ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকটি পদক্ষেপে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়ছে। যেমন দারিদ্র্যবান্ধব মেডিকএইড কর্মসূচির ব্যয় হ্রাস এবং মহামারীকালে চালু হওয়া অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের (এসিএ) ভর্তুকি বন্ধ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসব কারণে আগামী বছরের শুরুতেই লাখ লাখ মার্কিনের স্বাস্থ্য ব্যয় হঠাৎ অনেক বেড়ে যাবে। গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ওপিনিয়ন রিসার্চ সেন্টারের (এনওআরসি) সঙ্গে বার্তা সংস্থা এপির নতুন জরিপেও এ উদ্বেগ উঠে এসেছে।
২০২৬ সালে কোন বিষয়গুলোকে মার্কিন সরকার অগ্রাধিকার দিতে পারে তা জানাতে বলা হয়েছিল জরিপে। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল শীর্ষে। এরপর রয়েছে জীবনযাত্রায় উচ্চ ব্যয়, অভিবাসন, মূল্যস্ফীতি ও আবাসন খরচ।
আইওয়ার জুলিয়া ডভরাকের ৮৩ বছর বয়সী মায়ের খিঁচুনির সমস্যা রয়েছে। বারবার জরুরি বিভাগে যাতায়াত করতে গিয়ে অবসরকালীন সঞ্চয় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এ বৃদ্ধার। শিগগিরই তাকে মেডিকএইডের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। ৫৬ বছর বয়সী জুলিয়াও দীর্ঘদিন ধরে হাঁটুর সমস্যায় ভুগছেন, এজন্য অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল সহায়তার ওপর নির্ভরশীল তিনি। ২০২৬ সাল নিয়ে উদ্বেগ থেকে জুলিয়া ডভরাক বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় আমাকে ও আমার স্বজনদের কীভাবে প্রভাবিত করছে তা দেখছি। কিন্তু এটা শুধু আমাদের সমস্যা নয়। অনেক মানুষের ওপরই এর প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে।’
আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেস কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে তা নির্ধারিত হবে নির্বাচনে। তখন স্বাস্থ্যসেবা প্রধান ইস্যুতে পরিণত হতে পারে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। অবশ্য অভিবাসন ও বাড়তে থাকা জীবনযাপন ব্যয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
২০২৬ সালে এসব সমস্যার সমাধানে সরকার কতটা সফল হবে? এ নিয়ে আস্থা কমেছে জরিপে। প্রায় ৬৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরদাতা বলেছেন, সরকারের ওপর তাদের আস্থা সামান্য বা একেবারেই নেই। গত বছরের জরিপে এ হার ছিল ৫৮ শতাংশ।
আগামী বছরে সরকার কোন পাঁচটি বিষয় নিয়ে কাজ করুক? উন্মুক্ত প্রশ্নে প্রায় ১০ মার্কিনের মধ্যে চারজন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করেছেন। গত বছর এ হার ছিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
আরকানসাসের ৩৮ বছর বয়সী রিপাবলিকান সমর্থক জোশুয়া ক্যাম্পবেল পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ট্রাম্পের কাজের ধরন বিশেষ করে অভিবাসন নীতি সমর্থন করেন তিনি। এখন জোশুয়ার কাছে স্বাস্থ্য ব্যয় বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার খরচ একেবারেই পাগলামি পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর চেয়ে ভালো কিছু অবশ্যই থাকা উচিত।’
বিশেষ করে ৪৫-৫৯ বছর বয়সী মার্কিনদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বড় উদ্বেগের বিষয়। এ বয়সে স্বাস্থ্য ব্যয় সাধারণত তরুণদের তুলনায় বেশি, অথচ তারা মেডিকেয়ারের আওতায় পড়েন না।
জরিপে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি অনেকটাই ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের প্রথম বছরের শেষের দিকের মতো। তখন স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার অনেকের কাছে ছিল প্রধান উদ্বেগ। তবে এবার আরো বাড়তি জটিলতা রয়েছে। ২০১৭ সালের শেষে জীবনযাত্রার ব্যয়কে চাপ হিসেবে খুব কম মানুষই উল্লেখ করেছিল। কিন্তু এবার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
২০২১ সালের শেষ থেকে মার্কিনদের অন্যতম শীর্ষ উদ্বেগ ছিল মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়। মিসৌরির বাসিন্দা টমি ক্যারোসোন বলেন, ‘কয়েক বছর আগের তুলনায় আমার স্ত্রী এখন গ্রোসারি পণ্যে অনেক বেশি খরচ করছে। প্রতিবার বাজার করে ফিরলেই সে সেটা আমাকে বলে।’
৪৪ বছর বয়সী এ জেট বিমান মেকানিক চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তিনি মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় শিগগিরই কমবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করতে শুল্কনীতিকে সমর্থন করেন তিনি। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেয়ার আগে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন টমি ক্যারোসোন। তবে এখন প্রশাসনের পদক্ষেপে বিষয়টি আর শীর্ষ উদ্বেগের তালিকায় নেই।
জরিপ অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে দুজন মার্কিন চান ফেডারেল সরকার আগামী বছর আবাসন খরচ কমানোর দিকে মনোযোগ দিক। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ৩০ বছরের নিচে প্রায় এক-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা আবাসন ব্যয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন। ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে উদ্বিগ্ন প্রায় ১০ শতাংশ।
অনেক মার্কিন আশা করেছিলেন, হোয়াইট হাউজে ফিরে অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেবেন ট্রাম্প। গত বছর এটিই ছিল সরকারের কাছে অগ্রাধিকার চাওয়ার সবচেয়ে বড় ইস্যু। প্রায় অর্ধেক মার্কিন এটি উল্লেখ করেছিলেন। চলতি বছরও ৪৪ শতাংশ মার্কিন অভিবাসনে অগ্রাধিকার চান। তবে এখানে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট। প্রায় ৪০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট অভিবাসনকে উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে গত বছর এ হার ছিল ৩২ শতাংশ। রিপাবলিকানদের মধ্যে এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রায় ১০ জনের মধ্যে ছয়জন মার্কিন এটিকে অগ্রাধিকার মনে করেন। গত বছরের এ হার ছিল ১০ জনে সাতজন।
তবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের অভিবাসননীতি নিয়ে বোঝাপড়া আলাদা। ৬৪ বছর বয়সী রকসানা হোলপার বর্তমান কঠোরনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অবশ্য এও বললেন, অতীতে ডেমোক্র্যাটরাও সীমান্ত পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়ে বিষয়টি জটিল করে তোলে।