বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, আবুধাবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার গবেষণা ও পেশাগত আগ্রহের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শ্রমবাজার রূপান্তর, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং জননীতি। বাংলাদেশ থেকে শ্রমশক্তি রফতানির চ্যালেঞ্জ, দক্ষ ও সৃজনশীল কর্মী তৈরিতে শিক্ষা খাতের ভূমিকা এবং শিক্ষা অবকাঠামোর রূপান্তর নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু শ্রম রফতানির যে মডেলটি দেশে রয়েছে, সেটি কতটা টেকসই?
শ্রমশক্তি রফতানির দেশীয় মডেল নিয়ে ভাবার সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার। এখান থেকে যারা বিদেশ যান, তাদের স্বল্প দক্ষতা থাকায় বাজারের পরিসর থাকে ক্ষুদ্র এবং এ ক্ষুদ্র বাজারে অল্প বেতন পান। আবার বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় ও নিম্নমানের নিরাপত্তাও থাকে। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৬০টি দেশে মানুষ কাজের উদ্দেশ্যে যায়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশেই ৯০ শতাংশ মানুষ আয়ের উৎস খোঁজে। এ থেকেই বোঝা যায় আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর কতটা নির্ভরশীল। এজন্যই মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংকটকালে বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমাদের ওপর চাপ তৈরি হয়। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের কর্মশক্তিকে জাতীয়করণ করার চেষ্টা শুরু করেছে। এ বাদেও উৎপাদনজাত অর্থনীতির বদলে শিক্ষা ও সেবামূলক খাতগুলোয় মনোযোগ বাড়াচ্ছে। দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন এলে আমাদের শ্রমবাজারের উৎসের পাটাতনিক পরিবর্তন আসতে পারে। এদিকে দেশে জনসংখ্যা এত বেশি যে বিদেশে পাঠাতে পারলেই সুবিধা। সমস্যা হলো আমরা এক্ষেত্রে স্বল্প প্রত্যাশা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় নিজ নিজ শ্রমশক্তির বিষয়কে পরিচালনা করছি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিদেশ গমনে যে অর্থ খরচ করতে হয়, তার চেয়ে তুলনামূলক কম খরচে আমাদের মতো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মানুষ বিদেশ যাচ্ছে। এখানে বিদেশ যাওয়ার জন্য দালালের পেছনে খরচ করতে হয়। অনেকে বিদেশ যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করছেন কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন। এছাড়া অন্যান্য ফি আছে। এসব ব্যয় পরিশোধে ন্যূনতম ১৬-১৭ মাস সময় লাগে প্রবাসীদের। এভাবে আমরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থায় শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি পরিচালনা করছি।
আরেকটা বিষয় হলো বাংলাদেশী শ্রমিকদের দক্ষতা কম। ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার ট্রেইনিং তথ্য বলছে, প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে কেবল ৩ শতাংশ পেশাদার কাজগুলোয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। বিশ্ববাজারেও আমাদের বদনাম হয়ে গেছে যে আমরা সস্তা ও অদক্ষ শ্রম বিক্রি করি। শ্রমশক্তি রফতানির এ একমাত্রিক পথ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আরো সমস্যা আছে। কাঠামোবহির্ভূত অনেক কাজ এখানে হয়। এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে কোম্পানি খোলা অনেক সহজ। কিন্তু বাংলাদেশী ডায়াস্পোরাদের অনেকেই ভিসা বিক্রির ব্যবসায় নামছেন। আবার চুক্তি পরিবর্তনজনিত কিছু সমস্যাও তৈরি করা হয়। যেমন বিদেশ যাওয়ার আগে দেখা যায় কেউ এক ধরনের কাজের প্রস্তুতি নিয়ে চুক্তি করেছে। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার পর তারা ভিন্ন খাতের চাকরিতে যুক্ত হচ্ছেন। ইউরোপেও এমন চর্চা শুরু হয়েছে। এসব কারণে দক্ষতার অভাব বাড়ছে, আবার ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরে অনেকে কাজ হারাচ্ছেন।
এ জায়গা থেকে পেশাদার ও দক্ষ শ্রমিক বাড়ানোর জন্য কী করা যায়? দেশের শিক্ষা কাঠামো কি এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
আমাদের ভাষার দক্ষতাজনিত সমস্যা আছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সেবা খাতের ব্যবস্থাপনা পদে ভারতীয়, ফিলিপিনো, শ্রীলংকান কর্মীরা কাজ করছেন। বাংলাদেশীদের এ ধরনের পদে খুব একটা দেখা যায় না। এর অন্যতম কারণ ভাষাগত দুর্বলতা। প্রত্যেক দেশের নিজস্ব ভাষা আছে। তবে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজির প্রচলন থাকেই। আমাদের মৌলিক সংকট সামাজিক ও অনুভূতির যোগাযোগ দুটো ক্ষেত্রেই দুর্বলতা আছে। ভারত, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও ভিয়েতনামের ডায়াস্পোরার নেটওয়ার্কগুলো অনেক শক্তিশালী। তারা চাকরির বাজারে নিয়োগের প্রত্যেকটা ধাপে আছে। এ দেশগুলোর দূতাবাসও শক্তিশালী। বলা যায়, তাদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক সংঘ তৈরি হয়েছে, যা আমরা গড়তে পারিনি। এটি আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি ও নেতৃস্থানীয়দের পরিচালনার দুর্বলতা থেকে হচ্ছে। কাতারে চার-পাঁচ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক আছে। অথচ তাদের জন্য মাত্র একটি শ্রমিক কাউন্সিল। বাংলাদেশী দূতাবাসে গেলে লম্বা লাইনের ভোগান্তি। হটলাইন আছে, কিন্তু এ বিষয়ে শ্রমিকরা কিছু জানেন না। এসব বিষয়ে সচেতনতা ও স্বচ্ছ তথ্য প্রচার করা যাচ্ছে না। উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোয় এখন জ্ঞাননির্ভর সেবা সার্ভিস চালু করা হচ্ছে। তাই কারো যদি পর্যাপ্ত ধারণা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় এ শ্রমবাজারে বাংলাদেশীরা কীভাবে কাজ করবে প্রশ্নটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি দেশে জ্ঞাননির্ভর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছু আলাপ হচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রেণীকক্ষগুলোকে সিসিটিভির আওতায় আনা হবে। কিন্তু এগুলো উপরিকাঠামোর কাজ। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন এমন অবস্থায় যে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় পড়াশোনা ফাঁকি দেয়। কেন এমন করে সে কারণ খোঁজার দিকে নজর দিতে হবে। কেবল সিসিটিভি দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে না। শ্রেণীকক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছাড়া সিসিটিভি রাখা ঠিক নয়। কেননা সবসময় নজরদারিতে রয়েছে, এমন অনুভূতি দিলে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সামাজিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্বাভাবিক অনুভূতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। দিনশেষে আমরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিশু গড়ে তুলতে চাই, যারা জাতিকে সেবা দেবে। তাদের সম্মান দেয়ার শিক্ষা দিতে হলে তাদেরও সম্মান দিতে হবে। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষায় সূক্ষ্ম চিন্তার ঘাটতি রয়েছে। শিশুদের মধ্যে সহানুভূতি, কৌতুহল, সৃজনশীলতা—এ গুণগুলো বিকাশের চেষ্টা থাকতে হবে। প্রকল্পনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম, সামাজিক ও অনুভূতিশীল, দক্ষতানির্ভর শিক্ষা কারিকুলামে মনোযোগী হতে হবে। এজন্য শিক্ষা কারিকুলামকে বদলাতে হবে। দেশের শিক্ষা কারিকুলাম এখনো ১৯০ ও ১৯৫তম দেশের কারিকুলামের মতোই। বাংলাদেশী শ্রমশক্তিকে বিশ্ববাজারে ভারত, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরের মতো দেশের শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। আমাদের যদি প্রতিযোগিতায় টিকতে হয়, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেকসইভাবে বদলাতে হবে।
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মাথায় রেখে আমরা কীভাবে এগোতে পারি?
শ্রেণীকক্ষে আবার ফিরে যেতে হবে। শ্রেণীকক্ষের বাইরের অকৃতকার্যতা ভেতরের অকৃতকার্যতা থেকে অনেক ব্যয়বহুল। ক্লাসরুমে অকৃতকার্যতাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়া শিখতে হবে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। জিপিএ ফাইভের মোহ থেকে বেরুতে হবে। জিপিএ ফাইভ আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবন-জীবিকার গতিশীলতার ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখছে ভাবতে হবে। ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ খাতের কাজ যে একেবারে হারিয়ে যাবে এমন না। এসব কাজের চাহিদা সবসময় থাকবে। তবে এসব খুব সস্তা শ্রমের কাজ। দেশে জনশক্তির দক্ষতা খারাপ অবস্থায় আছে বলেই এ ধরনের কাজগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকেন বাংলাদেশীরা। তবে এ ধরনের কাজ সবাই করতে চায় না। সৌদি আরব ভিশন-২০৩০ নিয়ে কাজ করছে। এর আওতায় স্মার্ট সিটি, গ্রিন টেক, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে। আরবের মরু অঞ্চলগুলো আধুনিকায়নের কাজ হচ্ছে। সৌদি আরবে ২০৩৪ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ হবে। ফলে নির্মাণকাজ একেবারে হারিয়ে যাবে এমন নয়। কাতার এখন কৃষিপণ্যনির্ভর অনেক উদ্যোগ চালু করছে। কাতারি ফার্মে গেলে বাংলাদেশী দেখা যায়। তাই এমন কিছু শ্রমের চাহিদা থাকবেই। কিন্তু শিক্ষানির্ভর ভিত্তি তৈরি করতে গেলে একেবারে গোড়ায় যেতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব একই সঙ্গে পাবলিক-পাবলিক সহযোগী ও আমাদের সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে জনগণের সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে হবে। অনেক কাজকে আমরা অপ্রাতিষ্ঠানিক বানিয়ে রেখেছি। এগুলোর জন্য দালালরা সুযোগ পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ তাতে ভোগান্তিতে পড়ে কিন্তু বিষয়টা এখন আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিছুদিন আগে লিবিয়া থেকে নৌপথে ইতালি যাওয়ার পথে ২২ জন মারা গেছে। আমরা বৈধ পদ্ধতিগুলোকে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। আবার অবৈধ মানব পাচার ঠেকাতে যথাযথ কোনো আইনি উদ্যোগ নিতে পারছি না।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে আমাদের শ্রমবাজার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিকল্প কোন কোন দেশ ও অঞ্চল শ্রমশক্তি রফতানির জন্য সম্ভাবনাময়?
আমাদের দক্ষতায় যেমন বৈচিত্র্য আনা দরকার, তেমনি বাজারটাকেও বিস্তৃত করা দরকার। পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপে আমাদের শ্রমবাজার তৈরি হচ্ছে, শ্রমিকরা সেসব অঞ্চলে যাচ্ছেও। আমাদের বৈধ শ্রম রফতানির বিষয়টাও ভেঙে পড়েছে। কারণ এটা ভালোভাবে কার্যকর হচ্ছে না। যারা বৈধভাবে যায় চুক্তি দুর্বল হওয়ায় সেটা আর ভালোভাবে কাজ করে না। পর্তুগালে যে খামারভিত্তিক শ্রমবাজার আছে, সেখানে প্রচুর বাংলাদেশী কাজ করেন। ওখানকার পণ্য বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। এসব জায়গায় বাংলাদেশীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রচুর বাংলাদেশি এখন রোমানিয়া ও জাপানে যাচ্ছে। জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা সেবামূলক খাতে লোক চাচ্ছে। এসব জায়গায় দক্ষ লোক দরকার। এখানেও কিছু বাংলাদেশী আছেন।
নতুন নির্বাচিত সরকারকে শ্রম ইস্যুতে কী কী পরামর্শ দিতে চান?
মানব মর্যাদার বিষয়টা গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের শ্রমিকরা যেন বিদেশে মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার সন্ধান ও জীবনের নিরাপত্তা পান সেটায় গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে শ্রমবাজারের গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের শ্রমিকরা সেখানে কীভাবে নিজেদের উপস্থাপন করবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব বাংলাদেশে খুব একটা পড়বে না। কারণ বাংলাদেশ প্রযুক্তির দিক থেকে খুব একটা এগোতে পারেনি। যারা অগ্রসর রাষ্ট্র তাদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। আমাদের এ জায়গায় সৃষ্টিশীলতার দিকে মনোযোগী হতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে চলে, কীভাবে এটি থেকে ভালো কিছু আদায় করা যায়, এজন্য আমাদের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানোর মানসিকতা গড়ার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংকট ও সীমাবদ্ধতাগুলোও বুঝতে হবে। ক্রিটিক্যাল চিন্তায় আমরা যত এগোব, ততই এআইকে ভালো নির্দেশনা দিতে পারব। এ জায়গায় আমাদের জন্য সামাজিক ও অনুভূতিকেন্দ্রিক দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এআইয়ের মাধ্যমে হয়তো প্রযুক্তিগত ও গাণিতিক বিষয়গুলোর সূক্ষ্ম সমাধান মিলবে। কিন্তু জীবন-জীবিকার জন্য অন্য মানুষের সঙ্গে সামাজিক ও অনুভূতির সম্পর্কে জড়াতে হয়। এ জায়গায় এমন বিষয়গুলোয় মানুষকে সরাসরি জড়াতে হয়। ফলে সামাজিক সম্পর্ককেন্দ্রিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এজন্যই আমাদের সৃষ্টিশীলতা, সহানুভূতি ও কৌতূহলী বিভিন্ন দিকে নজর দিতে হবে।
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ১১ ধরনের এবং করোনা মহামারীর সময় আমরা ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার দেখেছি প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে। এর মাধ্যমে তারা ক্লাস করেছে। সবাই হয়তো করতে পারেনি। ফলে একটা সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট মোকাবেলার পথ কী? আমরা ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষার চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করব?
১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিভিন্ন দিক আছে। ফলে আমরা একটা বিভাজিত সমাজ তৈরি করছি। আমাদের মধ্যবিত্ত, নিম্ন আয়, উচ্চবিত্ত এসব শ্রেণী বাদেও আরো বহু বিভাজন আছে। ফলে সহজেই দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি। প্রাথমিক পর্যায়ে এমন বড় ধরনের বিভাজন আমাদের মধ্যে একটা যোগাযোগের সমন্বয়হীনতা তৈরি করে। জনপরিসরে মতামতগুলো অনেক রুক্ষ হয়ে পড়ছে। আমরা নিজেদের বেশি একাকিত্বের ভেতর নিয়ে যাচ্ছি। এজন্য অ্যালগরিদমও দায়ী। এখন আমরা যে ধরনের খবর ও মতামত চাই, সেগুলোই দেখাচ্ছে। ফলে আমরা একটা গণ্ডিতে আটকে পড়ছি। হেলে পড়ছি নির্দিষ্ট কোনো মতামতে। এ হেলে পড়াকে আবার সংবাদ দেখার কথা বলে বৈধতা দেয়া হচ্ছে। ফলে জনপরিসরে যোগাযোগের সেতু ভেঙে পড়ছে।
সব উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজধানীতেই রয়েছে। কিন্তু প্রান্তিক অঞ্চলে ভালো অবকাঠামোসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। এক্ষেত্রে আসলে আমাদের পদক্ষেপ কেমন হওয়া উচিত?
আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষা অবকাঠামোর আধুনিকায়নে যেতে হবে। দেশে শিক্ষকদের বেতন খুবই কম। এজন্য অনেক মেধাবী শিক্ষকতায় আগ্রহ পান না। মর্যাদা ও সুবিধা কম পাওয়ায় শিক্ষকদের নৈতিক অবস্থানও দুর্বল। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ হয় না। ফলে শিক্ষকতাটা পেশাদারত্বের ভেতর আসে না। যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন করা কঠিন। এজন্য এসব স্থানে শিক্ষকের বেতন বাড়ানো পেশাদার প্রশিক্ষণ ও তার সম্মান বাড়ানো জরুরি। ভালো ও দক্ষ শিক্ষক থাকলে ভালো শিক্ষার্থী তৈরি হবে। কাজটি কঠিন, তবে এটা করতে হবে। কাঠামোটাকে এভাবেই গড়ে তুলতে হবে। সিঙ্গাপুর সেই ১৯৬০ সালে দরিদ্র দেশ বলে পরিচিত ছিল। একই কথা মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও। তারা শিক্ষা খাতে কাঠামোগুলো উন্নত করেছে। বাংলাদেশও একসময় তাদের সমপর্যায়ের দেশ ছিল। আমাদের পরিবর্তনটা এখন ওপর পর্যায় থেকে হতে হবে। আমরা পড়াশোনার বিষয়ে আলাপ করলে একাডেমিক শিক্ষা নিয়ে আলাপ করি। এর বাইরে শিশুরা স্কুল থেকে যাওয়ার পর কী করে বা কার সঙ্গে মেশে এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা কাঠামোর পুরোটাই একটা ইকোসিস্টেম। পলিসি করলে পুরো ইকোসিস্টেম মাথায় রেখেই করতে হবে।