উন্নয়ন ভাবনা

উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের ফাঁদ যেভাবে এড়াল দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়া হলো গুটিকয়েক দেশের মধ্যে এমন একটি যারা নিম্ন আয়ের অর্থনীতি থেকে উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং তারাই একমাত্র দেশ যারা ওইসিডির ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটির (ডিএসি) সহায়তা গ্রহণকারী থেকে দাতা দেশ হয়েছিল। পুরনো ছকে বাঁধা" উন্নয়ন পরিকল্পনা অন্ধভাবে অনুকরণ করে নয় বরং সময়ের প্রয়োজনে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সফলতার গল্প লিখেছে দেশটি।

দক্ষিণ কোরিয়া হলো গুটিকয়েক দেশের মধ্যে এমন একটি যারা নিম্ন আয়ের অর্থনীতি থেকে উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং তারাই একমাত্র দেশ যারা ওইসিডির ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটির (ডিএসি) সহায়তা গ্রহণকারী থেকে দাতা দেশ হয়েছিল। পুরনো ছকে বাঁধা" উন্নয়ন পরিকল্পনা অন্ধভাবে অনুকরণ করে নয় বরং সময়ের প্রয়োজনে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সফলতার গল্প লিখেছে দেশটি। 

দক্ষিণ কোরিয়ার অভাবনীয় সাফল্য ব্যাখ্যায় নানা বয়ান রয়েছে তবে তার বেশির ভাগই মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিছু পণ্ডিত দাবি করেন যে শুরু থেকেই দক্ষিণ কোরিয়া বিশেষ সুবিধা পেয়ে এসেছে। বিশেষ করে তাদের ভৌত অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ ভৌত অবকাঠামো কোরীয় যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনকালে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ঘটেছিল এবং সে সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিতে পেরেছিল ৪৭ শতাংশ কোরীয় শিশু। ১৯৪৫ সালে ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পরই প্রাথমিকে ভর্তির হার বাড়ে। ১৯৪৯ সালে প্রাথমিকে ভর্তির হার দাঁড়ায় ৮২ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয় ১৯৫০ সালে। 

আফ্রিকার অনেক দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, দশকের পর দশক ঔপনিবেশিক শাসন ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাওয়া কখনই সুবিধাজনক নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্যও এ কথা পুরোপুরি সত্য। স্বাধীনতার পর রফতানি করার মতো কোনো পণ্য কিংবা খনিজ সম্পদ ছিল না দেশটির। কারণ খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ কোরীয় উপত্যকার বেশির ভাগই ছিল উত্তর কোরিয়ায়। ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ব্যাপক খাদ্য সংকটের মুখে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে মোটা দাগে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল দেশটি। 

১৯৬১ সালে পার্ক-চুং-হির সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর লোকজনকে ঠিকমতো খাবার দেয়া ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। শিল্পায়ন এগিয়ে নেয়ার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি তখনো তৈরি করা যায়নি। এ সময় দক্ষিণ কোরীয় সরকার দ্বৈতনীতি নিয়ে এগোয়—উচ্চ দামে কৃষকের কাছ থেকে খাদ্যশস্য ক্রয় করে তা কম দামে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করে।

সরকারের এ কার্যক্রম ১৯৫০-এর দশকের তৎকালীন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তখন খাদ্যদ্রব্যের মূল্য কমিয়ে দিয়ে মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো। এ পদ্ধতি গ্রহণের ফলে দুর্বল কৃষকদের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এছাড়া পার্ক-চুং-হির সরকার নতুন একটি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষেরও বিকাশ ঘটায়, যেটি ১৯৭২ সালে উদ্ভাবন হয়।

এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সরকার আরো কিছু পন্থায় জাতীয় অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। তার পরও কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার এ বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থান তথাকথিত ‘‌ওয়াশিংটন কনসেনসাস’-এর ফল। কিন্তু প্রকৃত কারণটা হলো, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার আর্থিক ও বাণিজ্যিক উদারীকরণের ক্ষেত্রে ভেবেচিন্তে এগিয়েছে। যেমন শাসনক্ষমতা দখলের পর জেনারেল পার্কের প্রথম পদক্ষেপ ছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জাতীয়করণ। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের পরিমাণ কম থাকার কারণে তীব্র মূলধন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল ব্যাংকগুলো। 

ওয়াশিংটন কনসেনসাসের সূত্র অনুসরণ করে দ্রুত আর্থিক ও বাণিজ্যিক উদারীকরণের সুবিধা ক্ষণস্থায়ী হতে দেখা গেছে। কারণ উদারীকরণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতগুলোর সক্ষমতার অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উগান্ডার মতো আফ্রিকার কিছু দেশে বেসরকারি এবং বিদেশী ব্যাংক খুবই উচ্চ সুদের হার আরোপ করে। এর ফলে স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ব্যাহত হয়। পরিণতিতে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যায়। 

অন্তত দুই দশক সুদের হার কম রাখতে সক্ষম হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংকগুলো বেসরকারীকরণ করা হয়। এতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়েছিল এবং সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ হয়ে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের সক্ষমতা বাড়িয়েছিল। এর ফলে জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক উল্লম্ফন দেখা যায়। সুদহার নিয়ন্ত্রিত থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার আশির দশকের মাঝামাঝিতে জিডিপির ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়, ১৯৬০ সালে যা ছিল জিডিপির মাত্র ৯ শতাংশ। 

বাণিজ্য উদারীকরণের ক্ষেত্রেও বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় রেখেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। কোনো দেশ বাণিজ্য উদারীকরণ করলে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই বিদেশী বা বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা থাকতে হবে। দেশীয় কোম্পানিগুলো যদি এ সক্ষমতা দেখাতে না পারে তাহলে বিদেশী কোম্পানিগুলো মনোপলি করে ফেলবে। সরকার যদি সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা না নেয় তাহলে স্থানীয় শিল্প ভিত ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। 

ভোগ্যপণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে এ সংরক্ষণমূলক নীতি বাস্তবায়ন করেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। ফলে বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে শুরুতে তীব্র প্রতিযোগিতা এড়িয়ে নিজেদের বিকাশ করার সুযোগ পেয়েছিল স্থানীয় কোম্পানিগুলো। সুরক্ষিত স্থানীয় শিল্পগুলো নিজেদের বিনিয়োগ তহবিল গঠনে সমর্থ হয় আবার একই সময়ে এ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার জন্য উন্মুক্ত সুযোগও পেয়েছিল। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় যেসব কাঁচামাল দক্ষিণ কোরিয়াকে আমদানি করতে হতো সেগুলোর ওপর খুব কম হারে আমদানি শুল্ক ধার্য করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন প্রপঞ্চ ব্যাখ্যায় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে আরেকটি বয়ান রয়েছে। ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু, জেমস এ. রবিনসন ও সাইমন জনসনদের মতো পণ্ডিতদের যুক্তি, যেসব উন্নয়নশীল দেশে শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের উন্নতি ব্যাহত হয়। আবার দক্ষিণ কোরিয়ার মতো যেসব দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে এ সরল সমীকরণ মেলে না। দক্ষিণ কোরিয়ার উত্থান হয়েছে কর্তৃত্ববাদী-ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই। এক্ষেত্রে এডওয়ার্ড এল গ্লেজারের অবস্থান প্রণিধানযোগ্য। গ্লেজার ও তার সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক উপাদানের চাইতে মানবসম্পদের অধিক জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। সব মিলিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যের সারবত্তা হলো, কর্তৃত্ববাদী শাসনকালে মানবসম্পদে বিনিয়োগ তাদের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে। এর ফলে সেখানে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে যারা গণতন্ত্রের দাবিতে সরব হয়েছে। 

কিছু কিছু বিশ্লেষক অবশ্য এশিয়ার দেশগুলোর রফতানিমুখী অর্থনৈতিক পলিসির বিপরীতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর আমদানির বিকল্প অনুসন্ধানের তুলনা করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও দক্ষিণ কোরিয়া ভিন্ন পথে এগিয়েছে। একই সঙ্গে রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধি ও আমদানির স্থানীয় বিকল্প অনুসন্ধানের পলিসি নিয়েছিল দেশটি। 

এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, রফতানিযোগ্য পণ্য তৈরির জন্য দেশীয় কোম্পানিগুলোর মূলধনি পণ্য, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এর ফলে আশির দশকের শেষের দিকে অব্যাহত বাণিজ্য ঘাটতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়াকে। তখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনার জন্য স্থানীয় বিকল্প তৈরিতে জোর তৎপরতা চালিয়েছিল তারা। এ কারণে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশকের শেষভাগ পর্যন্ত বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে দক্ষিণ কোরিয়া নিচের দিকে অবস্থান করছিল। 

গত কয়েক দশকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অর্ধ রক্ষণশীল, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে উদার অর্থনীতির একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপ পায়। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া একমাত্র দেশ যার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারতের। রাতারাতি কিন্তু এ অর্জন সম্ভব হয়নি। কখনো কখনো তারা রয়েসয়ে, ভেবেচিন্তে কৌশল নিয়েছে; যা এখন পর্যন্ত উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

কিয়ুন লি: দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইন্টারন্যাশনাল শুম্পেটার সোসাইটির সাবেক প্রেসিডেন্ট, সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক, ২০১৪ শুম্পেটার পুরস্কার বিজয়ী এবং ‘চীনের টেকনোলজিক্যাল লিপফ্রগিং অ্যান্ড ইকোনমিক ক্যাচ-আপ: এ শুম্পেটারিয়ান পারস্পেকটিভ’-এর লেখক

ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম ও সুস্মিতা হোসেন স্বর্ণালী

আরও