২০২৫ সাল

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পছন্দের বিনিয়োগে শীর্ষে স্বর্ণ, পিছিয়ে পড়েছে মার্কিন বন্ড

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত মার্কিন সরকারি বন্ড বা ট্রেজারি বন্ডের জায়গা এখন ধীরে ধীরে দখল করছে স্বর্ণ। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিস্থিতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নতুন করে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সরকারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ বেড়ে ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময় মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের অংশ নেমে এসেছে ২২ শতাংশে। ফলে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে পছন্দের বিনিয়োগ সম্পদে পরিণত হয়েছে স্বর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তন শুধু বাজারমূল্যের কারণে নয়। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ।

» স্বর্ণের দামে বড় উল্লম্ফন

স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়ার অন্যতম কারণ এর মূল্যবৃদ্ধি। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এক ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম বছরে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে বছরের শেষে ৪ হাজার ৩২২ ডলারে পৌঁছায়। এটি ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি অবস্থান।

স্বর্ণের দাম বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান স্বর্ণ মজুদের মূল্যও বেড়েছে। ফলে রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। তবে শুধু মূল্যবৃদ্ধিই একমাত্র কারণ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবেও স্বর্ণ ধরে রাখতে চাইছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

» ভূরাজনীতির প্রভাব

ইসিবি বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেকটা বেড়েছে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। বাণিজ্যযুদ্ধ, সামরিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

২০২৫ সালের শেষ দিকে পরিচালিত এক জরিপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো জানায়, সাইবার নিরাপত্তা ও অন্যান্য সাইবার ঝুঁকির পরই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল ভূরাজনীতি। জরিপে অংশ নেয়া প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ কথা জানায়। পরিস্থিতি আরো স্পষ্ট হয় চলতি বছরের এপ্রিলে পরিচালিত আরেক জরিপে। সেখানে ৭০ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ২০২৬ সালে সংস্থার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা।

» কেন স্বর্ণ নিরাপদ আশ্রয়

অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বহু বছর ধরে স্বর্ণ এমন একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুল্যস্ফীতি কিংবা আর্থিক বাজারে বড় ধরনের ধাক্কার সময় স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে দেখা যায়। কারণ স্বর্ণ কোনো নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রা বা সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়।

তবে স্বর্ণেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইসিবি বলছে, স্বর্ণের দাম অনেক সময় অস্থির হতে পারে। এটি সংরক্ষণ করতেও খরচ হয়। এছাড়া বাজারে চাহিদার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে স্বর্ণ সবসময় সহজে মানিয়ে নিতে পারে না। এ কারণেই অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বেশি ঝুঁকেছিল মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও ডলারভিত্তিক অন্যান্য সম্পদের দিকে। কারণ এসব সম্পদ সহজে কেনাবেচা করা যায় ও ডলার এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হওয়া মুদ্রা।

» কমছে মার্কিন বন্ডের আকর্ষণ

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বন্ডের প্রতি আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সে হারে বাড়ছে না অর্থনীতি কিংবা সরকারি বন্ডের চাহিদা।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০০ শতাংশের কিছু বেশি ছিল। বর্তমানে তা ১২০ শতাংশেরও ওপরে উঠে গেছে। অর্থাৎ দেশটির অর্থনীতির আকারের তুলনায় ঋণের বোঝা অনেক বেশি। এতে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন সরকারি বন্ডের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে।

» ফেডের তথ্য যা বলছে

মার্কিন বন্ডের প্রতি আগ্রহ কমার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য থেকে। সেখানে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের মূল্য মার্চে ৮ হাজার ২০০ কোটি ডলার কমে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এটি ২০১২ সালের পর সর্বনিম্ন স্তর।

» কারা বেশি স্বর্ণ কিনছে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বিশ্বের কয়েকটি দেশ স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে রয়েছে চীন, পোল্যান্ড, তুরস্ক ও ভারত। তবে ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট স্বর্ণ কেনার পরিমাণ কিছুটা কমে। ওই বছর সংস্থাগুলো প্রায় ৮৫০ টন স্বর্ণ কিনে। এর আগের তিন বছর কেনা হয়েছিল এক হাজার টনেরও বেশি।

সব দেশ অবশ্য শুধু স্বর্ণ কিনছে না। কিছু দেশ প্রয়োজনের তাগিদে স্বর্ণ বিক্রিও করছে। তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর প্রায় ১৩০ টন স্বর্ণ বিক্রি বা ঋণ হিসেবে দিয়েছে। একইভাবে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও স্বর্ণ বিক্রি করেছে।

একসময় মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে প্রায় প্রশ্নাতীত নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হতো। এখন সে অবস্থান কিছুটা বদলাচ্ছে। অন্যদিকে স্বর্ণ ফের নিজের ঐতিহ্যগত ভূমিকা ফিরে পাচ্ছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্বর্ণ তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোয়ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ আরো বাড়তে পারে। ফলে বৈশ্বিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।

আরও