অভিমত

যেভাবে বাংলাদেশে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়

সম্প্রতি ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ইউএমসিএইচ) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।

সম্প্রতি ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ইউএমসিএইচ) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। ইউনাইটেড গ্রুপের এ অত্যাধুনিক প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে এক সাহসী পদক্ষেপ। পুরো অবকাঠামো, সুবিধাদি, পরিচ্ছন্নতা ও নান্দনিকতার চেয়েও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তা হলো হাসপাতালের নৈতিক প্রতিশ্রুতি; কোনো রোগী অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না। ইউএমসিএইচ তাদের দ্বিস্তর (two tier) ব্যবস্থা—যেখানে অর্থ দিতে সক্ষমদের কাছ থেকে যথাযথ ফি নেয়া হবে এবং নিম্নবিত্তদের চিকিৎসা ভর্তুকিতে দেয়া হবে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগের পরিবর্তে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করছে। তবে এ উদ্বোধন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ ও বিপুল সম্ভাবনার দিকটিও সামনে এনেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই নানা সমস্যা ও অদক্ষতায় ভুগছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সরকারি হাসপাতালগুলো জনাকীর্ণ, অপ্রতুল অর্থায়নপ্রাপ্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও মানবিক সংবেদনশীলতার অভাবে জর্জরিত। এসব প্রতিষ্ঠানে অবহেলা, রোগীদের প্রতি অমানবিক আচরণের মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে যা জনগণের আস্থার অভাব সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত যদিও তুলনামূলকভাবে উন্নত। কিন্তু এটি অধিক বাণিজ্যিকীকরণ দ্বারা প্রভাবিত। এখানে ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা হওয়ায় তা বেশির ভাগ মানুষের নাগালের বাইরে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অতিরিক্ত বিল ও মুনাফাকেন্দ্রিক চিকিৎসার অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়, যা দেশীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতি আরো অবিশ্বাস তৈরি করেছে।

ফলে অনেকেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়াকে একমাত্র উপায় মনে করেন। ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো বাংলাদেশীদের কাছে উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং সেবায় পেশাদারত্ব—এসব কারণ মানুষকে বিদেশমুখী করছে। উদাহরণস্বরূপ ভারতে হার্ট অপারেশন ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ডলার, যা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় স্বল্প খরচে উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে। ২০২২ সালে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশী চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। এতে প্রায় চিকিৎসা বাবদ ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। এ স্বাস্থ্য পর্যটনের প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাকেই প্রতিফলিত করে না, বরং এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বড় প্রভাব ফেলে।

প্রভাবশালী ও ধনী শ্রেণীতে দেশীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এ দুর্বলতাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। তারা প্রায়ই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজেও বিদেশে যান। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা ও দায়বদ্ধতার অভাব এক ধরনের নেতিবাচক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। যারা দেশীয় স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ঘটাতে ভূমিকা নিতে পারতেন তারাই দেশীয় স্বাস্থ্যসেবার প্রতি উদাসীন।

এ সংকট স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও চিকিৎসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা খাত গভীরভাবে রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতির শিকার। মেডিকেল কলেজগুলোর প্রশাসন, চিকিৎসকদের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং চিকিৎসা পেশার তত্ত্বাবধান দুর্নীতির দ্বারা প্রভাবিত। মেডিকেল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে মেধার পরিবর্তে ঘুস বা রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ আছে, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের গুণগত মান ক্ষুণ্ন করে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা অযোগ্য ব্যক্তিদের পেশায় প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

এ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই ইউএমসিএইচ এক নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে। আধুনিক অবকাঠামো এবং লক্ষ্যভিত্তিক নৈতিকতার সমন্বয়ে এ হাসপাতাল দৃষ্টান্তমূলক প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করছে যে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা জনসাধারণের কল্যাণে কাজ করতে পারে। আর্থিক স্থায়িত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে ইউএমসিএইচ প্রমাণ করতে পারে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চ মানের চিকিৎসা একই সঙ্গে সম্ভব।

নতুন বাংলাদেশ (আগস্ট, ২০২৪-পরবর্তী সময়) স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনের একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। সবার জন্য সাশ্রয়ী এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিও। এজন্য সরকারি হাসপাতালগুলো আধুনিকায়ন, গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সিস্টেমের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ রকম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এ ফাঁকগুলো পূরণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষত যদি সরকার উদ্ভাবন ও মানোন্নয়নকে উৎসাহিত করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেলগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়।

ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাফল্য থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ভারতের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প ৫০০ মিলিয়ন মানুষকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় এনেছে, যা আর্থিক সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা বাড়িয়েছে। তেমনই থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার প্রোগ্রাম নাগরিকদের ব্যয় কমিয়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করেছে। বাংলাদেশ এমন নীতি গ্রহণ করতে পারে যা জনসাধারণ ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করবে এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য হবে।

চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ইউএমসিএইচের মতো প্রতিষ্ঠান, যারা আধুনিক প্রযুক্তি এবং শক্ত নৈতিক ভিত্তির সমন্বয় ঘটানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করছে, তারা দক্ষ এবং লক্ষ্যমুখী নতুন প্রজন্মের চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে। সরকারেও উচিত চিকিৎসা পেশার লাইসেন্সিং এবং স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা, যাতে যোগ্যরাই এ পেশায় প্রবেশ করতে পারে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হয়।

রূপান্তরের সম্ভাবনা বিশাল, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইউএমসিএইচ মডেল দেশের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুপ্রাণিত করতে পারবে কিনা এবং সরকার এমন উদ্যোগগুলো প্রাসঙ্গিকভাবে উৎসাহিত করবে কিনা তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। যদি এটি সফল হয় এবং অন্যরাও এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে, তবে এ মডেল স্বাস্থ্য পর্যটনের প্রবণতা কমিয়ে এনে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে এবং সাশ্রয়ী ও উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা প্রদানে সাহায্য করবে। এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, বিশেষ করে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনে কিছু বৈপ্লবিক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিদেশে চিকিৎসাসেবা নেয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে। যেমন জননির্বাচিত প্রতিনিধিদের (প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য) বাংলাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে হবে এবং তারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবার নেয়ার অনুমতি পাবেন না। অর্থাৎ তাদের প্রয়োজনীয় প্রমাণ দিতে হবে যে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেশে নেই। একই সঙ্গে যেসব সংসদ সদস্য যে এলাকা থেকে নির্বাচিত সেই এলাকার ‘সরকারি হাসপাতাল’ থেকে তারা চিকিৎসা নেবেন, যেখানে সাধারণ জনগণ চিকিৎসা নিয়ে থাকে বা নিতে হয়। সেখান থেকে যদি প্রয়োজনে সুপারিশ করা হয় যে স্থানীয় এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থার অনুমোদন মিলতে পারে। একইভাবে নির্বাহী প্রশাসনের ক্ষেত্রেও তাদের মূলত বিভিন্ন পর্যায়ে (থানা, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ইত্যাদি) স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে, যদি না বিকল্পের জন্য প্রাসঙ্গিক চিকিৎসকদের সুপারিশ মেলে। অবশ্য এটার আগে দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন, তা না হলে কাগজে-কলমে পয়সার মাধ্যমে যদি সুপারিশ সম্ভব হয়, তাহলে এ সংস্কার প্রক্রিয়া কার্যকরী হবে না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা দেশের সামগ্রিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থার একটি অংশ মাত্র। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত আরো বৈপ্লবিক হতে পারে, যদি অন্তত এক দশকের জন্য, বিশেষ করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সরকারি প্রশাসনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। সামগ্রিক সংস্কারের অংশ হিসেবে এ রকম সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিটি পর্যায়ে সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হতে পারে।

ইউএমসিএইচ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে পাওয়া স্পষ্ট শিক্ষা: দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি প্রতিশ্রুতি অর্থবহ পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। যদি এ পদ্ধতি আরো বৃহৎ পরিসরে গ্রহণ করা হয়, অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত অন্যরাও এগিয়ে আসে এবং প্রাসঙ্গিক সরকারি/জাতীয় নীতিমালা ও প্রণোদনা থাকে, তবে এটি একটি স্বাস্থ্যসেবা বিপ্লবের সূচনা হতে পারে, যেখানে কোনো বাংলাদেশী আর্থিক অভাবের কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না এবং দেশেই সবাই সুস্বাস্থ্যসেবা পাবে। সমতাভিত্তিক ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করতে হলে পরিকল্পিত প্রচেষ্টা এবং সামগ্রিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এ রকম স্বপ্ন যদি সত্যিই বাস্তবায়ন হয়, তাহলে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী হয়তো নাখোশ হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি দেশের দায়িত্ব রয়েছে সর্বাগ্রে নিজেদের জনগণের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি।

ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

আরও