অভিমত

নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ণয়ে অংশীজনদের আস্থায় নিচ্ছি তো

নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প শুধু সরকারের একটি কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রায় চার দশকের এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উদ্যোগ, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে।

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সেসব নগর জনগোষ্ঠীর কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া, যাদের কাছে প্রচলিত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সেবা কাঠামো কার্যকরভাবে পৌঁছতে পারেনি। আজ যখন এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘‌কার কাছে দায়িত্ব যাবে’ নয়; বরং ‘‌কীভাবে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা, মান ও প্রাপ্যতা বজায় থাকবে’।

প্রকল্পটির ইতিহাস ও বাস্তবতা উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়

বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে সৃষ্টি হওয়া স্বাস্থ্যবৈষম্য মোকাবেলার জন্য নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ হিসেবে গড়ে ওঠে। সে সময়ে শহরের বস্তি ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো ছিল অত্যন্ত সীমিত। গ্রামীণ অঞ্চলের মতো শহরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিস্তৃত মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম ছিল না।

এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা মডেল। এ মডেলের মূল শক্তি ছিল—সরকারের নীতিগত নেতৃত্ব, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, এনজিওগুলোর মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং কমিউনিটি পর্যায়ের অংশগ্রহণ। দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রকল্প আন্তর্জাতিকভাবেও একটি কার্যকর নগর স্বাস্থ্য মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

এনজিওগুলো ছিল না ‘‌সহযোগী’; তারা ছিল মূল বাস্তবায়নকারী: বর্তমান আলোচনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো এনজিওগুলোর ভূমিকা যথাযথভাবে আলোচনায় না আসা। বাস্তবতা হলো এ প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জনবল, কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রম ও সেবাদান ব্যবস্থা এনজিওগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, স্বাস্থ্যকর্মী, কাউন্সেলর ও সহায়ক কর্মীরা সরকারি পে-রোলে নন; তারা এনজিও কাঠামোর আওতায় কর্মরত।

এনজিওগুলো শুধু ‘‌সহযোগিতা’ করেনি; তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করেছে, কমিউনিটির আস্থা তৈরি করেছে, সেবা মান বজায় রেখেছে, মাঠ পর্যায়ে উদ্ভাবনী পদ্ধতি চালু করেছে এবং নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে। সুতরাং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এনজিওগুলোর অর্থবহ সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ভবিষ্যৎ কী?

বর্তমানে পরিচালিত অধিকাংশ নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিজস্ব ভবনে নয়; বরং ভাড়াকৃত স্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে আসে এসব কেন্দ্রের ভাড়া ও পরিচালন ব্যয় কে বহন করবে? চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে? প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে সেবা কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটবে কি? স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কি আগের মতো কমিউনিটির নাগালের মধ্যেই থাকবে?

এগুলো কেবল প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়; এগুলো সরাসরি জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন গর্ভবতী মা, টিকাদানপ্রত্যাশী শিশু, কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা কিশোরী কিংবা নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণকারী প্রবীণ নাগরিক—তাদের জন্য সেবার সামান্য বিঘ্নও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

পিপিপি মডেল ছিল এ প্রকল্পের অন্যতম শক্তি

অনেক সময় পিপিপি মডেলকে সাময়িক বা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে সঠিকভাবে পরিচালিত পিপিপি মডেল অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এ মডেলের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে দ্রুত সেবা সম্প্রসারণ, কমিউনিটিভিত্তিক সেবা, নমনীয় ব্যবস্থাপনা, দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবহার ও ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশ অতীতে পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশীদারত্বভিত্তিক মডেলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জন করেছে। নগর স্বাস্থ্যসেবাও সে ধারারই অংশ। তাই ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে পিপিপির ইতিবাচক অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার না করে বরং আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা আলোচনায় থাকা জরুরি: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দীর্ঘদিন ধরে এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান অর্থায়নকারী ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এ অর্থায়নের বড় অংশ ছিল সরকারের জন্য ঋণভিত্তিক সহায়তা। অর্থাৎ এটি শুধু দাতা-সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প ছিল না; বরং রাষ্ট্রের অংশীদারত্বে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগভিত্তিক উদ্যোগ।

এডিবি শুধু অর্থায়নই করেনি; তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা, মনিটরিং কাঠামো, সক্ষমতা উন্নয়ন ও নীতিগত সহায়তাও দিয়েছে। সুতরাং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় উন্নয়ন সহযোগীদেরও সম্পৃক্ত রাখা যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।

‘‌নির্দেশ’ নয়, দরকার ‘‌অংশীদারত্বের অনুভূতি’: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় দ্রুত নেয়া যায়, কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো জটিল ও জনসম্পৃক্ত খাতে টেকসই পরিবর্তনে প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। শুধু একটি আদেশ জারি করে ‘‌ক্যারি অন’ ধরনের নির্দেশনা বাস্তব মাঠ পর্যায়ে কার্যকর নাও হতে পারে। বরং প্রয়োজন উন্মুক্ত আলোচনা, অংশীজনদের সম্পৃক্ততা, ধাপে ধাপে রূপান্তর পরিকল্পনা, মানবসম্পদ সুরক্ষা, আর্থিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ এবং সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট কৌশল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ প্রক্রিয়ায় ‘‌আমরা’ অনুভূতি তৈরি করা। কারণ এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের যৌথ উদ্যোগ। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় এখনো সময় আছে। চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে সরকার, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী, নগর স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নকারীদের নিয়ে একটি উন্মুক্ত জাতীয় আলোচনা হতে পারে। এ আলোচনার মাধ্যমে বাস্তব ঝুঁকি চিহ্নিত করা, সেবা অব্যাহত রাখার কৌশল নির্ধারণ, মানবসম্পদ সুরক্ষা, অবকাঠামোগত পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারত্ব কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। উন্মুক্ততা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি টেকসই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম পূর্বশর্ত।

নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প বাংলাদেশের নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়; বরং অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন ও জনগণকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার একটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। আজকের বাস্তবতায় এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে দূরদর্শিতা, বাস্তবতা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে।

প্রয়োজন এমন একটি রূপান্তর প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার থাকবে নেতৃত্বে, উন্নয়ন সহযোগীরা থাকবে আস্থায়, এনজিওগুলো থাকবে সম্পৃক্ততায় এবং সর্বোপরি জনগণ থাকবে কেন্দ্রে। কারণ নগর স্বাস্থ্যসেবা শুধু প্রশাসনিক কাঠামোর বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, আস্থা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।

ড. নূর মোহাম্মদ: নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার

আরও