দেশে বেকারত্বের হার এখনো এক অংকে থাকলেও শিক্ষিত তরুণদের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ লাখ ১০ হাজারে এবং বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এ বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও দেশে বেকারত্ব পরিমাপের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত ১ ঘণ্টা মজুরি, বেতন বা পারিবারিক কাজে যুক্ত থাকলেই কেউ কর্মসংস্থানে রয়েছে বলে ধরা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করে কি জীবিকা নির্বাহ সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়। ফলে এ সংজ্ঞা বাস্তব চিত্র আড়াল করে এবং প্রকৃত বেকারত্বকে কম দেখায়।
সরকারি হিসাবে বেকারত্ব কম হলেও দেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে। গত আট বছরে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের কাঠামোতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে অনানুষ্ঠানিক কর্মীর সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ১৭ লাখ এবং আনুষ্ঠানিক কর্মীর সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ; ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার এবং ১ কোটি ১৩ লাখে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো শিক্ষিত বেকারত্বের দ্রুত বৃদ্ধি। গত আট বছরে বেকার স্নাতকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৮৫ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৮৫ হাজারে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি এবং এ বয়সী স্নাতকদের মধ্যে ১৭ শতাংশেরও বেশি দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে শিক্ষিত বেকারত্বের এ দ্রুত বৃদ্ধির জন্য দায়ী কে?
শিক্ষা খাতে স্থবিরতা ও শিল্প সংযুক্ততা তৈরি না হওয়ার জন্য পূর্ববর্তী সরকারের গাফিলতিকেই গুরুত্ব দিতে হয়। গত দুই দশকে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি, সুপরিকল্পিত কৌশল গ্রহণ করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বাজারমুখী প্রশিক্ষণ মডিউলও যথাযথভাবে সংযোজন করা হয়নি। বাংলাদেশে কাজের সুযোগের অভাব নেই; বরং পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাবে অনেক তরুণ কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত। শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহের মধ্যে স্পষ্ট অমিল রয়েছে, যেখানে শিল্প খাতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর চাহিদা বাড়ছে, সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা এমন স্নাতক তৈরি করছে যাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো প্রধানত স্বল্প ও মাঝারি দক্ষতা উন্নয়নে সীমাবদ্ধ, অথচ উৎপাদন খাতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ ঘাটতির কারণে শিল্প-কারখানাগুলো নিয়মিত ভারত, শ্রীলংকা, নেপালসহ অন্যান্য দেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করছে, যার ফলে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। দেশে যদি উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকত, তাহলে বাংলাদেশ আরো বেশি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠাতে পারত, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশে দক্ষ কর্মীর উচ্চ চাহিদা রয়েছে।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বাংলাদেশ শাখার কান্ট্রি ডিরেক্টর হোয়ে ইউন জিয়ং বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাণ শিল্পে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রশিক্ষণ ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে যদি এ ধরনের প্রশিক্ষণ চালু করা যায়, তাহলে ব্যাপক শ্রমবাজার সৃষ্টি হতে পারে। যদিও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক, তবুও এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত কম। তরুণদের শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করতে প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। শিল্প সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় সরকার এসইআইপি প্রকল্প, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) এবং এসআইসিআইপির মতো বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্প নিয়েছে। এসব কর্মসূচিতে গড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী কর্মসংস্থান পেয়েছে। তবুও বিনিয়োগ সেই অনুপাতে বাড়েনি। এসআইসিআইপি প্রকল্পের প্রথম রাউন্ডের বাজেট ছিল ৫৮ দশমিক ৬৫ কোটি টাকা এবং ৭৯ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী চাকরি পেয়েছিল। এসআইসিআইপি প্রকল্পের দ্বিতীয় রাউন্ডের বাজেট মাত্র ৭.৮ শতাংশ বাড়লেও কর্মসংস্থানের হার কমে দাঁড়ায় ৭২ শতাংশে। এসআইসিআইপি প্রকল্পের তৃতীয় রাউন্ডের বাজেট বৃদ্ধি ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, কিন্তু কর্মসংস্থানের হার নেমে আসে ৬২ শতাংশে। রংপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ সুশান্ত কুমার রায়ের মতে, প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৭০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী কর্মসংস্থান পায়।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো গত দুই দশকে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সামঞ্জস্য না থাকা। যেখানে গড়ে ৬ শতাংশ হারে উৎপাদন বেড়েছে, সেখানে কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ হারে। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তেই থাকছে। পাশাপাশি প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা স্নাতকের সংখ্যা নতুন সৃষ্ট চাকরির তুলনায় বেশি। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১০ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে স্নাতক হয়েছে অথচ নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ১০ হাজার। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি স্নাতক বেকার থেকে গেছে। এছাড়া শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ২০১৬-১৭ সালের জরিপে এ হার ছিল ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশে। দুই দশক ধরে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেশি থাকার কারণে বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধা ভোগ করছে, যা আরো দুই দশক স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও মানসম্মত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে এ সুবিধা ভবিষ্যতে বোঝায় পরিণত হতে পারে। আয়ু বৃদ্ধি ও জন্মহার হ্রাসের ফলে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে হলে সরকারের দৃঢ় ও কৌশলগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। শিক্ষার পরিমাণ বাড়ানোর পরিবর্তে এর গুণগত মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং প্রয়োজনে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে স্বতন্ত্র প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে যৌথভাবে উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণ উদ্যোগ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সবশেষে তরুণদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা অনেক স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায়ও কম। এ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো জরুরি। তবেই বাংলাদেশ শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে পারবে এবং তার জনমিতিক সুবিধাকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে।
মো. রাজিব: রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)