবিড়ভাবে কাজ করে। ভারতের জেলা কালেক্টররা স্থানীয় ‘‌স্ট্যাম্প ডিউটি’ ও রেজিস্ট্রেশন বিভাগের তথ্যের সঙ্গে আয়কর বিভাগের ডেটাবেজ লিংক করতে সাহায্য করেন। কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট অংকের বেশি মূল্যের সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রয় করলে, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডিরেক্ট ট্যাক্সেসের (সিবিডিটি) কাছে চলে যায়। এর ফলে বর্তমানে সেখানে কর ফাঁকি দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এছাড়া কর ফাঁকিবাজ বা কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো যখন অভিযান পরিচালনা করে, তখন স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ম্যাজিস্ট্রেসি সহায়তা দিয়ে জেলা কালেক্টররা সরাসরি নেতৃত্ব দেন, যা রাজস্ব প্রশাসনের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।

আট. পাকিস্তানের ‘‌ডেপুটি কমিশনার’ ও কর সংস্কৃতির রূপান্তর: পাকিস্তানেও জেলা পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে ডেপুটি কমিশনারদের (ডিসি) আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অত্যন্ত জোরালো। বিশেষ করে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে স্থানীয় পর্যায়ে করের পরিধি বাড়াতে ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয় সরাসরি কাজ করে। পাকিস্তানে শহর ও আধা-শহর অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে করের আওতায় আনতে জেলা প্রশাসন এনবিআরের সমকক্ষ সংস্থা এফবিআরের (ফেডারেল বোর্ড অব রেভিনিউ) সঙ্গে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে। ডেপুটি কমিশনারের নির্দেশনায় স্থানীয় বাজারগুলোতে বিশেষ জরিপ চালানো হয়, যার ফলে হাজার হাজার নতুন করদাতা করজালের আওতায় চলে এসেছে। আবার পাকিস্তানের কিছু প্রদেশে প্রভিনসিয়াল ল্যান্ড রেভিনিউর পাশাপাশি কৃষি আয়ের ওপর কর আদায়ের দায়িত্ব সরাসরি ডেপুটি কমিশনার এবং তার অধীনস্থ রাজস্ব কর্মকর্তাদের (তফসিলদার) ওপর ন্যস্ত। এ সমন্বিত ব্যবস্থার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকেও বড় অংকের রাজস্ব আহরণ সম্ভব হচ্ছে।

নয়. শ্রীলংকার ‘‌ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারি’ ও মাঠ পর্যায়ের কর নেটওয়ার্ক: শ্রীলংকায় আমাদের জেলা প্রশাসকের সমকক্ষ পদটিকে বলা হয় ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারি বা গভর্মেন্ট এজেন্ট। শ্রীলংকার রাজস্ব বিভাগ সরাসরি কর আদায় করলেও মাঠ পর্যায়ে করের ভিত্তি শক্ত করতে ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারিরা প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। শ্রীলংকার অর্থনীতিতে পর্যটন এবং স্থানীয় হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের একটি বড় অবদান রয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারিরা তাদের অধীনস্থ ‘‌ডিভিশনাল সেক্রেটারি’ (যা আমাদের দেশের ইউএনও পদের সমকক্ষ) এবং তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ‘‌গ্রাম নিলধারী’দের মাধ্যমে গ্রামীণ ও আধা-শহর অঞ্চলের নতুন নতুন বাণিজ্যিক উদ্যোগের ডেটাবেজ তৈরি করেন। এ ডেটাবেজ সরাসরি কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে শেয়ার করা হয়, যা নতুন করদাতা চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। এছাড়া শ্রীলংকার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের পর করের পরিধি বাড়ানো রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারিরা জেলা সচিবালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় রাজস্ব বিভাগের সহায়তায় বিশেষ ‘‌হেল্প ডেস্ক’ বা কর তথ্য কেন্দ্র চালু করেছেন, যাতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সহজেই কর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

দশ. নেপালের ‘‌চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার’ ও রাজস্ব চুরিরোধ: নেপালের মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার পদবি হলো চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (সিডিও)। নেপালে জেলা পর্যায়ে সরাসরি কর আদায় জন্য ‘‌ইনল্যান্ড রেভিনিউ অফিস’ (আইআরও) থাকলেও চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসারদের প্রশাসনিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ক্ষমতা ছাড়া সেখানে রাজস্ব আদায় করা প্রায় অসম্ভব। নেপালের সঙ্গে ভারত ও চীনের উন্মুক্ত ও পাহাড়ি সীমান্ত রয়েছে, যা দিয়ে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে পণ্য প্রবেশ করে। নেপালের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসাররা জেলা পর্যায়ে শুল্ক কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে চোরাচালান ও কর ফাঁকি রোধে সরাসরি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেন। নেপালের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকি দিলে বা ভ্যাট ও প্যান (পার্মানেন্ট অ্যাকাউন্ট নাম্বার-পিএএন) নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করলে, ইনল্যান্ড রেভিনিউ অফিসের অনুরোধে চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার সেই প্রতিষ্ঠান সিলগালা (লকডাউন) করা বা সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার মতো কঠোর প্রশাসনিক আদেশ জারি করতে পারেন। এছাড়া নেপালের জেলাগুলোতে নদী থেকে বালি-পাথর উত্তোলন বা বনায়ন খাত থেকে যে বিশাল রাজস্ব আসে, তার তদারকি এবং লিজের প্রক্রিয়াটি চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসারদের কার্যালয়ের সরাসরি নজরদারিতে সম্পন্ন হয়, যা স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের একটি বড় উৎস।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর কৌশল: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তাদের করের আওতা বা কর জাল সম্প্রসারণে মাঠ প্রশাসন তথা আমাদের দেশের ‘‌জেলা প্রশাসন’ বা ‘‌স্থানীয় সরকার’ কাঠামোর সমকক্ষ প্রশাসনিক স্তরকে অত্যন্ত অভিনব উপায়ে কাজে লাগিয়েছে। এসব দেশে কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ডের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের আঞ্চলিক গভর্নরদের বা ডিস্ট্রিক্ট অফিসারদের রাজস্ব আদায়ের সুনির্দিষ্ট আইনি ক্ষমতা ও পারফরম্যান্স সূচক বা কেপিআই দেয়া হয়েছে।

এগারো. থাইল্যান্ড: স্থানীয় প্রশাসনকে রাজস্বের অংশীদারত্ব প্রদান: থাইল্যান্ড তাদের জেলা প্রশাসনকে করের জাল বাড়াতে কাজে লাগিয়েছে মূলত আর্থিক প্রণোদনা ও অংশীদারত্ব মডেলের মাধ্যমে। থাইল্যান্ডের ‘‌ডিসেন্ট্রালাইজেশন অ্যাক্ট’ (বিকেন্দ্রীকরণ আইন) অনুযায়ী, স্থানীয় জেলা প্রশাসকরা তাদের এলাকায় যত বেশি নতুন করদাতা শনাক্ত করতে পারবেন এবং কর আদায় বাড়াতে পারবেন, সেই সংগৃহীত করের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ) সরাসরি ওই জেলার উন্নয়ন তহবিলে যুক্ত হয়। থাইল্যান্ডের গ্রামীণ বা আধা-শহুরে এলাকায় প্রচুর অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা ছিল যারা করের আওতার বাইরে ছিল। থাই সরকার জেলাপ্রধানদের (নাই আমফো) মাধ্যমে ‘স্মার্ট ডিসট্রিক্ট’ উদ্যোগ নেয়। জেলা প্রশাসকরা স্থানীয় বাণিজ্য লাইসেন্স ইস্যু করার প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করেন এবং এর সঙ্গে ট্যাক্স আইডি বা টিআইএন (ট্যাক্সপেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) বাধ্যতামূলক করেন। যেহেতু এ করের টাকা জেলার নিজেদের রাস্তাঘাট ও স্কুলের উন্নয়নে ব্যয় হয়, তাই জেলা প্রশাসকরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করে দ্রুত করের জালে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।

বারো. ইন্দোনেশিয়া: ওয়ান-স্টপ ট্যাক্স ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট: ইন্দোনেশিয়া তাদের বিশাল ও ছড়ানো ছিটানো দ্বীপাঞ্চলে কর ফাঁকি রোধে এবং নতুন করদাতা তৈরিতে জেলা বা আঞ্চলিক প্রশাসনকে প্রযুক্তিগত ও আইনি ক্ষমতা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় ‘সামসাত’ (জয়েন্ট সার্ভিসেস অফিস) নামে একটি ওয়ান-স্টপ মডেল রয়েছে, যেখানে জেলা প্রশাসন, আঞ্চলিক পুলিশ এবং প্রাদেশিক রাজস্ব বিভাগ যৌথভাবে কাজ করে। ইন্দোনেশিয়ায় ভূমি কর (পিবিবি) এবং মোটরযান কর আদায়ের মূল দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। জেলা প্রশাসকরা (বুপাতি) তাদের অধীনস্থ ইউনিয়ন বা গ্রামপ্রধানদের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়ি এবং জমির মালিকানার ডিজিটাল ম্যাপিং (জিআইএস ম্যাপিং) করেন। কোনো নাগরিক জেলা প্রশাসন থেকে কোনো নাগরিক সুবিধা (যেমন: ব্যবসার অনুমতি, ভূমি নামজারি বা অনুদান) নিতে গেলে তার ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে লাখ লাখ লুকানো সম্পত্তি এবং ব্যবসা করজালের আওতায় চলে আসে।

তেরো. মালয়েশিয়া: ‘‌ডিস্ট্রিক্ট অফিসার’দের মাধ্যমে ডেটা ইন্টিগ্রেশন ও কর সচেতনতা: মালয়েশিয়া তাদের করের ভিত্তি বাড়াতে জেলা প্রশাসকদের মূলত ‘তথ্য সমন্বয়কারী ও এনফোর্সমেন্ট অফিসার’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বোর্ড (আইআরবিএম) সরাসরি জেলা প্রশাসনের স্থানীয় ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত। জেলা প্রশাসকরা তাদের এলাকায় নতুন কোনো বাণিজ্যিক ভবন, রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট বা বড় ব্যবসার লাইসেন্স দিলে সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেন্ট্রাল ট্যাক্স সার্ভারে চলে যায়। মালয়েশিয়ায় কৃষি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে করের আওতায় আনতে জেলা প্রশাসকরা বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির মতো উদ্যোগ নেন। ডিস্ট্রিক্ট অফিসাররা প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সরকারি ঋণ বা প্রণোদনা দেয়ার শর্ত হিসেবে তাদের করের আওতায় আনেন। এছাড়া জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায়ে ‘ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স সেল’ গঠন করা হয়, যা কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ফাঁকি দেয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এ সফল রাজস্ব মডেলগুলো থেকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে করের পরিধি বাড়াতে আমাদের জেলা প্রশাসকরাও এ কৌশলগুলো সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। প্রথমত, জেলা প্রশাসন থেকে প্রদত্ত যেকোনো বড় সেবা যেমন লাইসেন্স, নামজারি বা পারমিট নেয়ার ক্ষেত্রে ট্যাক্স রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জেলা প্রশাসকদের সরাসরি নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায় তথা উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক ব্যবসা ও সম্পদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ বা ডেটা ম্যাপিং তৈরি করতে হবে। চূড়ান্তভাবে যে জেলা তার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত কর আদায় করতে সক্ষম হবে, সেই সংগৃহীত করের একটি নির্দিষ্ট অংশ আইনি প্রক্রিয়ায় ওই জেলার নিজস্ব উন্নয়নে ব্যয়ের সুযোগ দেয়া উচিত। একই সঙ্গে কর আদায়ের এ সাফল্যকে জেলা প্রশাসকদের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) এবং বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) অন্যতম প্রধান পারফরম্যান্স সূচক বা কেপিআই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের দারুণ উদ্দীপনা তৈরি হবে।

পরিশেষে বলা যায় যে প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থাপনার বাইরে জেলা প্রশাসকদের সরাসরি ট্যাক্স ধার্য করার আইনি ক্ষমতা না থাকলেও উপমহাদেশীয় সফল অভিজ্ঞতা এবং আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তাদের ‘প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রভাব (অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ লেভারেজ)’ করের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যদি জেলা প্রশাসনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করে জেলাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়, তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

শামীম আল মামুন: প্রজাতন্ত্রের সাবেক কর্মচারী এবং লোকপ্রশাসনের অধীতী

আরও