জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক

চিপ সংকটে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন সরবরাহ কমেছে ২২ শতাংশ

পোপালের তথ্য অনুযায়ী, বছরের আগের প্রান্তিকগুলোয় মেমরির দাম প্রায় ৫০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তৃতীয় প্রান্তিকে এ প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। তবে দাম বাড়ার গতি কমলেও সামগ্রিক ব্যয় এখনো অনেক বেশি। ফলে স্মার্টফোন নির্মাতাদের মুনাফার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্ববাজারে স্মার্টফোন সরবরাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের (আইডিসি) প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে মোট সরবরাহ কমে ২৫ কোটি ৫৩ লাখ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। মূলত এআই প্রযুক্তির কারণে মেমোরি চিপের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে এ পতন হয়েছে।

আইডিসির সম্প্রতি প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কোনো প্রান্তিকে এক বছরের ব্যবধানে স্মার্টফোন সরবরাহে এটিই সবচেয়ে বড় পতন। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নির্মাতারা চাপে পড়েছেন। একই সঙ্গে বাড়তি দামের কারণে নতুন ফোন কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন অনেক ক্রেতা।

আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালেও স্মার্টফোনের বাজারে প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকতে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ২০২৮ সালের আগে বাজারে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার নাও আসতে পারে। ফলে নির্মাতাদের সামনে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

মেমোরি চিপের দাম বেড়েছে ৩৫০ শতাংশ

স্মার্টফোনের উৎপাদন খরচ বাড়ার প্রধান কারণ মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধি। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর চিপের দাম প্রায় ৩৫০ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দামও বেশি থাকায় উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়েছে।

আইডিসির ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডিভাইসেস বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক নাবিলা পোপাল বলেন, ‘চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত যে বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কা করছিল, তা বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। তবে বাজারের পরিস্থিতি এখনো সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছয়নি।’

পোপালের তথ্য অনুযায়ী, বছরের আগের প্রান্তিকগুলোয় মেমরির দাম প্রায় ৫০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তৃতীয় প্রান্তিকে এ প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। তবে দাম বাড়ার গতি কমলেও সামগ্রিক ব্যয় এখনো অনেক বেশি। ফলে স্মার্টফোন নির্মাতাদের মুনাফার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

চাপে রয়েছে চীনা ব্র্যান্ডগুলো

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্মার্টফোন নির্মাতাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে ফোনের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে দাম বাড়ালে রয়েছেক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা। আবার দাম না বাড়ালে মুনাফা কমতে পারে।

আইডিসির ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডিভাইসেস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো বলেন, ‘মেমোরি সংকটের প্রভাব এখন নির্মাতাদের গণ্ডি পেরিয়ে ক্রেতাদের ওপরও পড়ছে। ফোনের খুচরা দাম বাড়তে থাকায় অনেকেই নতুন ফোন কেনার বদলে পুরনো ফোন দীর্ঘদিন ব্যবহার করছেন।

বিশেষ করে কম দামের স্মার্টফোনের বাজারে এ প্রবণতার প্রভাব বেশি পড়তে পারে। কারণ এ শ্রেণীর ক্রেতারা সাধারণত দাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বেশি সংবেদনশীল। দাম বাড়লে তারা নতুন ফোন কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারেন। এতে বাজারে চাহিদা আরো কমার আশঙ্কা থাকে।’

চীনের শাওমি, অপো ও ভিভোর মতো ব্র্যান্ডগুলো এ পরিস্থিতিতে বাড়তি চাপে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার বড় অংশ তুলনামূলক কম দামের ফোনের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি চাহিদা কমে যাওয়ায় তাদের সরবরাহে পতন আরো তীব্র হয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানকে এখন মুনাফা ধরে রাখা এবং বিক্রির পরিমাণ বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ালে ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। আবার দাম অপরিবর্তিত রাখলে মুনাফা কমতে পারে।

এগিয়ে অ্যাপল ও স্যামসাং

বাজারের সামগ্রিক পতনের মধ্যেও অ্যাপল ও স্যামসাং তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। প্রিমিয়াম বা উচ্চমূল্যের ফোনের পণ্যসম্ভার থাকায় প্রতিষ্ঠান দুটি বাজারে নিজেদের অংশীদারত্ব বাড়াতে পেরেছে।

আইডিসির সহযোগী গবেষণা পরিচালক কিরণজিৎ কৌর বলেন, ‘বড় নির্মাতাদের অবস্থানের খুব বেশি পরিবর্তন না এলেও অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের বাজার হিস্যা বেড়েছে। বিপরীতে শাওমি, অপো ও ভিভোর সরবরাহ কমার প্রবণতা আরো তীব্র হয়েছে।’

আইডিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা, যন্ত্রাংশের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উচ্চমূল্যের ফোন বিক্রির সক্ষমতা সংকটের সময় বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। এসব কারণে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের সংকোচনের মধ্যেও প্রতিযোগীদের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকতে পারছে।

২০২৭ সালেও অনিশ্চয়তা

সামনের দিনগুলোয়ও স্মার্টফোনের বাজারে অনিশ্চয়তা কাটার সম্ভাবনা কম। কিছু নির্মাতা আগামী বছর যন্ত্রাংশের সরবরাহ আরো কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উৎপাদন পরিকল্পনা বাড়িয়েছে। তবে চাহিদা দুর্বল থাকলে এ সিদ্ধান্ত উল্টো সমস্যার কারণ হতে পারে। বিক্রি কম হলে অবিক্রীত ফোনের মজুদ বেড়ে যেতে পারে, যা ২০২৭ সালে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

কিরণজিৎ কৌর সতর্ক করে বলেন, ‘চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে অতিরিক্ত মজুদ আগামী বছরের বাজার পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করতে পারে।’

এদিকে উৎসব ও ছুটির মৌসুমে ছাড় ও বিশেষ অফারের মাধ্যমে কিছু ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে নির্মাতারা। যাদের নতুন ফোন কেনা জরুরি, তারা এ সময় তুলনামূলক ভালো দামে ফোন পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন বলে মনে করছে আইডিসি।

আরও