বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছিল সমবায় সমিতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, তাদের জবাবদিহিতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য। তবে বেশ কয়েকটি আইনি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ সমবায়গুলোকে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে বাধা দেয়। আজকের সংলাপে সমবায় সমিতি আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মূল ক্ষেত্রগুলোর রূপরেখা দেয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট:
- দেশের কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে ৯১ দশমিক ৭ ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার। যার সংখ্যা ১ কোটি ৫৫ লাখ। (প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে অংশীদারত্ব এবং বাজেট ভবনা ২০২২, আবুল বারকাত, সোহরাওয়ার্দী এবং ইসলাম)।
- কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারগুলোই বিশ্বের ৭০-৮০ ভাগ কৃষিজমি আবাদ করে এবং বিশ্বের মোট ৮০ শতাংশের অধিক খাদ্যের জোগান দেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ও গৃহীত পদক্ষেপ তাদের অনুকূলে থাকে না। (এফএওর তথ্য অনুযায়ী)
- বাংলাদেশের মোট গ্রামীণ পরিবারের ৫৬ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন (International Food Policy research Institute 2024)
- গ্রামীণ নারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৬৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। যারা কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। আবার এর মধ্যে ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী কৃষিতে শ্রম দেন। (জনশুমারি ২০২২)
- কৃষি-ভূমি-জলার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের সংখ্যা ১৪ কোটি ৬ লাখ। যারা মোট জনসংখ্যার ৮২ দশমিক ৭০ শতাংশ। (প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে অংশীদারত্ব এবং বাজেট ভাবনা ২০২৩, আবুল বারকাত)
- বর্গাচাষ অথবা অর্থের বিনিময় অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৬৮ লাখ, যা মোট পরিবারের ১৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ
- সমবায় সমিতি আইন ২০০১ প্রথমে ২০০২ সালে ও পরে ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়। মূলত সমবায় সমিতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের জবাবদিহিতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছিল।
- সমবায় সমিতিগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ বিদ্যমান সমবায় সমিতি আইন ২০১৩। সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন ২০১৩কে একটি আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার আইন করে রাখা হয়েছে।
- যদিও বাংলাদেশে সমবায়ের সফলতার দৃষ্টান্ত হিসেবে কুমিল্লা বার্ড আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ষাটের দশকে একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. আখতার হামিদ খানের নেতৃত্বে নিবেদিতপ্রাণ কিছু গবেষক গ্রামীণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে এ দেশে পল্লী উন্নয়নের উপযোগী কিছু মডেল কর্মসূচি সফলভাবে পরিচালনা করেছেন।
সমবায় আন্দোলনের লক্ষ্য:
- উৎপাদনক্ষম মানুষকে সংঘবদ্ধভাবে সৃষ্টিশীল, উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে শামিল করা
- দরিদ্র দুর্বল মানুষ—বিশেষত নারী, দরিদ্র কৃষক, ভূমিহীন, জেলে, আদিবাসীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়িত করা
- এসব শ্রেণী ও স্তরের মানুষ যাতে উন্নয়নের মূলধারায় কার্যকরভাবে ব্যাপকতর অবদান রাখতে পারে তা নিশ্চিত করা
- দেশের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রের বিকাশে দৃশ্যমান ও কার্যকরভাবে এসব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
সমবায় সমিতি আইন সংস্কারের যৌক্তিকতা:
আমাদের দেশে সমবায়ের অনেক সফলতার উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও সমবায় আন্দোলনকে তেমন আমলে নিতে আগ্রহী নন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন প্রচলিত সমবায় গঠন, তার নিবন্ধন, পরিচালনা ইত্যাদি সবই সমবায় কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে এটি আমলানির্ভর আইন হয়েছে। ফলে সমবায় আন্দোলন কখনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠতে পারছে না। অন্যদিকে সমবায়গুলোর ভেতরে যে অনিয়ম-দুর্নীতি অতীতের দুর্নীতিবাজদের কুকর্মের সাক্ষী হয়ে বিরাজ করছে তার মূলোৎপাটনে প্রচলিত আইন তেমন কোনো সহায়ক ভূমিকা তো রাখছেই না, বরং তা যাতে আরো ফুলেফেঁপে ক্রমশ স্ফীত হতে পারে তারই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পদে পদে। নিবন্ধন থেকে পরিচালক, অডিট, নিয়ন্ত্রণ সবই কর্মকর্তাদের পছন্দমাফিক করতে হবে। সমবায়ীদের ইচ্ছের কোনো মূল্য নেই।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) জনগণের, বিশেষ করে প্রান্তিক, গ্রামীণ ভূমিহীন, ক্ষুদ্র চাষী ও নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আনয়নের লক্ষ্যে সমবায় আন্দোলন পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রচলিত সমবায় আন্দোলনের বাইরে গিয়ে জনতার সমবায় প্রতিষ্ঠার জন্য জনসমবায় ধারণাকে সামনে নিয়ে আসে এএলআরডি। জনসংগঠনকে জনসমবায়ে রূপান্তর করার উপায় হিসেবে ভূমিহীন ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক উন্নয়নে জনসমবায় দৃষ্টিভঙ্গির যাত্রা শুরু। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়, বিশেষ করে মুষ্টি চাল সঞ্চয়ের মাধ্যমে এ জনসমবায় দলের কার্যক্রম শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ১২টি জেলায় প্রসারিত হয়। বিন্দু বিন্দু সঞ্চয়ের মাধ্যমে যে মূলধন তৈরি হয় তাকে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ, জৈবকৃষি, অর্গানিক কৃষি, যৌথ উদ্যোগ ও যৌথ চাষাবাদের মাধ্যমে জনসমবায়ের সদস্যদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনয়নের লক্ষ্যেই এখন কাজ করছে ১১৯টি দল।
সমবায় আন্দোলন করেই রাতারাতি এর সুফল পাওয়া যাবে, বিষয়টি সে রকম নয়। যৌথভাবে উদ্যোগ নেয়া, যৌথভাবে সফল হওয়া, সেটার সুফল পাওয়া, সেটা সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান সমিতি আইন সে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষের জমি নেই। যতটুকু আছে তা বণ্টন করলে কৃষকরা খুব অল্প পরিমাণে পাবে। যা দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুদূরপরাহত একটি বিষয়। কৃষিকে টেকসই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে হলে সমবায়ের বিকল্প নেই। কিন্তু সমবায়ের নিয়ন্ত্রণ যদি প্রকৃত সমবায়ীদের হাতে না থাকে সমবায় আন্দোলন কখনো সফল হবে না। আর এজন্যই সমবায় আইনের সংশোধন হওয়া অত্যন্ত জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই আর বিলম্ব না করে অবশ্যই আমাদের কৃষি ও কৃষককে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে আমাদের উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে সমবায় অধিদপ্তরের সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নয়, বরং প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারে সে লক্ষ্যে সমবায় আইনের সংস্কার করা জরুরি।
সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো হলো—
- সমবায় সমিতি আইনের কিছু ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
- আইনের দ্বারা সরকারি নিয়ন্ত্রণ, হস্তক্ষেপ, নিবন্ধন জটিলতা, আইনের অপব্যবহার, দুর্বল আর্থিক তদারকি ও জবাবদিহির অভাবের কারণে সমবায় আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠতে পারছে না।
- সমবায়গুলোর অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমবায় গঠনে প্রতিবন্ধকতার ফলে সমবায়ের কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
- নিবন্ধন থেকে পরিচালক, অডিট, নিয়ন্ত্রণ সবই কর্মকর্তাদের পছন্দমাফিক হওয়ায় সমবায়ীদের ইচ্ছের কোনো প্রতিফলন নেই।
- কৃষিকে টেকসই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে হলে সমবায়ের বিকল্প নেই। কিন্তু সমবায়ের নিয়ন্ত্রণ যদি প্রকৃত সমবায়ীদের হাতে না থাকে তাহলে সমবায় আন্দোলন কখনো সফল হবে না।
- জাতীয় সমবায় নীতিমালা ২০১২-এর সঙ্গেও বর্তমান সমবায় সমিতি আইন ২০১৩ সাংঘর্ষিক।
সমবায় আইন সম্পর্কিত বিদ্যমান গবেষণা পর্যালোচনা:
সমবায় আইন সম্পর্কিত বিদ্যমান গবেষণা এবং স্টাডিগুলোয় সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমবায় সমিতির স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে। এএলআরডির মতো বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত গবেষণাগুলোয় দেখা যায় যে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আর্থিক স্বাধীনতার অভাবের কারণে সমবায় সমিতিগুলো প্রায়ই সংগ্রাম করে। আন্তর্জাতিক সমবায় আইনের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায় যে ভারত ও কেনিয়ার মতো দেশগুলোর সেরা দৃষ্টান্তগুলোকে বাংলাদেশের সমবায় সমিতি আইনের সংস্কার ও আইনি কাঠামো উন্নত করার জন্য অভিযোজিত করা যেতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রে যৌথ চাষাবাদ, যৌথ উদ্যোগ, সমবায় ভিত্তিতে ভূমিবণ্টন ও কৃষির জন্য ভূমি ব্যবহার, সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলন শুরু হয়। সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে সম্পদের তিন ধরনের মালিকানা—রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায় মালিকানা ও ব্যক্তিগত মালিকানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সমবায় মালিকানাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে যারা ক্ষমতায় এসেছেন তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সমবায় সমিতিগুলো সমবায় ভাবনার সেই মূল স্পিরিটকে ধরে রাখতে পারেনি। তার অন্যতম একটি প্রধান কারণ হচ্ছে আমলাদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব এবং সমাজের তথাকথিত উঁচু তলার দুর্নীতিবাজদের সমবায় সমিতিতে অনুপ্রবেশ। যা সমবায়ের প্রকৃত সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করেছে।
এ পর্যায়ে গবেষক ড. সীমা জামান ও ড. রিজওয়ানুল ইসলাম যৌথভাবে ‘Study on Reforming the Co-operative Societies Act for a More Self-Reliant and Functioning Co-operative Societies in Bangladesh. শিরোনামে স্টাডি উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশী সমবায় সমিতিগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে, যার মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমবায় সমিতি আইন।
এছাড়া দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. আবুল বারকাত Collective Farming and Initiative for Market Access of Grassroots Marginalized Communities Ganaprochesta Group শিরোনামে একটি গবেষণা উল্লেখ করা যেতে পারে। এএলআরডির জন্য এইচআরডিসি কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় ৫৬টি গণপ্রচেষ্টা গ্রুপ বা তৃণমূল কৃষিভিত্তিক সমবায়ের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের ভূমিকা মূল্যায়ন করা হয়েছে। ড. বারকাতের গবেষণায় যেসব মূল অনুসন্ধান পাওয়া যায় তা হলো: ১. অর্থনৈতিক প্রভাব: জমির মালিকানা, আয় ও খাদ্যনিরাপত্তায় সামান্য বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষণীয়, তাছাড়া ঋণ ও সঞ্চয়ের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২. সামাজিক প্রভাব: গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, নারীদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ৩. চ্যালেঞ্জ: বাজারে প্রবেশের অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সমবায় নিবন্ধনে জটিলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ উল্লেখযোগ্য।
এইচডিআরসি কর্তৃক পরিচালিত এএলআরডির গবেষণায় আমরা কিছু সুপারিশ পাই, যা কিনা সমবায় আন্দোলন গঠন, গণমুখী সমবায় তৈরি ও এর প্রসার এবং দেশের প্রচলিত আইন, নীতি ও বিধিমালা কীভাবে সমবায়ের বিকাশে বাধা তৈরি করছে তা পাওয়া যায়। তারা বলছেন—
- সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে নীতিগত নির্দেশনা দেয়া উচিত, যাতে যৌথ কৃষিকাজ এবং সমবায় বিপণন/যৌথ উদ্যোগের জন্য ন্যূনতম সুদের হারে জামানতমুক্ত ঋণের ন্যূনতম বাধ্যতামূলক বরাদ্দ (অন্তত ৩ শতাংশ) করা হয়।
- সরকারের উচিত বিদ্যমান দরিদ্র ও সমবায়বিরোধী আইন, নির্দেশনা ও বিধিমালা পরিবর্তনে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা গ্রহণ করা, যাতে সমবায় নিয়ন্ত্রণকারী আইনগুলো দরিদ্রবান্ধব, নারী এবং সমবায়বান্ধব হয়। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি ব্যাপকভাবে হ্রাস/নির্মূল করতে হবে।
- বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়নকে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সমবায় শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ের সমবায়গুলোকে প্রাণবন্ত করার প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধনের জন্য তার সক্ষমতা বাড়ানো উচিত।
সমবায় আইন ২০১৩-এর মূল বিষয়গুলো
সমবায় সমিতি আইন ২০০১ প্রথমে ২০০২ ও পরে ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়। কিন্তু বর্তমান সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন ২০১৩ একটি আমলাতান্ত্রিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি আইন করে রাখা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক আইনের বিশ্লেষণে নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধানাবলি অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে এখানে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো সমবায় সমিতি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চালানো যায় না। সমবায় সমিতির পরিচালনায় হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে। যেমন ধারা ১৮ (২) অনুযায়ী, যদি কোনো সমবায় সমিতিতে সরকারের ৫০ ভাগের বেশি মূলধন থাকে বা মোট ঋণ বা অগ্রিমের ৫০ শতাংশের অধিক সরকার দিয়ে থাকে বা সরকার যদি সমিতিকে দেয়া কোনো ঋণের জামিনদার হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে সরকার বা সমবায় নিবন্ধক ওই সমিতির ম্যানেজিং কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ মনোয়ন দেবে।
ড. সীমা জামান ও ড. মো. রিজওয়ানুল ইসলামের গবেষণায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পাওয়া যায়, যেখানে নিবন্ধন না পেলে দেওয়ানি আদালতে চ্যালেঞ্জের সুযোগ, কোনো অযোগ্য সমবায় সমিতিকে নিবন্ধন দেয়া হলে তা বাতিলের জন্য চ্যালেঞ্জ করা, স্বার্থ সংঘাত পরিহার ও অধিকতর পেশাদার সমবায় ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটির বিধান সংস্কার করা, সমবায় সমিতি সরকার মনোনীত সদস্যসংখ্যা সীমিত করা ইত্যাদি।
কৃষিভিত্তিক এ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামনের সারিতে এগিয়ে আসার একটি প্রধান অবলম্বন হচ্ছে সমবায়। এজন্য অবশ্যই গ্রামীণ ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষক, বর্গাচাষী, আদিবাসী, বনবাসী, জেলে শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর স্বার্থে সমবায়কে যথার্থ জনবান্ধব করার বিকল্প নেই।
অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং হস্তক্ষেপ:
সমবায় সমিতি আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে:
নিবন্ধন ব্যতীত ‘সমবায়’ শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ ইত্যাদি
- এ আইনের অধীন সমবায় সমিতি হিসাবে নিবন্ধিত না হইলে কোন ব্যক্তি, ব্যক্তি সংঘ, সংগঠন বা সমিতি উহার নামের অংশ হিসাবে সমবায় বা (cooperative) শব্দ ব্যবহার করিবে না।
- সমিতির নিবন্ধিত নাম ব্যতীত সমিতির সাইন বোর্ড, বিল বোর্ড বা প্রচারপত্রে অন্য কোনো নাম বা শব্দ ব্যবহার করা যাইবে না।
সমবায় একটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘ আন্দোলন। আন্দোলন করতে গেলে একটি চরম প্রত্যয় বা আকাঙ্ক্ষার প্রয়োজন হয়। আর সমবায় আন্দোলন করতে গেলে নিবন্ধন লাগবে আর তার ব্যত্যয় ঘটলে সাত বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে; তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, কার্যত সংবিধান পরিপন্থী।
নিবন্ধন ও আইনি প্রতিকারে চ্যালেঞ্জ:
- নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল এবং স্বাধীন তত্ত্বাবধান ছাড়াই আমলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
- সমবায় বিরোধের ওপর দেওয়ানি আদালতের সীমিত এখতিয়ার রয়েছে, যার ফলে সদস্যদের আইনি প্রতিকার খোঁজা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বার্থের সংঘাত সুরক্ষার অভাব:
- পরিচালনা কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত ব্যবসায় জড়িত হতে বাধা দেয়ার কোনো স্পষ্ট আইনি বিধান নেই, যা সমবায়ের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সমবায় সুবিধার অপব্যবহার:
- কিছু সমবায়কে মুনাফাভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা সমবায় উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।
দুর্বল আর্থিক তদারকি এবং জবাবদিহি:
- সমবায়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী নিরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যার ফলে দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা বৃদ্ধি পায়।
ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সীমিত সহায়তা:
আমাদের কৃষি ও কৃষককে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে আমাদের উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে সমবায় অধিদপ্তরের সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নয়, বরং প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারে সে লক্ষ্যে সমবায় আইনের সংস্কার করা জরুরি।
- আইন নারী ও আদিবাসী গোষ্ঠীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দ্বারা গঠিত সমবায়গুলোর জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা এবং প্রণোদনা প্রদান করে না।
সমবায় সমিতি আইন সংস্কারের সুপারিশ:
এএলআরডি বিভিন্ন সময় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মতবিনিময়, অ্যাডভোকেসি সভা, গোলটেবিল বৈঠকে সমবায় সমিতি আইন বিষয়ে আলোচনা করেছে। ২০২১ সালে দৈনিক বণিক বার্তা এবং ২০২৩ সালে দৈনিক কালবেলার সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠক, জনসমবায় দল, বিভিন্ন সমবায়ভিত্তিক সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা, সাংবাদিক, আইনজীবী ও গবেষকদের নিয়ে সমবায় আন্দোলন ও এর কার্যকারিতা নিয়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। সমবায় সমিতি আইনের গভীর পর্যালোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব ও সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, মতবিনিময় ও গোলটেবিল আলোচনা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশ:
১. সমবায় স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা:
- সমবায়ের জন্য একটি ‘স্বাধীন কমিশন’ গঠন করতে হবে।
- সমবায় অধিদপ্তরকে সমবায় নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নয় বরং সমবায় সমিতির জন্য সহায়কের ভূমিকায় থাকতে হবে।
- সমবায়ীদের নিয়ন্ত্রণই হবে সমবায় আইনের মূল উদ্দেশ্য।
- প্রচলিত সমবায় আইনটি আমলাতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক ও সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানের সঙ্গে সংগতি রেখে সমবায় আইনের পরিবর্তন করতে হবে।
২. নিবন্ধন সহজীকরণ এবং আইনি প্রতিকার শক্তিশালীকরণ:
- সমবায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং হস্তক্ষেপ কমাতে আইন সংশোধন করা।
- সমবায় সদস্য, নাগরিক সমাজ এবং আইন বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্বসহ একটি স্বাধীন সমবায় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা।
- স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমবায়গুলোকে নিবন্ধনের অনুমতি দিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং এটিকে আরো স্বচ্ছ করা।
- দেওয়ানি আদালতকে সমবায় বিরোধ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করার ক্ষমতা প্রদান করা।
৩. স্বার্থের সংঘাত বিধিমালা প্রবর্তন:
- পরিচালনা কমিটির সদস্যদের প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা পরিচালনা থেকে বিরত রাখতে আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা।
- সমবায় স্বার্থের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য কমিটির সদস্যদের জন্য কঠোর যোগ্যতার মানদণ্ড প্রবর্তন করা।
৪. সমবায় সুবিধার অপব্যবহার রোধ করা:
- সমবায় অনুদান এবং সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার রোধ করার জন্য পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন (মনিটরিং ও ইভালুয়েশন) ব্যবস্থা জোরদার করা।
- সমবায় আইনের অধীন নীতি ও বিধিমালা মেনে চলা নিশ্চিত করার জন্য সমবায়গুলোর নিয়মিত নিরীক্ষা পরিচালনা করা।
৫. আর্থিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা:
- সব নিবন্ধিত সমবায়ের জন্য বার্ষিক স্বাধীন নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
- সমবায় তহবিলের ব্যবহার পর্যালোচনা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য একটি সমবায় আর্থিক তদারকি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
- সমবায় আইনে প্রান্তিক মানুষের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। তার জন্য আইনের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে।
- সরকারি ঋণ বা অনুদান সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে প্রান্তিক সমবায়ীদের দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. প্রান্তিক, আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করা:
- নারীদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতের জন্য বাজারে নারীদের নিরাপত্তাসহ বিক্রয় ও বিপণন কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে।
- ক্ষুদ্র কৃষক, নারী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী দ্বারা গঠিত সমবায়গুলোর জন্য প্রণোদনা এবং নীতিগত সহায়তা প্রদান করা।
- প্রান্তিক সমবায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির জন্য কৃষি ব্যাংকের একটি ‘উইন্ডো বা জানালা’ খুলতে হবে।
- সমবায় সদস্যদের জন্য আর্থিক সাক্ষরতা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি চালু করা।
উপসংহার: বাংলাদেশে আরো গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর সমবায় আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সমবায় সমিতি আইন ২০১৩ (সংশোধিত) সংস্কার অপরিহার্য। সরকারি নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন জটিলতা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং প্রান্তিক, নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তার সমস্যাগুলো মোকাবেলা করে, বাংলাদেশ একটি সক্ষম পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে সমবায়গুলো স্বনির্ভর, সদস্য দ্বারা চালিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমৃদ্ধ হয়। এ পর্যালোচনা প্রতিবেদনটি সমবায় আইন সংস্কারের জন্য একটি অংশগ্রহণমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি প্রণয়নের জন্য নীতিনির্ধারক ও অংশীজনদের আহ্বান জানায়, যার ফলে প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীসহ সবার জন্য টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারবে।
শামসুল হুদা: নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
[দৈনিক বণিক বার্তা কার্যালয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এএলআরডি ও দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধ]