বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা

নগদনির্ভর লেনদেনে বছরে ৯৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এ ধরনের লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণ ও যাচাই করা কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড করের আওতার বাইরে থেকে যায়

দেশে নগদ টাকায় লেনদেনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে নগদ টাকা ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায়। ব্যাংক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাকেও নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনায় গুনতে হচ্ছে বড় অংকের পরোক্ষ ব্যয়। সব মিলিয়ে দেশে নগদনির্ভর অর্থনীতির বার্ষিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণই ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। নগদ লেনদেনের প্রকৃত ব্যয় খালি চোখে দৃশ্যমান না হলেও এর প্রভাব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরেই পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে ওপরের চিত্র উঠে এসেছে। ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয় তুলনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এ ধরনের লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণ ও যাচাই কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড করের আওতার বাইরে থেকে যায়। গবেষণায় ব্যবহৃত প্রাক্কলন অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির (শ্যাডো ইকোনমি) আকার জিডিপির প্রায় ২৭ দশমিক ২ শতাংশ। আর এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিদ্যমান করের হার প্রয়োগ করে সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি নিরূপণ করা হয়েছে।

নগদনির্ভর ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি বাদ দিলেও নগদ লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর ভোক্তাদের ২৮ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৬ হাজার ২০০ কোটি এবং ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্যের খুচরা বিক্রেতাদের ব্যয় ৬০ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ব্যয়ের মধ্যে নগদ অর্থ পরিবহন ও সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, লেনদেনের হিসাব মেলানো এবং নগদ টাকা নিয়ে ব্যাংক বা আর্থিক সেবাদাতার কাছে যাতায়াতের মতো বিষয় রয়েছে।

গবেষণায় ভোক্তাদের নগদ টাকা ব্যবহারের খরচের মধ্যে অর্থ সংগ্রহে ব্যয় হওয়া সময়ের মূল্য প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, হাতে নগদ রাখার কারণে হারানো সুদ প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিজনিত ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়েছে। বিপরীতে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর বার্ষিক ব্যয় মাত্র ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার মোট ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম।

দেশে ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নগদবিহীন লেনদেনই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ৫০ শতাংশ লেনদেনকে নগদবিহীন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহ দিতে এরই মধ্যে প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আশা করছি এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী এবং সেবাদাতাদের মধ্যে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে আগ্রহী করে তুলবে।’

সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি নগদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর ব্যয়ও বিপুল। নগদ লেনদেনের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্ক পরিচালনা, নগদ টাকা সংরক্ষণ, পরিবহন, নিরাপত্তা এবং নগদ ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের সময় ব্যয় এর অন্তর্ভুক্ত। নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাংকগুলোকে বিপুল অবকাঠামো ও জনবল ধরে রাখতে হয়। এ অর্থ ও শ্রম উৎপাদনশীল অন্য কাজে ব্যবহার করা গেলে অর্থনীতিতে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হতো।

সাধারণ ভোক্তাদের ক্ষেত্রেও নগদ লেনদেনের ব্যয় কম নয়। গবেষণায় এ ব্যয় বছরে ২৮ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। নগদ টাকা হাতে রাখায় সুদ আয় থেকে বঞ্চিত হওয়া, চুরি বা হারানোর ঝুঁকি, টাকা উত্তোলন ও জমা দিতে ব্যাংক বা এজেন্টের কাছে যাতায়াত এবং লেনদেনে সময় ব্যয়—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। নগদ ব্যবস্থাপনার কারণে সময়ের সুযোগ ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, নগদ অর্থ হাতে রাখায় সুদ আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং নিরাপত্তাঝুঁকির ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় নগদ ব্যবস্থার তুলনায় অনেক কম। ব্যাংক, আর্থিক সেবাদাতা, ব্যবসায়ী ও গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ডিজিটাল লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির মাত্র দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ, নগদ লেনদেনের সামগ্রিক ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয়ের প্রায় ২৮ গুণ।

তবে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থায়ও ব্যয় ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ডিজিটাল লেনদেন থেকে বছরে প্রায় ২ হাজার ৩১১ কোটি টাকা আয় হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মোট ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এ ব্যবস্থায় সেবাদাতাদের ব্যয় আয়কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। লেনদেনের ফি, ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের খরচ, অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, আন্তঃব্যবহারযোগ্যতার সীমাবদ্ধতা এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি এ ব্যবস্থার বিস্তারে বাধা হিসেবে কাজ করছে।

নগদনির্ভরতার পেছনে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মানসিকতারও দায় আছে। নগদ লেনদেনকে অনেকেই বিনা খরচের ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন। বিপরীতে ডিজিটাল লেনদেনে কোনো ফি থাকলে তা সরাসরি চোখে পড়ে। অথচ নগদ টাকা ব্যবস্থাপনায় সময়, নিরাপত্তা, যাতায়াত ও অবকাঠামোর যে ব্যয় হয়, তা সাধারণত লেনদেনকারীরা হিসাব করেন না। এ কারণে নগদ লেনদেনের প্রকৃত ব্যয় আড়ালে থেকে যায় এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার তুলনায় নগদ ব্যবহারে আগ্রহ বজায় থাকে।

গবেষণার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নগদনির্ভরতা কমাতে ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো বিস্তারের পাশাপাশি লেনদেনের খরচ সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়ানো, গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা উন্নত করা এবং বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ ও কর পরিপালন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু ডিজিটাল পেমেন্ট চালু করলেই রাজস্ব ক্ষতি পুরোপুরি দূর হবে না; এর সুফল পেতে হলে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যকে কার্যকর কর তদারকি ও রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ নগদবিহীন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে নগদ লেনদেনের অদৃশ্য ব্যয় কমানো এবং ডিজিটাল পেমেন্টকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার ওপর তাগিদ দেয়া হয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে নগদনির্ভরতা কমে এলে ঘুস-দুর্নীতি ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য কমবে বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির এ উৎকর্ষের যুগে বাংলাদেশের মতো কোনো অর্থনীতির দেশে এত বেশি নগদ টাকার লেনদেন হয় না। অতিরিক্ত নগদনির্ভরতা আমাদের অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলোর একটি। চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির দাপট চলছে। বিশ্বের অনেক দেশে এখন আর নোট বা নগদ অর্থ বলতে কিছু নেই। নগদনির্ভরতার কারণে একদিকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে ঘুস-দুর্নীতি ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য বজায় থাকছে। দেশের লেনদেন ব্যবস্থা ডিজিটালাইজড হলে শ্যাডো ইকোনমির আকার ছোট হয়ে আসবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত নোটের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকাই ছিল ব্যাংক খাতের বাইরে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থার ঘাটতিও মানুষকে নগদ টাকা ঘরে রাখতে উৎসাহিত করছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পেমেন্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে ইনফরমাল ইকোনমির (অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি) আকার ছোট হয়ে আসার কথা। কিন্তু আমরা সেটি দেখছি না। বরং ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। আবার ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে। একদিকে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়া, অন্যদিকে আমানতের প্রবৃদ্ধি হওয়া পরস্পরবিরোধী। কেন এমনটি হচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।’

ড. ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা কিউআর কোড জনপ্রিয় করতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারেরও আন্তরিকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। ব্যাংক খাতের প্রতি জনমানুষের আস্থা ও বিশ্বাসও সুদৃঢ় করতে হবে। মানুষ যেন মনে করে, ব্যাংকে থাকা তার প্রতিটি অর্থ শতভাগ নিরাপদ। লেনদেন ব্যবস্থা নগদবিহীন করা গেলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। সরকারের রাজস্ব আয়ও অনেক বাড়ানো সম্ভব হবে।’

আরও