ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি পণ্যের উৎসের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কারণে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে হালাল পণ্যের চাহিদা। ২০৩৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির আকার সাড়ে ১২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও এ বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা এখনো নগণ্য। তাই এ খাতে রফতানি বাড়াতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ, নীতি অনুসরণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটিতে (সাবেক বিডা) গতকাল ‘ইনভেস্টরস মিটআপ ৩.০’ শীর্ষক সম্মেলনের আলোচনায় এ বিষয় উঠে আসে। বিডিফেয়ার্স ডটকম ও জেসিআই ঢাকা অ্যাচিভার্স যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন: ব্যবসায়িক সহজীকরণ, এফডিআই এবং হালাল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি’ প্রতিপাদ্যে সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘আমাদের হালাল শিল্প তৈরি হয়ে আছে। কোনো ধরনের বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়াই খাতটিকে এগিয়ে নিতে পারি। এজন্য শুধু নীতি অনুসরণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সনদ জটিলতা দূর করতে হবে। হালাল পণ্যের সনদ দেয়ার জন্য আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো ল্যাব নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি প্রধান স্তম্ভ কৃষি, রেমিট্যান্স ও রফতানি। রফতানির প্রায় ৯২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে এ খাতে প্রবৃদ্ধির প্রভাব কমছে এবং কারখানায় স্বয়ংক্রিয়তা বাড়ায় কর্মসংস্থানও সংকুচিত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।’ এ অবস্থায় কৃষির উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়াতে না পারলে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিসিআই সভাপতি।
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসনের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, বিশ্ব অর্থনীতিতে হালাল খাতের অবদান ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। খাদ্য ও পানীয়, ফ্যাশন, পর্যটন, ওষুধ ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন খাতে এ বাজারের বিস্তৃতি রয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক হালাল পণ্যের বাজারের আকার ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বছরে ৬ দশমিক ২ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৩৪ সালে তা ১২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের এ বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হালাল সনদ প্রদান, পরিবহন ও গুদামজাতে কোল্ড-চেইন অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্যের উৎস থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ অনুসরণযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে হালাল পণ্যের রফতানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।’
দিনব্যাপী সম্মেলনে মোট তিনটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে হালাল শিল্পে বিনিয়োগ নিয়ে প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় অধিবেশনে টেকসই উন্নয়ন ও শিল্পে বিনিয়োগ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাপানভিত্তিক এপিও ও এনসিএলের পরামর্শক প্রকৌশলী এ. ফাত্তাহ আসিফ। তিনি বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নকে শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব বা কমপ্লায়েন্সের ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং ব্যবসার সুযোগ, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’ এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারের সুস্পষ্ট নীতি ও পূর্বাভাসযোগ্য বিধিমালা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহজলভ্য সবুজ অর্থায়ন, শিল্পোদ্যোক্তাদের মূলধনি বিনিয়োগ এবং পরিমাপযোগ্য টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন বলে জানান এ পরামর্শক প্রকৌশলী। সম্মেলনের সর্বশেষ তৃতীয় অধিবেশনে শিল্প খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্যানেল আলোচনা হয়।