আলোকপাত

কেন বারবার এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে সরকার

সম্প্রতি বিএনপি সরকার বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণকে আরো তিন বছর পেছানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানিয়েছে।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশাধিকার প্রতিযোগীদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রাখা ও নানা ‘সফট লোন’ (সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা) পাওয়ার জন্যই এমন প্রয়াস নিয়েছে। কিন্তু এমন দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করা যায় না। কারণ এর আগে ২০১৮-২৬ সাল পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের পর্যাপ্ত সুযোগ দেশের কোনো সরকার কিংবা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নেয়নি। ২০১৮ সালেই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইউনেস্কোসোক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিপিডি) সরকারকে আনুষ্ঠানিক একটি পত্র দেয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণে নির্ধারিত তিন ধরনের শর্ত পূরণ করেছে। ফলে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পর্ব শুরু হলো। ওই কমিটি পরবর্তী ছয় বছর এ উত্তরণ পর্বে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা ছিল। তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রযোজ্য শর্তগুলোও মেনে নেয়ার কথা। কিন্তু সরকারের অনুরোধে ২০২৪ সালের পরিবর্তে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেছিল জাতিসংঘ। এখন আরো তিন বছর স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা বহাল রাখতে চায় বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় বিষয়টির মীমাংসা হবে।

১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তলাবিহীন আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি হতে চলেছে। ড. কিসিঞ্জারকে ওই হতাশাজনক ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য দোষ দেয়া যাবে না। কারণ স্বাধীন দেশ হিসেবে যাত্রা শুরুর পর্যায়ে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য বছরে যে দেড় কোটি টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হতো তার মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন উৎপাদন করার সামর্থ্য ছিল আমাদের। বাকি ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য বিশ্বের কাছে ভিক্ষা চাইতে হতো, কারণ ওই ঘাটতি খাদ্যশস্য আমদানি করার সামর্থ্যও ছিল না আমাদের। ১৯৭২ সালে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। প্রধান রফতানি পণ্য পাট ও পাটজাত দ্রব্যের আন্তর্জাতিক বাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। ফলে দেশের যৎসামান্য রফতানি আয় দিয়ে আমদানি ব্যয়ের ৩০ শতাংশও মেটানো যেত না। এরপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক তেল সংকট শুরু হলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট বেসামাল পর্যায়ে চলে গেল। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং দাতাদেশ ও সংস্থাগুলোর পছন্দসই সরকার ছিল না তাই মহাসংকটের সময় বাংলাদেশ যথেষ্ট পরিমাণ সহযোগিতা পায়নি। ১৯৭৩ সাল থেকে দেশে ক্রমবর্ধমান হারে দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন শুরু হলেও বঙ্গবন্ধু তার দলের দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মী, শ্রমিক নেতা, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানাগুলোর প্রশাসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেননি।

১৯৭৪ সালে মার্কিন ষড়যন্ত্রে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষে প্রায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারান বলে ধারণা করা হয়। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের ক্যাটাগরির প্রচলন করেছিল। জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে অনেকগুলো সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার কোনো দেশকে সাধারণত ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ছিল না। কিন্তু ওই সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সুবিধাগুলো পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য বিবেচিত হয়েছিল। এটাও অবশ্য বলা প্রয়োজন যে বিশ্বের ‘মিসকিনদের ক্লাব’ কিংবা ‘ভিক্ষুকদের ক্লাব’ হিসেবে পরিচিত ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হতে অনেক দেশ কখনই রাজি হয়নি। ঘানা, ভিয়েতনাম ও জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় থাকার পরও তারা এ তালিকায় নাম লেখায়নি। ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্তির পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী চরম সংকটজনক অর্থনৈতিক অবস্থা কাটিয়ে ওঠার পর এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ এ অবমাননাকর স্বল্পোন্নত দেশের পরিচয় ঝেরে ফেলে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে উত্তরণে সক্ষম হবে।

কিন্তু কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ আবারো সহযোগিতা ও ঋণ নেয়ার চরিত্রকে আকড়ে ধরে। প্রকৃতপক্ষে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে নানা ধরনের রিলিফ, সাহায্য, বৈদেশিক অনুদান এবং স্বল্প-সুদের ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাওয়াতে বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলোর কাছে স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণকে আর তেমন আকর্ষণীয় বিষয় মনে হয়নি বলা চলে। জিয়াউর রহমান যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও চীনের খুবই পছন্দসই শাসক হিসেবে বিবেচিত হতেন তাই তিনি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে বৈদেশিক অনুদান এবং সফ্ট ঋণের বান ডেকেছিল। প্রফেসর রেহমান সোবহানের বিশ্বখ্যাত ‘দ্য ক্রাইসিস অব এক্সটারলান ডিপেন্ডেন্স’ শীর্ষক বইয়ের নবম পৃষ্ঠার সারণীতে দাবি করা হয়েছে যে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈদেশিক অনুদান ও ঋণপ্রবাহ ক্রমে বাড়তে বাড়তে ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাত হিসেবে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৈদেশিক সহায়তা-নির্ভরতার নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামল থেকেই বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থাকে ‘চৌর্যতন্ত্র’ আখ্যায়িত করা হয়। বিশ্বখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দি ইকনমিস্ট’ প্রথম এ অভিধাটি ব্যবহার করেছিল। এ চৌর্যতন্ত্র শক্তিশালী হতে হতে ২০০১-০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ’ অর্জন করে। ১৯৯১ সালে নির্বাচনী গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়েই এ লজ্জাজনক চ্যাম্পিয়নশিপ জুটেছে বাংলাদেশের কপালে। ২০০১ সালে একবার আওয়ামী লীগের আমলে এবং ২০০২-০৫ সালে চারবার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। অতএব নির্বাচনী গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হলেও বিএনপি-জামায়াত এবং আওয়ামী লীগ যে দুর্নীতি দমনে মোটেও আগ্রহী নয় সেটাই ৩৫ বছর ধরে বাংলাদেশের দুঃখজনক বাস্তবতা রয়ে গেছে বলা যায়। বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে এখনো সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচার।

বাংলাদেশের জনগণ মাতৃভূমির এ লজ্জাজনক পরিচয় মুছে ফেলার জন্য দেশ-বিদেশে জীবনপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এবং তারই ফলে ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের শর্তপূরণ। বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি ২০২৫ সালের জুনে ২ হাজার ৯১০ ডলারে পৌঁছে গেছে, যা পাকিস্তানের চাইতে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী এটি ভারতের চাইতেও বেশি। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান বাংলাদেশের মোট জিডিপির এক শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশ এখন আর খাদ্য-সাহায্যের জন্য লালায়িত নয়। বাংলাদেশের রফতানি আয় এবং প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দিয়ে বাংলাদেশ সহজেই খাদ্য আমদানিসহ যাবতীয় আমদানি-ব্যয় মেটাতে পারছে, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমবর্ধমান। তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি এখনো দেশের এক নম্বর সমস্যা রয়ে গেছে। প্রাথমিক জ্বালানি ও ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়ে গেছে। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের উৎখাতের পর এখনো দেশে স্থিতিশীল রাজনীতি ফিরে আসেনি। খেলাপি ঋণ সমস্যা, পুঁজি পাচার এবং আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। ন্যায়বিচারভিত্তিক উন্নয়ন অর্জন করতে চাইলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আয় পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। টেকসই অর্থনীতির পথে অগ্রযাত্রায় দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু চারটি গোষ্ঠী: দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদ, মার্জিনখোর ও মুনাফাবাজ ব্যবসায়ী-ঠিকাদার, ঋণখেলাপি এবং বিদেশে পুঁজি পাচারকারী। এসব গোষ্ঠী এখনো দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে করতলগত করে রেখেছে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটলে এসব গোষ্ঠীর অনেক সুবিধা হয়তো থাকবে না, স্বল্পোন্নত দেশের অনেক সুবিধাও খর্ব হয়ে যাবে সন্দেহ নেই। কিন্তু ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো প্রমাণ করে চলেছে, যথোপযুক্ত ব্যবস্থা যথাসময়ে নেয়া হলে দেশের সম্ভাব্য ক্ষতিগুলো পূরণে খুব বেশি অসুবিধে হয় না।

ভিয়েতনাম ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু করেছে। তখন ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়েও কম ছিল। এতৎসত্ত্বেও ভিয়েতনাম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেনি। ১৯৮৬ সালে ‘দোই মোই’ সংস্কার কার্যক্রম নেয়ার পথ ধরে ভিয়েতনাম দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনে সফল হয়ে চলেছে। এখন ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তাদের বার্ষিক রফতানি আয় ৪০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বিভিন্ন দেশে তাদের পণ্য রফতানি নির্বিঘ্ন করার জন্য তারা একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করে চলেছে। আমরা কি ভিয়েতনাম থেকে শিক্ষা নিতে পারি না? আমরা কেন বারবার স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণকে পিছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে চলেছি?

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি; একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও